আন্ডারডগদের চমক: কৌশল ও পরিকল্পনার জয়
৪৮ দলের এই বিশ্বকাপে শুরু থেকেই দেখা যাচ্ছে বেশ কিছু অপ্রত্যাশিত ফল। তুলনামূলক কম শক্তিশালী দলগুলো বিশ্বের সেরা দলগুলোর বিপক্ষে শুধু প্রতিদ্বন্দ্বিতাই গড়ে তুলছে না, পয়েন্টও ছিনিয়ে নিচ্ছে। এ পর্যন্ত কেপ ভার্দে (ফিফা র্যাঙ্কিং ৬৪) স্পেনের (৩) সঙ্গে ড্র করেছে, কুরাসাও (৮১) পয়েন্ট নিয়েছে ইকুয়েডরের (২৯) কাছ থেকে, ঘানা (৬৫) রুখে দিয়েছে ইংল্যান্ডকে (৪), আর দক্ষিণ আফ্রিকা (৫৪) পয়েন্ট ছিনিয়ে নিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার (২৮) বিপক্ষে।
প্রশ্ন উঠছে—এই চমক কি শুধুই ভাগ্যের ফল, নাকি এর পেছনে রয়েছে নিখুঁত কৌশল ও পরিকল্পনা?
ফাঁদে পা দেয়নি আন্ডারডগরা
স্পেনের বিপক্ষে কেপ ভার্দের গোলশূন্য ড্র ছিল টুর্নামেন্টের অন্যতম বড় অঘটন। একই সঙ্গে এটি ছিল কৌশলগত দিক থেকেও অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স। ৪-৫-১ রক্ষণাত্মক ছকে খেলেছে কেপ ভার্দে। তাদের মিডফিল্ড ও ডিফেন্স লাইনের মধ্যকার দূরত্ব ছিল খুবই কম, ফলে স্পেন মাঝমাঠে জায়গা তৈরি করতে পারেনি।
সাধারণত বল দখলে এগিয়ে থাকা দলগুলো প্রতিপক্ষকে সামনে টেনে আনতে বল পেছনে খেলতে থাকে। কিন্তু কেপ ভার্দের ফুটবলাররা সেই ফাঁদে পা দেননি। তারা নিজেদের অবস্থান অটুট রেখেছেন এবং ডিফেন্সিভ ব্লক ভাঙার সুযোগ দেননি। স্পেনের ডিফেন্ডাররা সামনে উঠে এসে চাপ তৈরি করার চেষ্টা করলেও কেপ ভার্দে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজেদের সংগঠিত রক্ষণ বজায় রাখে। ফলে স্পেনকে বারবার উইং ব্যবহার করতে হয়েছে অথবা লম্বা বল খেলতে হয়েছে।
একই ধরনের পরিকল্পনা দেখা গেছে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঘানার খেলাতেও। ইংল্যান্ডের কোচ টমাস টুখেলের অধীনে দলটি প্রতিপক্ষকে সামনে টেনে এনে দ্রুত আক্রমণ গড়তে চায়। কিন্তু ঘানা দুই লাইনের সুশৃঙ্খল রক্ষণ গড়ে সেই পরিকল্পনা ভেস্তে দেয়। ঘানার জর্ডান আয়ু এলিয়ট অ্যান্ডারসনকে মার্কিং করলেও দলের বাকি খেলোয়াড়রা নিজেদের অবস্থান ধরে রাখেন। ফলে ইংল্যান্ড মাঝমাঠে ফাঁকা জায়গা তৈরি করতে পারেনি।
পরিসংখ্যানও এই কৌশলের সফলতা তুলে ধরেছে। ‘পিপিডিএ’ নামে পরিচিত একটি সূচক দিয়ে বোঝা যায় কোনো দল কতটা আগ্রাসীভাবে প্রতিপক্ষকে প্রেস করেছে। কেপ ভার্দের বিপক্ষে স্পেনের ম্যাচে কেপ ভার্দের পিপিডিএ ছিল ৫১.২, যেখানে স্পেনের ছিল মাত্র ৫.৯। আবার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ১৫ মিনিটে ঘানার পিপিডিএ ছিল ৬২। অর্থাৎ দুই দলই ইচ্ছাকৃতভাবে কম প্রেস করে নিজেদের রক্ষণভাগ অক্ষুণ্ন রেখেছে।
পুরো মাঠজুড়ে রক্ষণ
কেবল রক্ষণে বেশি খেলোয়াড় রাখলেই যে সাফল্য আসে না, সেটাও দেখা গেছে সৌদি আরবের খেলায়। স্পেনের বিপক্ষে পাঁচ ডিফেন্ডার নিয়ে খেললেও সৌদি আরব বারবার বলের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়ে। ফলে মাঠের এক পাশ ফাঁকা হয়ে যায়। স্পেন দ্রুত এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে বল ঘুরিয়ে সেই দুর্বলতার সুযোগ নেয়। লামিন ইয়ামাল ও পেদ্রো পোরো দুই-জন বনাম এক-জন পরিস্থিতি তৈরি করে সৌদি রক্ষণকে ভেঙে দেন। সেখান থেকেই আসে স্পেনের তৃতীয় গোল।
একই দুর্বলতা ছিল নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে সুইডেনের ৫-১ গোলের পরাজয়েও। ৫-৩-২ ফরমেশনে মাঝমাঠে মাত্র তিনজন খেলোয়াড় থাকায় পুরো প্রস্থজুড়ে রক্ষণ গড়ে তুলতে পারেনি সুইডেন। ডাচরা ডান প্রান্তে আক্রমণ বাড়িয়ে সুইডেনের ডিফেন্সকে বারবার সমস্যায় ফেলে। পরে ৪-৫-১ ছকে ফেরার পর কিছুটা ভারসাম্য ফিরে পায় সুইডিশরা।
প্রতিপক্ষকে টেনে এনে লং বল
শুধু রক্ষণ নয়, আক্রমণেও কার্যকর পরিকল্পনা নিয়েই খেলছে আন্ডারডগরা। দক্ষিণ আফ্রিকা দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে মাত্র ৩১ শতাংশ বল দখলে রেখেও ১৪টি শট নিয়েছে, যেখানে দক্ষিণ কোরিয়া নিতে পেরেছে মাত্র ৭টি। গোলকিক থেকে সরাসরি লম্বা বল না খেলে তারা ছোট ছোট পাসে প্রতিপক্ষকে সামনে টেনে আনে। এরপর ফাঁকা জায়গায় লম্বা বল পাঠিয়ে দ্রুত আক্রমণে যায়।
কেপ ভার্দে, ইরাক ও দক্ষিণ আফ্রিকা—তিন দলই খেলোয়াড়দের অনেক দূরে দূরে রেখে গোলকিক নেওয়ার কৌশল ব্যবহার করেছে। এতে প্রতিপক্ষকে প্রেস করতে বেশি দূর দৌড়াতে হয়েছে এবং সেই সুযোগে মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগে জায়গা তৈরি হয়েছে। অবশ্য এই কৌশল ঝুঁকিপূর্ণও। দক্ষিণ আফ্রিকা মেক্সিকোর বিপক্ষে এবং ইরাক নরওয়ের বিপক্ষে নিজেদের অর্ধে বল হারিয়ে গোলও হজম করেছে। তবু একই কৌশল থেকে তারা একাধিক ভালো আক্রমণ গড়েছে। শেষ মুহূর্তে আরও নিখুঁত ফিনিশিং হলে ফল ভিন্নও হতে পারত।
কৌশলের সঙ্গে দরকার মানসম্পন্ন পারফরম্যান্সও
এই বিশ্বকাপ দেখিয়ে দিচ্ছে, ফিফা র্যাঙ্কিং যাই হোক না কেন, কৌশলগত প্রস্তুতির দিক থেকে ছোট দলগুলো অনেক এগিয়ে গেছে। সুশৃঙ্খল পরিকল্পনা, দলগত সমন্বয় এবং সঠিক কৌশল থাকলে অপেক্ষাকৃত দুর্বল দলও শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে কঠিন চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। তবে কৌশলের পাশাপাশি ব্যক্তিগত নৈপুণ্যও বড় ভূমিকা রাখছে। ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহা স্পেনের বিপক্ষে অসাধারণ সেভ করে কেপ ভার্দেকে এক পয়েন্ট এনে দিয়েছেন। অন্যদিকে কুরাসাওয়ের গোলরক্ষক এলোয় রুম একটি ম্যাচে ১৫টি সেভ করে বিশ্বকাপের যৌথ সর্বোচ্চ সেভের রেকর্ড স্পর্শ করেছেন এবং দলকে ঐতিহাসিক এক পয়েন্ট এনে দিয়েছেন।
সব মিলিয়ে, কৌশল ছোট দলগুলোর জন্য ব্যবধান কমিয়ে দিচ্ছে। আর বিশ্বকাপের মঞ্চে বাড়তি আত্মবিশ্বাস ও অনুপ্রেরণা তাদের কাছ থেকে বের করে আনছে এমন পারফরম্যান্স, যা হয়ত তারা নিজেরাও আগে কল্পনা করেনি। সূত্র: বিবিসি



