প্রিন্ট: ১৫ জুন ২০২৬, ০১:১৮ পিএম। ফুটবল যন্ত্রের শব্দের ভেতরেও জেগে ওঠে ফুটবলের স্বপ্ন। মোজাম্মেল হক চঞ্চল। প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ০১:১৭ পিএম।
পরবর্তী খেলা
গ্রুপ এইচ, রাত ১০টা: স্পেন – কেপ ভার্দে, মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়াম, আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র।
পরবর্তী খেলাসমূহ
- মঙ্গলবার ১৬ জুন ২০২৬ [গ্রুপ জি] রাত ১টা: বেলজিয়াম – মিশর, লুমেন ফিল্ড, সিয়াটল, যুক্তরাষ্ট্র।
- মঙ্গলবার ১৬ জুন ২০২৬ [গ্রুপ এইচ] ভোর ৪টা: সৌদি আরব – উরুগুয়ে, হার্ড রক স্টেডিয়াম, মায়ামি, যুক্তরাষ্ট্র।
আরও পড়ুন। ফলো করুন যুগান্তর হোয়াটসঅ্যাপ, যুগান্তর মেসেঞ্জার।
বিশ্বকাপে ঢাকা শহর শুধু রঙে নয়, শব্দেও বদলে যায়। কিন্তু এই শহরের আরেকটি স্তর আছে যেখানে আলো-আঁধারির ভেতর দিন কাটে লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের। গার্মেন্টস কারখানা, কলকারখানা, ছোট শিল্প প্রতিষ্ঠান চলে যন্ত্রের গতিতে, সেখানেও বিশ্বকাপ নিয়ে জন্ম নেয় এক অন্যরকম উন্মাদনা। ঘড়ির কাঁটা, মেশিনের গুঞ্জন আর ক্লান্ত শরীরের ভেতরেও ফুটে ওঠে ফুটবলের স্বপ্ন।
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যন্ত্রের সঙ্গে লড়াই করা এই মানুষগুলোর কাছে বিশ্বকাপ একটুকরো আনন্দ, একটুকরো শ্বাস নেওয়ার সুযোগ। কারখানার ভেতরে যেমন সেলাই মেশিনের শব্দ থামে না, তেমনি থামে না তাদের হৃদয়ের ভেতরের আলোচনা—কে জিতবে, কোন দল এগিয়ে, কোন খেলোয়াড় বদলে দেবে ইতিহাস।
গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলগুলোতে বিশ্বকাপ এলে শ্রমিকদের জীবনেও নেমে আসে আলাদা রঙ। কাজের ফাঁকে মোবাইল ফোনে খেলা দেখা, বিরতিতে ছোট পর্দায় হাইলাইটস, আর রাতের বাসায় ফিরে আবার রিপ্লে দেখা—এইভাবেই তৈরি হয় তাদের ফুটবল জীবন।
নারায়ণগঞ্জের একটি পোশাক কারখানার শ্রমিক রিনা আক্তার বলেন, “আমরা সারাদিন কাজ করি। শরীর খুব ক্লান্ত থাকে। কিন্তু বিশ্বকাপ এলে কাজের ফাঁকে একটু সময় পেলেই খেলা দেখি। মনে হয় এই সময়টায় আমরা নিজের দুঃখ ভুলে যাই। গোল হলে পুরো মনের ভেতরটা হালকা হয়ে যায়।”
একই কারখানার আরেক শ্রমিক সেলিম মিয়া জানান, “আমরা আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল নিয়েই বেশি কথা বলি। বিরতিতে বসে সবাই তর্ক করি। কে ভালো খেলছে, কে হারবে—এই নিয়ে হাসি-ঠাট্টা চলে। কারখানার ভেতরেও তখন একটা উৎসবের মতো পরিবেশ হয়।”
গাজীপুরের একটি বড় গার্মেন্টস ইউনিটের সুইং অপারেটর শারমিন আক্তার বলেন, “রাতের শিফটে কাজ করার সময় মোবাইলে খেলা শুনি। কখনো গোল হলে সবাই চিৎকার করে ওঠে। তখন মনে হয় আমরা সবাই একসঙ্গে একটা বড় মাঠে দাঁড়িয়ে আছি।”
আশুলিয়ার একটি কারখানার শ্রমিক জসিম উদ্দিনের চোখে বিশ্বকাপ মানে শৈশবের হারানো আনন্দ। তিনি বলেন, “ছোটবেলায় গ্রামে খেলা দেখতাম। এখন শহরে এসে জীবন বদলে গেছে, কিন্তু বিশ্বকাপ এলে আবার সেই সময় ফিরে পাই। মনে হয় আমরা আবার ছোট হয়ে যাই।”
এই শ্রমিকদের জীবনে বিশ্বকাপ শ্রেণি, কাজ বা ক্লান্তি দেখে না। ধনী-গরিব, শহর-গ্রাম, নারী-পুরুষ—সবাইকে এক কাতারে এনে দাঁড় করায় এক অদৃশ্য গ্যালারিতে। যেখানে সবাই একসঙ্গে হাসে, কাঁদে, চিৎকার করে।
গার্মেন্টস কারখানার বিশাল ফ্লোরে যেখানে সারি সারি মেশিন দাঁড়িয়ে থাকে, সেখানে বিরতির সময় ছোট ছোট দল হয়ে যায় আলাদা আলাদা গ্যালারি। কেউ মোবাইল ধরে খেলা দেখায়, কেউ পাশে দাঁড়িয়ে শুনে যায়, কেউ আবার শুধু স্কোর জানার অপেক্ষায় থাকে। সেই মুহূর্তে কারখানাগুলো হয়ে ওঠে এক জীবন্ত স্টেডিয়াম।
ঢাকার একটি ছোট প্লাস্টিক কারখানার শ্রমিক মনিরা বেগম বলেন, “আমাদের এখানে কাজ থেমে থাকলে মালিক খুশি হয় না। কিন্তু বিশ্বকাপের সময় সবাই একটু বুঝে নেয়। কারণ সবাই খেলা দেখতে চায়। এটা আমাদের জন্য খুব আনন্দের সময়।”
বিশ্বকাপ এলে শ্রমিকরা চায়ের দোকানগুলোতে আড্ডায় মেতে ওঠে। কাজ শেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে তারা বসে পড়ে কাপ হাতে। সেখানে চলে আলোচনা—কে ভালো খেলছে, কোন ম্যাচে কী হলো, কোন গোলটি ছিল সবচেয়ে সুন্দর।
নারায়ণগঞ্জের এক চায়ের দোকানদার বলেন, “বিশ্বকাপের সময় বিক্রি বাড়ে। কিন্তু শুধু বিক্রি না, এখানে একটা অন্য পরিবেশ তৈরি হয়। সবাই খেলা নিয়ে কথা বলে।”
ক্লান্ত শরীর, কম ঘুম, আর পরের দিনের কাজের চিন্তা। তবুও বিশ্বকাপ তাদের কাছে এক ধরনের মানসিক আশ্রয়। যেখানে তারা কয়েক মিনিটের জন্য হলেও নিজের জীবনকে ভুলে যেতে পারে।
বিশ্বকাপ শেষ হলে আবার ফিরে আসে আগের জীবন। মেশিনের শব্দ, কাজের চাপ, সময়ের দৌড়—সব আবার আগের মতো। কিন্তু কিছুদিনের জন্য হলেও এই শ্রমিকরা যে আনন্দ পায়, তা তাদের জীবনের ক্লান্ত পাতায় একটুকরো আলো হয়ে থেকে যায়।
এই শহরের কারখানাগুলো তাই শুধু উৎপাদনের জায়গা নয়। বিশ্বকাপের সময় এগুলো হয়ে ওঠে একেকটি নীরব গ্যালারি যেখানে শ্রমিকরা নিজেদের ঘাম আর ক্লান্তির ভেতরেও খুঁজে পায় ফুটবলের একটুকরো স্বপ্ন, একটুকরো জীবন।
বিশ্বকাপ ফুটবল। ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬। ঘটনাপ্রবাহ: ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬। আরও পড়ুন। সর্বশেষ, সর্বাধিক পঠিত, সব খবর।



