বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে অনেক কিংবদন্তি আছেন যারা কখনো ট্রফি জিততে পারেননি, তবু ফুটবল তাদের ভুলতে পারেনি। বিশ্বকাপ সব সময় সেরা ফুটবলারকে ট্রফি দেয় না, কখনো শুধু সবচেয়ে সফল দলটিকেই পুরস্কৃত করে।
পুসকাস ও ক্রুইফের অপূর্ণতা
ফেরেঙ্ক পুসকাস হাঙ্গেরির ‘ম্যাজিক ম্যাজার্সের প্রাণপুরুষ। ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপে সবাই ভেবেছিল ট্রফি তার হাতেই উঠবে। ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির কাছে হেরে ভেঙে যায় সেই স্বপ্ন। পুসকাস অমর হয়েছেন, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে পারেননি।
ইয়োহান ক্রুইফ ফুটবলকে বদলে দিয়েছিলেন। ‘টোটাল ফুটবলের দর্শন দিয়ে একটি নতুন যুগের জন্ম দিয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপে তার নেদারল্যান্ডস ছিল শিল্পের আরেক নাম। ফাইনালের শেষে ট্রফি উঠেছিল জার্মানদের হাতে। ক্রুইফ হারিয়েছিলেন বিশ্বকাপ, জিতে নিয়েছিলেন ফুটবল ইতিহাস।
ইউসেবিও, জিকো ও মালদিনি
১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে ইউসেবিওর চোখের জল আজও ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। গোলের পর গোল করে তিনি পর্তুগালকে সেমিফাইনালে তুলেছিলেন। ইংল্যান্ডের কাছে হেরে মাঠে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। একটি ছবিই বিশ্বকাপের পুরো গল্প বলে দিয়েছিল।
ব্রাজিলের জিকো ইতিহাসের অন্যতম সেরা প্লেমেকার। তার পায়ের ছোঁয়ায় ফুটবল হয়ে উঠত শিল্প। ১৯৮২ সালের ব্রাজিল ট্রফি ছুঁতে পারেনি। সৌন্দর্য ইতিহাসে জায়গা পেয়েছে, শিরোপা পায়নি।
পাওলো মালদিনি চারটি বিশ্বকাপ খেলেছেন। দুই দশক ইতালির রক্ষণভাগকে পাহাড়ের মতো আগলে রেখেছেন। তার নান্দনিক রক্ষণভাগ ফুটবলকে সমৃদ্ধ করেছে। বিশ্বকাপের ট্রফি তাকে ছুঁয়ে দেখেনি। একজন ডিফেন্ডার কতটা মহান হতে পারেন, মালদিনি তার জীবন্ত উদাহরণ। বিশ্বকাপ তার জীবনের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা।
বাজ্জিওর বেদনা ও মেসির পূর্ণতা
১৯৯৪ সালের পাসাডেনার সেই রাত আজও ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক মুহূর্তগুলোর একটি। টাইব্রেকারে রবার্তো বাজ্জিওর শেষ শটটি গোলবারের ওপর দিয়ে উড়ে যায়। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ইতালিয়ান শিল্পীর সেই ছবি ছিল কোটি মানুষের কান্নার প্রতীক। একটি পেনাল্টি একজন কিংবদন্তিকে ছোট করেনি, একটি অসমাপ্ত গল্প তৈরি করেছে।
সময় বদলেছে। প্রজন্ম বদলেছে। বিশ্বকাপের নিষ্ঠুরতা বদলায়নি। একসময় লিওনেল মেসিকেও এই তালিকায় রাখা হতো। ২০০৬, ২০১০, ২০১৪ ও ২০১৮ প্রতিবারই তিনি স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন। ২০১৪ সালের ফাইনালে জার্মানির কাছে হারের পর ট্রফির পাশ দিয়ে মাথা নিচু করে হেঁটে যাওয়ার সেই ছবিটি বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম হৃদয়বিদারক দৃশ্য। কাতারে সেই অপূর্ণতা মুছে দেন। স্বপ্ন পূরণ হতে অনেক দেরি হয়, অসম্ভব নয়।
রোনাল্ডো, ডি ব্রুইনে ও কেইন
ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো পাঁচটি ব্যালন ডি’অর, অসংখ্য ক্লাব শিরোপা, চ্যাম্পিয়ন্স লিগে অবিশ্বাস্য সাফল্য, আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড সবই তার অর্জনের ঝুলিতে। বিশ্বকাপের ট্রফিটি আজও তার হাতে ওঠেনি। প্রতিটি বিশ্বকাপে তিনি নেমেছেন একটি জাতির স্বপ্ন কাঁধে নিয়ে। প্রতিবারই কোটি মানুষ বিশ্বাস করেছে, হয়তো এবার। শেষ বাঁশির পর তাকে ফিরতে হয়েছে অপূর্ণতা নিয়েই। পরিসংখ্যান তাকে অমর করেছে, বিশ্বকাপ না জেতার আক্ষেপ তার কিংবদন্তি ক্যারিয়ারের সবচেয়ে নিঃশব্দ বেদনা।
বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্মকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন কেভিন ডি ব্রুইনে। তার পাস যেন শিল্পীর তুলির আঁচড়। ক্লাব ফুটবলে যা জেতার প্রায় সবই জিতেছেন। বিশ্বকাপে প্রতিবারই কিছু না কিছু অপূর্ণ থেকে গেছে। হয়তো এটাই তার শেষ সুযোগ। শেষবারের মতো একটি জাতির স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার লড়াই।
ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইনের গল্পও একই রকম। গোল করেছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন, রেকর্ড গড়েছেন। একটি মিস, একটি ভুল সিদ্ধান্ত, একটি পেনাল্টিই চার বছরের প্রস্তুতিকে ধুলিস্যাৎ করে দিতে পারে।
উপসংহার
বিশ্বকাপ খুব কম মানুষকেই পূর্ণতা দিয়েছে। পেলে পেয়েছেন। ম্যারাডোনা পেয়েছেন। জিদান পেয়েছেন। অসংখ্য কিংবদন্তির ভাগ্যে সেই আনন্দ লেখা ছিল না। আজও পৃথিবীর অসংখ্য শিশু ক্রুইফের মতো বল নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। পুসকাসের মতো বাঁ পায়ের শট নিতে চায়। জিকোর মতো খেলা সাজাতে চায়। বাজ্জিওর মতো ড্রিবল করতে চায়। মালদিনির মতো রক্ষণ সামলাতে চায়। রোনাল্ডোর মতো আকাশে ভেসে উঠে হেড করতে চায়। ডি ব্রুইনের মতো নিখুঁত পাস দিতে চায়। হ্যারি কেইনের মতো নেতৃত্ব দিতে চায়। তারা সবাই বিশ্বকাপ না জিতেও কোটি মানুষের স্বপ্ন হয়ে উঠেছেন।



