বিশ্বকাপে ড্র-জ্বর: ব্রাজিল-স্পেনদের পয়েন্ট হারানোর গল্প
বিশ্বকাপে ড্র-জ্বর: ব্রাজিল-স্পেনদের পয়েন্ট হারানোর গল্প

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এ প্রথম ম্যাচেই হোঁচট খেয়েছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। পিছিয়ে পড়ার পর ঘুরে দাঁড়িয়ে সমতায় ফিরলেও শেষ পর্যন্ত মরক্কোর সঙ্গে পয়েন্ট ভাগাভাগি করেই মাঠ ছাড়তে হয়েছে সেলেসাওদের। গত রোববার নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে মরক্কোর সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে ব্রাজিল। আরব দেশটির হয়ে একমাত্র গোলটি করেন ইসমাইল সাইবারি, আর ব্রাজিলের পক্ষে সমতাসূচক গোলটি আসে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের পা থেকে।

কেপ ভার্দের ঐতিহাসিক ড্র

এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে ১৫ জুনের বিকেলটা ছিল চল্লিশ বছরের ভোজিনহার। বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র দুই সপ্তাহ আগে চল্লিশে পা রাখা এই গোলরক্ষক সেদিন বারবার ডানায় ভর দিয়ে উড়ছিলেন, আর তার দেয়ালের মতো প্রতিরোধের সামনে একের পর এক ব্যর্থ হচ্ছিল ‘ইউরো চ্যাম্পিয়ন’ স্পেনের আক্রমণ। ম্যাচ শেষে স্কোরবোর্ডে লেখা ছিল ০-০। কিন্তু আটলান্টিকের বুকে ভাসা পাঁচ লাখ মানুষের সেই দ্বীপরাষ্ট্রের কাছে এক পয়েন্টই ছিল ইতিহাসের সমান। ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ৬৭ নম্বরে থাকা কেপ ভার্দে, যারা এবারই প্রথম বিশ্বকাপের মঞ্চে পা রাখল, তারা থামিয়ে দিল ২০১০ সালের চ্যাম্পিয়নদের। পরিসংখ্যান একদিকে ছিল প্রায় একতরফা। স্পেন গোলমুখে শট নিয়েছে ২৭টি, এর সাতটি লক্ষ্যে। ফেরান তোরেসের এক শট লেগেছে ক্রসবারে। অথচ গোল আসেনি একটিও। সাতটি সেভ করা ভোজিনহার সামনে স্পেনের তারকারা একে একে ফিরে গেছেন খালি হাতে। বদলি নেমে লামিন ইয়ামালও পারেননি তালা ভাঙতে।

কোচদের প্রতিক্রিয়া

ম্যাচ শেষে কেপ ভার্দের কোচ পেদ্রো লেইতাও ব্রিতো বলেছেন, ‘এটা আমাদের দেশের কাছে সবকিছু। আমরা সবসময় চেয়েছি, সবাই আমাদের দেশটাকে দেখুক, দলটাকে দেখুক। আজ দেখাল, আমরা কারা।’ ওদিকে স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে হার মানতে রাজি নন এক বিন্দুও। ‘আপনার কি মনে হয় আমার দল সন্দেহে ভুগবে? একটুও না,’ বলেছেন তিনি। তবু বাস্তবতা হলো, টানা তিনটি বড় টুর্নামেন্টে শেষ ষোলোর গণ্ডি পেরোতে না পারা স্পেন এবারও বিশ্বকাপ শুরু করল পয়েন্ট হারিয়ে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ড্রয়ের জোয়ার

মজার ব্যাপার, কেপ ভার্দের এই কীর্তি এবারের বিশ্বকাপে বিচ্ছিন্ন কোনো ছবি নয়। বরং প্রথম সপ্তাহেই গোটা আসরে ছড়িয়ে পড়েছে এক ধরনের ‘ড্র-জ্বর’। কেপ ভার্দের আগেই ইঙ্গিতটা মিলেছিল। সুইজারল্যান্ডকে রুখে দিয়েছিল কাতার। বুয়ালেম খুখির শেষ মুহূর্তের গোলে ১-১ সমতা, আর কাতারের ডাগআউটে দাঁড়িয়ে সেই রাতের নায়ক ছিলেন স্প্যানিশ কোচ হুলেন লোপেতেগি। গত বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে শুরু করেছিল সৌদি আরব। এবারের আসরেও শুরুতে চমক দেখাল মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি। গ্রুপ-এইচ এর লড়াইয়ে উরুগুয়ের বিপক্ষে শুরুতেই এগিয়ে যায় সৌদি। তবে দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচে ঘুরে দাঁড়ায় লাতিন আমেরিকার দেশটি। শেষ পর্যন্ত ১-১ গোলের সমতায় শেষ হয় ম্যাচ।

গ্রুপ সি-তে সবচেয়ে আকর্ষণীয় লড়াইটা শেষ হয়েছে সমান-সমান, ব্রাজিল ১-১ মরক্কো। দুই দলই উপহার দিয়েছে জমজমাট ফুটবল, কিন্তু জয় নিয়ে ফিরতে পারেনি কেউ। তালিকাটা আরও লম্বা। ইরান দুবার পিছিয়ে পড়েও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ২-২ ড্র করেছে, সমতা ফেরানো গোলটা মোহাম্মদ মোহেব্বির। বেলজিয়াম ফেভারিট হয়েও মিশরের সঙ্গে আটকে গেছে ১-১ ব্যবধানে। নেদারল্যান্ডসকে ২-২ গোলের নাটকীয় ড্রয়ে থামিয়ে দিয়েছে জাপান। স্বাগতিক কানাডাও পুরো পয়েন্ট তুলতে পারেনি, বসনিয়ার সঙ্গে ১-১ ড্রয়ে খুইয়েছে দুটো পয়েন্ট। আরেক ফুটবল পরাশক্তি জার্মানি তাদের ম্যাচে ‘ক্ষুদ্র’ কুরাসাওকে ৭ গোলে পরাজিত করলেও তাদের জালে কুরাসাওয়ের গোলকে দেখা হচ্ছে ফুটবলের অন্যরকম প্রাপ্তি হিসেবে।

এত ড্র কেন?

কারণটা একটা নয়, কয়েকটা। প্রথমত, এবারের ৪৮ দলের বিস্তৃত ফরম্যাট মাঠে নামিয়েছে নতুন অনেক মুখ। কুরাসাও থেকে কেপ ভার্দে, ছোট দলগুলো এসেছে হারানোর ভয় ছাড়া, পুরো রক্ষণ জমাট বেঁধে। আর আধুনিক ফুটবলে সংগঠিত একটা রক্ষণভাগ ভাঙা যে কত কঠিন, স্পেনের ২৭ শটই তার প্রমাণ। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর গরম, লম্বা ভ্রমণ আর অচেনা পরিবেশ বড় দলগুলোর ছন্দে চিড় ধরিয়েছে শুরুতেই।

ইতিহাস অবশ্য বলছে, এতে ভেঙে পড়ার কিছু নেই। ১৯৮২ সালে গ্রুপ পর্বে ধুঁকতে থাকা ইতালি শেষমেশ হাতে তুলেছিল শিরোপা। শুরুর হোঁচট আর শেষের হাসি, বিশ্বকাপে এই গল্প নতুন নয়। বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীর হৃদয় বরাবরই ভাগ হয়ে থাকে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনায়। কিন্তু এই ড্রয়ের ঢেউয়ের ভেতর একটা আলাদা রোমাঞ্চ আছে, যেটা পতাকা চেনে না। পাঁচ লাখ মানুষের একটা দ্বীপ যখন বিশ্বের সেরা দলকে রুখে দেয়, তখন সেই গল্পটা হয়ে ওঠে সব ছোট স্বপ্নের গল্প। কারণ সেই স্বপ্নটা আমাদেরও, কোনো এক বিশ্বকাপে বাংলাদেশও এমন এক মঞ্চে দাঁড়াবে। আপাতত আটলান্টার ভোজিনহাই থাক স্মৃতিতে। চল্লিশ বছরের দুটি হাত, আর তার পেছনে থমকে যাওয়া এক পরাশক্তি। বিশ্বকাপ সবে শুরু, কিন্তু এর মধ্যেই সে বুঝিয়ে দিয়েছে, এবারের বিশ্বকাপের গল্পটা শুধু দৈত্যদের একার নয়।