ঢাকা কলেজের হলে বিশ্বকাপের উন্মাদনা, পড়ার টেবিল সরিয়ে ফুটবলের গ্যালারি
ঢাকা কলেজের হলে বিশ্বকাপের উন্মাদনা, পড়ার টেবিল সরিয়ে ফুটবলের গ্যালারি

বিশ্বকাপ শুরু হয়ে গেছে। আর সেই সঙ্গে বদলে গেছে ঢাকা কলেজের আবাসিক হলগুলোর পরিচিত ছন্দও। ক্লাস চলছে, পরীক্ষা আছে, অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে হচ্ছে। এর মাঝেও ছাত্রজীবনের ভেতরে ঢুকে পড়েছে আরেকটি পৃথিবী। সেই পৃথিবীর নাম বিশ্বকাপ।

হলের পরিবেশ বদলে গেছে

দিনের বেলা করিডোরে স্বাভাবিক ব্যস্ততা। কেউ ক্লাসে যাচ্ছে, কেউ লাইব্রেরিতে, কেউ মাঠে। কিন্তু সন্ধ্যা নামার পর ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে পরিবেশ। পড়ার টেবিলের পাশে ফুটে ওঠে ফুটবলের মানচিত্র। দেয়ালে টানানো হয় প্রিয় দলের পতাকা। কোথাও আর্জেন্টিনা, কোথাও ব্রাজিল, কোথাও জার্মানি, ফ্রান্স, পর্তুগাল কিংবা স্পেন।

ঢাকা কলেজের হলগুলোর অনেক শিক্ষার্থীর কাছেই বিশ্বকাপ মানে একসঙ্গে থাকার সময়, ব্যস্ত জীবনের মাঝখানে কিছু রাত চুরি করে নেওয়ার উৎসব। দক্ষিণ হলের শিক্ষার্থী মাহিন হাসান বলেন, ‘বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর থেকে হলে অন্যরকম একটা পরিবেশ। কে কোন দলের সমর্থক, কোন দল কেমন খেলল এসব নিয়েই আলোচনা। খেলার দিন হলে ঘুম কম হয়, কিন্তু আনন্দ বেশি হয়।’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাতের গ্যালারি ও উল্লাস

বিশ্বকাপের রাতগুলোতে হলের ছোট ছোট কক্ষগুলো যেন বদলে যায় অস্থায়ী গ্যালারিতে। কেউ ল্যাপটপে খেলা চালায়, কেউ বড় পর্দার ব্যবস্থা করে। বিছানার ওপর বসে, মেঝেতে বসে, কেউ দাঁড়িয়ে। চোখ তখন একটাই দিকে। গোল হলে পুরো ফ্লোর যেন একসঙ্গে শব্দ করে ওঠে। কেউ চিৎকার করে, কেউ দৌড়ে বের হয়ে আসে করিডোরে, কেউ আবার নীরবে বসে থাকে।

উত্তর হলের শিক্ষার্থী ইলিয়াস কবির বলেন, ‘সবচেয়ে সুন্দর লাগে যখন সবাই একসঙ্গে খেলা দেখি। যাদের সঙ্গে সাধারণ দিনে বেশি কথা হয় না, তারাও বিশ্বকাপের সময় বন্ধু হয়ে যায়।’

তর্ক-বিতর্ক ও আলোচনা

ঢাকা কলেজের বিশ্বকাপ সংস্কৃতির বড় অংশ জুড়ে থাকে তর্ক। কে সেরা? মেসি না রোনালদো? কার আক্রমণ শক্তিশালী? কোন দল এবার চমক দেখাবে? প্রতিটি ম্যাচের পর নতুন হিসাব, নতুন ভবিষ্যদ্বাণী। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আলোচনা আরও গভীর হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আব্দুর রহমান হেসে বললেন, ‘অনেক সময় ম্যাচ শেষ হওয়ার পরও আলোচনা ভোর পর্যন্ত চলে। তারপর দুই ঘণ্টা ঘুমিয়ে আবার ক্লাস।’

ছাত্রজীবনের স্মৃতি

কেউ কেউ বিশ্বকাপকে নিজেদের ছাত্রজীবনের অন্যতম স্মৃতি বলে মনে করেন। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘হলে প্রথম বিশ্বকাপ দেখার অভিজ্ঞতা আলাদা। পরিবারের বাইরে থেকেও মনে হয় বড় একটা পরিবারের সঙ্গে আছি।’

হলের অনেক শিক্ষার্থী বলছে, বিশ্বকাপের সময় ঘুম আর পড়াশোনার সঙ্গে সমঝোতা করতেই হয়। কেউ খেলা দেখে সকালে পরীক্ষায় গেছে। কেউ খেলা শেষ করে সরাসরি ক্লাসে। কেউ আবার পরীক্ষা ভালো না হওয়ায় বন্ধুদের কাছে মজা করে বলে, ‘এই বিশ্বকাপ আমার সিজিপিএ খেয়ে ফেলবে।’

তবু বিশ্বকাপ এলে এসব নিয়ে আফসোস খুব বেশি থাকে না। ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী রাজিব হায়দার বলছিলেন, ‘পড়াশোনা সবসময় থাকবে। কিন্তু বন্ধুদের সঙ্গে এভাবে বসে বিশ্বকাপ দেখার সময়টা আর ফিরে আসবে না।’

ক্যান্টিনেও উৎসব

হল ক্যান্টিনে আলাদা প্রাণ পেয়েছে। রাতের খেলা মানেই অতিরিক্ত চা। মাঝরাতে ডিম ভাজি, বিস্কুট ও নুডলস। ক্যান্টিনের কর্মচারীরাও অনেক সময় খেলার খবর জানেন শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেই। ক্যান্টিনে বয় আবদুল মালেক বলেন, ‘বিশ্বকাপের সময় মামারা (ছাত্ররা) কম ঘুমায়, বেশি চা খায়। রাত বারোটার পরও চায়ের অর্ডার শেষ হয় না।’

কলেজের পরিচ্ছন্নতাকর্মী সেলিম মিয়া বললেন, ‘খেলার রাতে সবাই অনেক জেগে থাকে। সকালে দেখি কারও হাতে পতাকা, কেউ আবার ম্যাচ নিয়ে তর্ক করতে করতে রুমে ফিরছে।’

পুরোনো স্মৃতি

ঢাকা কলেজের পুরোনো শিক্ষার্থীদের কাছেও বিশ্বকাপের স্মৃতি বিশেষ জায়গা দখল করে আছে। কেউ মনে রাখে ম্যারাডোনার সময়। কেউ ব্রাজিলের কান্না। কেউ মেসির অপেক্ষা। এখনকার শিক্ষার্থীরা সেই গল্পের সঙ্গে যোগ করছে নিজেদের নতুন গল্প।

বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যাবে। পতাকা নামবে। করিডোর আবার শান্ত হবে। রাত জাগা কমে যাবে। কিন্তু কয়েক বছর পর যখন এই শিক্ষার্থীরা কলেজ ছাড়বে, তখন হয়তো তারা সবচেয়ে বেশি মনে রাখবে না কোনো ক্লাস বা নোটের কথা। মনে থাকবে একটি ছোট্ট হলরুম। রাত ২টার খেলা। গোল হওয়ার পর করিডোরজুড়ে ছুটে যাওয়া উল্লাস। আর কিছু বন্ধু, যাদের সঙ্গে বসে একসময় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফুটবল উৎসব দেখা হয়েছিল। কারণ ঢাকা কলেজের হলগুলোতে বিশ্বকাপ ছাত্রজীবনের আরেক নাম। তরুণ বয়সের এক অদ্ভুত সুন্দর স্মৃতি।