ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই নারায়ণগঞ্জের বন্দরের বাসিন্দা মো. সোহেলের ব্যস্ততা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। বিভিন্ন দেশের পতাকা সেলাই করেই গত ৩০ বছর ধরে চলছে তার সংসার। তবে এবারের বিশ্বকাপকে ঘিরে প্রত্যাশিত বেচাকেনা না হওয়ায় কিছুটা হতাশ তিনি।
ছোট দোকানেই দিন কাটে
নারায়ণগঞ্জ নগরীর কালীরবাজার স্টেশন মার্কেটের সামনে ছোট্ট একটি দোকানেই কাটে সোহেলের দিনের বেশির ভাগ সময়। দোকানজুড়ে নানা রঙের কাপড়ের স্তূপ, রঙিন সুতা, কাঁচি আর সেলাই মেশিনের একটানা শব্দ। সেখানেই তৈরি হয় দেশি-বিদেশি নানা ধরনের পতাকা। মাত্র ১৫ বছর বয়সে এ পেশায় হাতেখড়ি হয় সোহেলের। এরপর থেকে বিশ্বকাপ ফুটবল, আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট ও বিভিন্ন উপলক্ষকে ঘিরে বিভিন্ন দেশের পতাকা তৈরি করে আসছেন তিনি।
বিভিন্ন দেশের পতাকা তৈরির অভিজ্ঞতা
সোহেল বলেন, ‘প্রায় ৩০ বছর ধরে পতাকা সেলাই করছি। বাংলাদেশের পতাকা থেকে শুরু করে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, পর্তুগালসহ বিভিন্ন দেশের পতাকা বানাই। যেসব দেশের খেলা হয়, প্রায় সব দেশের পতাকাই তৈরি করি।’ তিনি জানান, বিশ্বকাপ এলেই সাধারণত তার ব্যস্ততা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। তবে সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকার।
পতাকার আকার ও দাম
সোহেলের দোকানে বিভিন্ন আকারের পতাকা তৈরি হয়। কেউ বাড়ির বারান্দায় টানানোর জন্য ছোট আকারের পতাকা কেনেন, আবার কেউ রাস্তার মোড় বা বড় স্থাপনায় প্রদর্শনের জন্য বড় আকারের পতাকা অর্ডার দেন। তিনি জানান, পতাকার দাম শুরু হয় ৫০ টাকা থেকে। আকার ও মানভেদে ১০০, ২০০ বা ৩০০ টাকা ছাড়িয়ে বড় পতাকার দাম কয়েক হাজার টাকাও হয়। ‘তিন হাজার, চার হাজার, পাঁচ হাজার, এমনকি ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার পতাকাও বিক্রি হয়,’ বলেন তিনি। চাহিদার তালিকায় বড় আকারের পতাকাও রয়েছে। ৬ ফুট, ১২ ফুট, ১৫ ফুট, ২০ ফুট থেকে শুরু করে ৩০ ফুট পর্যন্ত পতাকা তৈরি করেন সোহেল।
আয়ের পরিমাণ কমেছে
৫০ বছর বয়সী সোহেল স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে সংসার চালান। বিশ্বকাপকে সামনে রেখে এবার আয় বাড়বে বলে আশা করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। তিনি বলেন, ‘আগের তুলনায় বিক্রি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। আবার ফুটপাতের দোকানও ভেঙে ফেলা হয়েছে।’ একসময় বিশ্বকাপের মৌসুম ছিল তার বাড়তি আয়ের বড় সুযোগ। কয়েক মাসের বিক্রিতেই বছরের উল্লেখযোগ্য অংশের আয় উঠে আসত। সোহেল বলেন, ‘গত বছর শুধু পতাকার ব্যবসা থেকে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা লাভ করেছি। আগের বছরও প্রায় একই রকম হয়েছে। কিন্তু এবার ৫০ হাজার টাকা লাভ করতে পারব কি না, তা নিয়েই সন্দেহ আছে।’ বর্তমানে তার দৈনিক আয় কখনো এক হাজার, কখনো দুই থেকে তিন হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে বলে জানান তিনি।
সমর্থকদের তর্ক এড়িয়ে চলেন
বিশ্বকাপ এলেই আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক নতুন কিছু নয়। তবে সোহেল নিজেকে সেই বিতর্কের বাইরে রাখেন। হেসে তিনি বলেন, ‘আমি সব দলের। কেউ যদি বলে আর্জেন্টিনা, আমি আর্জেন্টিনা। কেউ যদি বলে ব্রাজিল, আমি ব্রাজিল। আমি কারও মন খারাপ করতে চাই না।’ তবে ব্যক্তিগতভাবে কোন দলকে সমর্থন করেন, তা প্রকাশ করতে রাজি নন তিনি।
খেলা দেখার সময় পান না
মজার বিষয় হলো, বছরের পর বছর বিশ্বকাপের পতাকা বানিয়ে সংসার চালালেও খেলা দেখার সুযোগ খুব কমই হয় তার। সোহেল বলেন, ‘কাজের ব্যস্ততায় খেলা দেখার সময় পাই না। এক-দুই ঘণ্টা বসে খেলা দেখার সুযোগ হয় না। পরে কে গোল করল, ফলাফল কী হলো, সেটা জেনে নিই।’ এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার সময়ও সেলাই মেশিনে চলছিল নতুন একটি পতাকার কাজ। সেটি হয়তো কোনো আর্জেন্টিনা সমর্থকের জন্য। তবে পতাকার রং যাই হোক, সোহেলের প্রত্যাশা একটাই— মানুষের জীবনে আবার ফিরুক উৎসবের সেই আমেজ, যার ওপর নির্ভর করে তার মতো অসংখ্য কারিগরের জীবিকা।



