চলতি বছরের বিশ্বকাপের জন্য তৈরি ত্রিওনদা বলটি সম্ভবত এযাবৎকালের সবচেয়ে আধুনিক ফুটবল। ২০২৬ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার খেলা দেখেছে সারা বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবল ভক্তরা। তবে সবার সঙ্গে আমেরিকা, কোরিয়া ও জাপানের একদল বিজ্ঞানীও উত্তেজনা নিয়ে বিশ্বকাপের প্রথম খেলা দেখেছেন। সাধারণ মানুষ যখন ম্যাচের ফলাফল নিয়ে ব্যস্ত, বিজ্ঞানীদের পুরো মনোযোগ তখন মাঠের ফুটবলটির ওপর। কারণ, এই ত্রিওনদা বলটি নিয়েই তাঁরা এত দিন ল্যাবরেটরিতে রাতের পর রাত গবেষণা চালিয়েছেন।
বিশ্বকাপের বলের বিবর্তন
ফুটবলের আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা প্রতিটি বিশ্বকাপের জন্যই একটি করে নতুন বল নিয়ে আসে। এটি করার পেছনে যেমন আছে নতুন বল বিক্রির ব্যবসায়িক কৌশল, তেমনি খেলোয়াড়, রেফারি ও দর্শকদের জন্য খেলাকে আরও সহজ ও সুন্দর করার লক্ষ্যও।
১৯৭০ সালের বিশ্বকাপে প্রথমবার আনা হয় টেলস্টার নামে বলটি। এটিই ছিল প্রথম প্যানেল বল, যাতে সেই আমলের সাদাকালো টিভিতেও দর্শকেরা মাঠের বলটিকে পরিষ্কারভাবে দেখতে পান। আবার ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ব্যবহার করা হয় অ্যাজটেকা বল। এটিই ছিল সিন্থেটিক উপাদান দিয়ে তৈরি প্রথম ফুটবল। এর সুবিধা ছিল, বলটি পানি শুষে নিত না। ফলে বৃষ্টির মধ্যেও বলের ওজন বাড়ত না এবং গোলাকার আকৃতি একদম ঠিক থাকত।
ত্রিওনদার আধুনিকতা ও স্বাভাবিকতা
চলতি বছরের বিশ্বকাপের জন্য তৈরি ত্রিওনদা বলটি সম্ভবত এযাবৎকালের সবচেয়ে আধুনিক ফুটবল। আগের বলগুলোর তুলনায় এই বলে জোড়া দেওয়া প্যানেলের সংখ্যা অনেক কম। এর চামড়া কিছুটা খসখসে। সেই সঙ্গে বলের ভেতরে বসানো আছে একটি বিশেষ সেন্সর, যা সরাসরি ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির কাছে খেলার মাঠের সব তথ্য পাঠাতে পারে।
তবে অবাক করা বিষয় হলো, এত সব অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া থাকার পরও মাঠের খেলায় ত্রিওনদার আচরণে কিন্তু খুব বড় কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। বরং আগের বলগুলোর মতোই এটি স্বাভাবিক এবং নিখুঁতভাবে ছুটছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনের পুগেট সাউন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ভিজিটিং অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর জন এরিক গফ ত্রিওনদা বলটি নিয়ে গবেষণা করা বিজ্ঞানীদের একজন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, নতুন বলের আচরণ স্বাভাবিক থাকাটা কেন এত জরুরি। একটি নতুন বল বাজারে আনার পেছনে ব্যবসায়িক প্রচার ও দর্শক-খেলোয়াড়দের মধ্যে বাড়তি উত্তেজনা তৈরি করার উদ্দেশ্য তো থাকেই। কিন্তু বলটির ডিজাইন এমনভাবে করা হয়, যাতে মাঠে খেলার সময় খেলোয়াড়দের কাছে এর আচরণ হুট করে বদলে না যায়।
অধ্যাপক এরিক গফ ও তাঁর সহকর্মীদের বৈজ্ঞানিক গবেষণা এই কথাকেই প্রমাণ করেছে। ত্রিওনদার পাশাপাশি তাঁরা গত চারটি বিশ্বকাপের ফুটবল নিয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন। মজার ব্যাপার হলো, প্রতিটির ডিজাইন বা বাহ্যিক রূপ একে অপরের চেয়ে একদম আলাদা হলেও মাঠের খেলায় সবগুলোর আচরণ কিন্তু প্রায় একই রকম ছিল। তবে এই তালিকায় ২০১০ সালের জাবুলানি বলটি ছিল ব্যতিক্রম।
জাবুলানি বলের অদ্ভুত আচরণ
দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত ২০১০ সালের বিশ্বকাপে ব্যবহার করা জাবুলানি বলটি মাঠে এর অদ্ভুত ও খামখেয়ালি আচরণের জন্য কুখ্যাত হয়ে ওঠে। জাবুলানি বলটি প্রয়োজনের চেয়ে একটু বেশিই মসৃণ ছিল। আর এই অতিরিক্ত মসৃণতার কারণে বলটি বাতাসে ওড়ার সময় এর ওপর অদ্ভুত প্রভাব পড়ত। সাধারণত স্পিন ছাড়া কিক করা হলে বেশির ভাগ ফুটবলই একটি নির্দিষ্ট ও চেনা গতিতে বাতাসে ভেসে যায়। কিন্তু জাবুলানির ক্ষেত্রে দেখা যেত, বাতাসে ভাসমান থাকা অবস্থাতেই বলটি হুট করে গতি হারিয়ে পড়ে যাচ্ছে কিংবা আচমকা দিক পরিবর্তন করছে।
বলের এই আজব আচরণের কারণে দূর থেকে নেওয়া কোনো শট যখন গোলপোস্টের দিকে যেত, তখন গোলরক্ষকদের পক্ষে তা ঠেকানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ত। ফলে কোনো কোনো ম্যাচে, এমনকি পুরো টুর্নামেন্টের ফলাফলও এই বলের কারণে ওলটপালট হয়ে যেত। জাবুলানি বলে মাত্র আটটি প্যানেল বা তালি ছিল। সেগুলো জোড়া দেওয়ার সেলাইয়ের সংখ্যাও ছিল খুব কম। ফলে বলের ওপর দিয়ে বাতাস খুব সহজেই মসৃণভাবে বয়ে যেতে পারত। কিন্তু বলটি যখন না ঘুরে সোজা বাতাসে ভেসে যেত, তখন ওই অল্প কয়েকটি সেলাইয়ের কারণেই বলের চারপাশের বাতাস অসমান বা অপ্রতিসমভাবে বইতে শুরু করত। বাতাসের এই কমবেশি চাপের কারণেই বলটি সোজা না গিয়ে হঠাৎ এর চেনা পথ থেকে ছিটকে যেত। বিজ্ঞানীরা এই ব্যাপারটিকে তুলনা করেছেন হালকা বিচ বল বা প্লাস্টিকের বলের সঙ্গে, যা বাতাসে ছুড়লে হুটহাট দিক বদলায়।
ত্রিওনদার রহস্য কী
এখন প্রশ্ন জাগতে পারে, নতুন ত্রিওনদা বলে তো প্যানেলের সংখ্যা আরও কম—মাত্র চারটি! তাহলে তো এর আচরণ জাবুলানির চেয়েও বেশি অদ্ভুত ও খামখেয়ালি হওয়ার কথা? কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, মোটেও তা নয়। ত্রিওনদা বলের প্যানেলগুলোকে আটকে রাখা সেলাইগুলো জাবুলানির তুলনায় বেশ লম্বা, গভীর এবং চওড়া। বিজ্ঞানীরা লেজার স্ক্যানিং প্রযুক্তির উন্নত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে এই সেলাইগুলোর নিখুঁত মাপ নিয়েছেন। এ কারণে ত্রিওনদা বলটি জাবুলানির মতো দিক না হারিয়ে একদম নির্দিষ্ট পথ ধরে এগিয়ে যায়।
এখন প্রশ্ন হলো, বলের আচরণ যদি আগের মতোই রাখতে হয়, তবে প্রতি চার বছর পরপর কোটি কোটি টাকা খরচ করে এবং সাড়ে তিন বছর সময় নষ্ট করে নতুন বল বানানোর দরকার কী? বল প্রস্তুতকারক কোম্পানি অ্যাডিডাস এ নিয়ে কোনো মন্তব্য না করলেও বিজ্ঞানী এরিক গফের কাছে এর একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে। তাঁর মতে, বিজ্ঞান ও প্রকৌশলজগতের আসল চালিকাশক্তি হলো কৌতূহল ও একটি নিখুঁত সম্পূর্ণ গোল ফুটবল তৈরি করার চেষ্টা। এটি অনেকটা চাঁদে যাওয়ার মতো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যেহেতু আগে কেউ এত কম প্যানেলে বল বানাতে পারেনি, তাই তাঁরা দেখতে চান এটা করা সম্ভব কি না।



