বিশ্বকাপের পথে চার দল: সুইজারল্যান্ড, কাতার, বসনিয়া ও কানাডার সম্ভাবনা
বিশ্বকাপের পথে চার দল: সুইজারল্যান্ড, কাতার, বসনিয়া, কানাডা

সুইজারল্যান্ড, কাতার, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা এবং কানাডা—এই চার দল ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাচ্ছে। কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে অনুষ্ঠিতব্য এই বিশ্বকাপে প্রতিটি দলেরই রয়েছে নিজস্ব গল্প, স্বপ্ন ও চ্যালেঞ্জ। আসুন জেনে নেওয়া যাক তাদের প্রস্তুতি ও সম্ভাবনার কথা।

সুইজারল্যান্ড: আক্ষেপ ঘোচানোর মিশন

সুইজারল্যান্ডের জন্য এটি হবে টানা ষষ্ঠ এবং সর্বমোট ১৩তম বিশ্বকাপ। ১৯৩৪, ১৯৩৮ ও ১৯৫৪ সালে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছানো এই দলটি আধুনিক ফুটবলে এক অদ্ভুত আক্ষেপের শিকার। ১৯৯৪ সালের পর থেকে ছয়বারের মধ্যে পাঁচবারই তারা শেষ ষোলোতে উঠেছে, কিন্তু প্রতিবারই নাটকীয়ভাবে বিদায় নিতে হয়েছে। তবে গত দুটি ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে (ইউরো) কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছিল সুইসরা।

দলের মূল তারকা

দলের সবচেয়ে বড় তারকা ও প্লে-মেকার হলেন ৩৩ বছর বয়সী অধিনায়ক গ্রানিত শাকা। আর্সেনাল পর্ব শেষ করে বর্তমানে বেয়ার লেভারকুসেনের হয়ে খেলা এই অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার ইতিমধ্যেই তিনটি বিশ্বকাপ খেলেছেন। সুইজারল্যান্ডের ইতিহাসে তাঁর চেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার রেকর্ড আর কারও নেই।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কোচ মুরাত ইয়াকিন

সুইজারল্যান্ডের কোচ মুরাত ইয়াকিন খেলোয়াড়ি জীবনেও সফল ছিলেন। বাসেলে জন্ম নেওয়া এই কোচ গ্রাসফোপার্স, ফেনারবাচে, স্টুটগার্ট ও বাসেলের মতো ক্লাবে খেলেছেন। জাতীয় দলের হয়ে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে ৪৯টি ম্যাচ খেলেছেন। ২০০৬ সালে কোচিং ক্যারিয়ার শুরু করে ২০২১ সালে ভ্লাদিমির পেতকোভিচের উত্তরসূরি হিসেবে সুইস জাতীয় দলের দায়িত্ব নেন। কাতার বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে দুর্দান্ত খেলে শেষ ষোলোয় জায়গা করে নিলেও পর্তুগালের কাছে ৬-১ গোলে হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল। তবে ২০২৪ ইউরোতে তারা চমক দেখিয়ে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে, যেখানে টাইব্রেকারে ইংল্যান্ডের কাছে হেরে যায়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সুইজারল্যান্ডের ফিক্সচার

  • ১৪ জুন: সুইজারল্যান্ড বনাম কাতার (রাত ১টা)—সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়া স্টেডিয়াম
  • ১৯ জুন: সুইজারল্যান্ড বনাম বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা (রাত ১টা)—লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়াম
  • ২৫ জুন: সুইজারল্যান্ড বনাম কানাডা (রাত ১টা)—বিসি প্লেস ভ্যাঙ্কুভার

বাছাইপর্বের যাত্রা

সুইজারল্যান্ডের বাছাইপর্ব শুরু হয় কসোভোকে ৪-০ গোলে হারিয়ে, যেখানে ব্রিল এমবোলো একাই করেন ২ গোল। পরের ম্যাচে স্লোভেনিয়াকে ৩-০ এবং সুইডেনকে ২-০ গোলে হারায় তারা। ফিরতি লেগে স্লোভেনিয়ার মাঠে গোলশূন্য ড্র করার পর সুইডেনকে ৪-১ গোলে বিধ্বস্ত করে। শেষ রাউন্ডে কসোভোর সঙ্গে ড্র করে অপরাজিত থেকে বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে। তাদের গোল ব্যবধান ছিল +১২ (১৪টি গোল করেছে, হজম করেছে মাত্র ২টি)।

বিশ্বমঞ্চের বৃত্তান্ত

  • কনফেডারেশন: উয়েফা
  • বিশ্বকাপে সেরা সাফল্য: কোয়ার্টার ফাইনাল (১৯৩৪, ১৯৩৮, ১৯৫৪)
  • শেষ বিশ্বকাপ: কাতার ২০২২ (শেষ ষোলো)
  • প্রথম বিশ্বকাপ: ইতালি ১৯৩৪ (কোয়ার্টার ফাইনাল)
  • বিশ্বকাপে উপস্থিতি: ১৩ বার (১৯৩৪, ১৯৩৮, ১৯৫০, ১৯৫৪, ১৯৬২, ১৯৬৬, ১৯৯৪, ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২, ২০২৬)
  • সার্বিক পরিসংখ্যান: ম্যাচ ৪১টি, জয় ১৪টি, ড্র ৮টি, হার ১৯টি; গোল করেছে ৫৫টি, হজম করেছে ৭৩টি।

কাতার: আয়োজক থেকে লড়াকু দলে

২০২২ সালে নিজেদের দেশে বিশ্বকাপ আয়োজন করে কাতার সবার মন জয় করেছিল। এবার আর শুধু আয়োজক নয়, বাছাইপর্ব পেরিয়ে নিজেদের পারফরম্যান্স দিয়েই টিকিট কেটেছে তারা। নতুন ও পুরোনো খেলোয়াড়দের মিশেলে গড়া দলটি প্রমাণ করতে চায় তাদের যাত্রা শুধু ২০২২ সালেই আটকে নেই।

কোচ হুলেন লোপেতেগি

২০২৫ সালের মে মাসে কাতারের দায়িত্ব নেওয়া হুলেন লোপেতেগি দলকে এনে দেন বিশ্বকাপের টিকিট। রিয়াল মাদ্রিদ ও সেভিয়ার মতো ক্লাব এবং স্পেনের জাতীয় দল সামলানোর অভিজ্ঞতা আছে তার। ২০১৬-২০১৮ সালে তার অধীনে স্পেন অপরাজিত থেকে বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব পার করেছিল। সেভিয়ার হয়ে ২০২০ সালে উয়েফা ইউরোপা লিগ জিতেছেন। খেলোয়াড়ি জীবনে গোলরক্ষক হিসেবে রিয়াল মাদ্রিদ একাডেমি থেকে উঠে বার্সেলোনা ও রায়ো ভায়োকানোর মতো দলে খেলেছেন।

কাতারের ফিক্সচার

  • ১৪ জুন: কাতার বনাম সুইজারল্যান্ড (রাত ১টা)—সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়া স্টেডিয়াম
  • ১৯ জুন: কানাডা বনাম কাতার (রাত ৪টা)—বিসি প্লেস ভ্যাঙ্কুভার
  • ২৫ জুন: কাতার বনাম বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা (রাত ১টা)—সিয়াটল স্টেডিয়াম

বাছাইপর্বের যাত্রা

এশিয়ার বাছাইপর্বের চতুর্থ রাউন্ডে ১৪ অক্টোবর সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ২-১ গোলে হারিয়ে সরাসরি বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে কাতার। দ্বিতীয়ার্ধে বোয়ালেম খৌখি ও পেদ্রো মিগুয়েলের হেডে জয় পাওয়া দলটি গ্রুপের শীর্ষে ওঠে। দ্বিতীয় রাউন্ডে ৫ জয়, ১ ড্র ও ১ হারে ১৬ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে ছিল। তৃতীয় রাউন্ডে ইরান ও উজবেকিস্তানের পেছনে থেকে চতুর্থ হলেও চতুর্থ রাউন্ডে ওমান ও আমিরাতের বিপক্ষে দারুণ পারফর্ম করে যোগ্যতা প্রমাণ করে।

বিশ্বমঞ্চের বৃত্তান্ত

  • কনফেডারেশন: এএফসি
  • বিশ্বকাপে সেরা সাফল্য: গ্রুপ পর্ব (২০২২)
  • শেষ বিশ্বকাপ: কাতার ২০২২ (গ্রুপ পর্ব)
  • প্রথম বিশ্বকাপ: কাতার ২০২২
  • বিশ্বকাপে উপস্থিতি: ২ বার (২০২২, ২০২৬)
  • সার্বিক পরিসংখ্যান: ম্যাচ ৩টি, জয় ০টি, ড্র ০টি, হার ৩টি; গোল করেছে ১টি, হজম করেছে ৭টি।

বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা: ইউরোপের অদম্য দলের ফেরা

ওয়েলসকে টাইব্রেকারে হারানোর পর ইতালিকেও পেনাল্টিতে কাঁদিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট পকেটে পুরেছে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা। ২০১৪ সালে ব্রাজিলে প্রথম বিশ্বকাপের পর এটি তাদের দ্বিতীয় অংশগ্রহণ। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে কানাডার বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করে ১ পয়েন্ট পেয়েছে তারা।

কোচ সের্গেই বারবারেজ

বসনিয়ার কোচ সের্গেই বারবারেজের গল্প মজার। জার্মান বুন্দেসলিগায় ইউনিয়ন বার্লিন, বরুসিয়া ডর্টমুন্ড, হামবুর্গ ও বেয়ার লেভারকুসেনের মতো ক্লাবে ১০ নম্বর জার্সি গায়ে খেলেছেন। ১৯৯৮-২০০৬ সালে জাতীয় দলের হয়ে ৪৭ ম্যাচে ১৭ গোল করেছেন। ফুটবল থেকে অবসরের পর পেশাদার পোকার খেলোয়াড় হয়েছিলেন। ২০২৪ সালে প্রথমবার কোচিংয়ে এসে ৪-৪-২ ফরমেশনে দল গড়েছেন। তার অধীনে বাছাইপর্বে ৮ ম্যাচ থেকে ১৭ পয়েন্ট নেয় দলটি।

বাছাইপর্বের যাত্রা

বসনিয়ার হয়ে সবচেয়ে বেশি জাদু দেখিয়েছেন এডিন জেকো, যিনি একাই ৬টি গোল করেছেন। রোমানিয়ার মাঠে জয় দিয়ে শুরু করে সাইপ্রাস ও সান মারিনোকে হারায় তারা। শেষ পর্যন্ত রোমানিয়াকে টপকে গ্রুপের দ্বিতীয় স্থান থেকে প্লে-অফে যায়। সেমিফাইনালে ওয়েলসের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে জেকোর হেডে সমতায় ফিরে পেনাল্টিতে জয়। ফাইনালে ইতালির বিপক্ষে ১২০ মিনিট শেষে ১-১ গোলে সমতা। ইতালির পিও এসপোসিটো ও ব্রায়ান ক্রিস্তান্তে পেনাল্টি মিস করলে তরুণ বজরকভারেভিচ জয়সূচক গোলটি করেন।

বিশ্বমঞ্চের বৃত্তান্ত

  • কনফেডারেশন: উয়েফা
  • বিশ্বকাপে সেরা সাফল্য: গ্রুপ পর্ব (ব্রাজিল ২০১৪)
  • শেষ বিশ্বকাপ: ব্রাজিল ২০১৪
  • প্রথম বিশ্বকাপ: ব্রাজিল ২০১৪
  • বিশ্বকাপে উপস্থিতি: ২ বার (২০১৪, ২০২৬)
  • সার্বিক পরিসংখ্যান: ম্যাচ ৪টি, জয় ১টি, ড্র ১টি, হার ২টি; গোল করেছে ৫টি, হজম করেছে ৫টি।

কানাডা: নিজেদের মাঠে নতুন ইতিহাসের অপেক্ষা

২০২৬ বিশ্বকাপে মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ আয়োজক কানাডা। এটি তাদের তৃতীয় বিশ্বকাপ, আগে ১৯৮৬ ও ২০২২ সালে খেলেছিল। নিজেদের মাঠের সমর্থন নিয়ে কোচ জেসি মার্শের অধীনে গ্রুপ পর্ব পেরোনোর স্বপ্ন দেখছে তারা। প্রথম ম্যাচে বসনিয়ার সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করেছে।

কোচ জেসি মার্শ

গত বছরের মে মাসে দায়িত্ব নেওয়া জেসি মার্শ খেলোয়াড়ি জীবনে পথপ্রদর্শক। ১৯৯৬ সালে মেজর লিগ সকারের উদ্বোধনী মৌসুমে মাঠে নামেন। উত্তর আমেরিকার শীর্ষ লিগে ৩০০টির বেশি ম্যাচ খেলার পর কোচিং শুরু করেন। মন্ট্রিয়ল ইমপ্যাক্ট ও নিউইয়র্ক রেড বুলসের পর ইউরোপে রেড বুল সালজবার্গ, আরবি লাইপজিগ ও লিডস ইউনাইটেডের কোচ ছিলেন।

কানাডার ফিক্সচার

  • ১৩ জুন: কানাডা বনাম বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা (রাত ১টা)—টরন্টো স্টেডিয়াম
  • ১৯ জুন: কানাডা বনাম কাতার (ভোর ৪টা)—বিসি প্লেস ভ্যাঙ্কুভার
  • ২৫ জুন: কানাডা বনাম সুইজারল্যান্ড (রাত ১টা)—বিসি প্লেস ভ্যাঙ্কুভার

বাছাইপর্বের যাত্রা

স্বাগতিক দেশ হওয়ার সুবাদে কানাডা সরাসরি বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। ৪৮ দলের এই আসর বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্ট হতে যাচ্ছে।

বিশ্বমঞ্চের বৃত্তান্ত

  • কনফেডারেশন: কনক্যাকাফ
  • বিশ্বকাপে সেরা সাফল্য: গ্রুপ পর্ব (১৯৮৬ ও ২০২২)
  • শেষ বিশ্বকাপ: কাতার ২০২২ (গ্রুপ পর্ব)
  • প্রথম বিশ্বকাপ: মেক্সিকো ১৯৮৬
  • বিশ্বকাপে উপস্থিতি: ৩ বার (১৯৮৬, ২০২২, ২০২৬)
  • সার্বিক পরিসংখ্যান: ম্যাচ ৬টি, জয় ০টি, ড্র ০টি, হার ৬টি; গোল করেছে ২টি, হজম করেছে ১২টি।