২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর ম্যাচে শনিবার (৪ জুলাই) ভোর ৪টায় মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হবে তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা এবং প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলেই নকআউট পর্বে ওঠা কেপ ভার্দে। দুই ভিন্ন জগতের এই লড়াইয়ে একদিকে বিশ্ব ফুটবলের ঐতিহ্যবাহী শক্তি, অন্যদিকে অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প লেখা ছোট্ট একটি দ্বীপরাষ্ট্র।
আর্জেন্টিনার শক্তিশালী অভিযান
গ্রুপ ‘জে’-তে তিন ম্যাচের তিনটিতেই জয় পেয়েছে লিওনেল স্কালোনির দল। আলজেরিয়াকে ৩-০, অস্ট্রিয়াকে ২-০ এবং জর্ডানকে ৩-১ গোলে হারিয়ে পূর্ণ ৯ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপসেরা হয়েছে আর্জেন্টিনা। তিন ম্যাচে তারা করেছে ৮ গোল, হজম করেছে মাত্র ১টি। বলের দখল, আক্রমণ গড়া, ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ এবং রক্ষণ—সব বিভাগেই ছিল তাদের আধিপত্য।
অধিনায়ক লিওনেল মেসি ৩৯ বছর বয়সেও দুর্দান্ত ছন্দে আছেন। গ্রুপ পর্বে ৬ গোল করে তিনি গোলদাতাদের তালিকার শীর্ষে। আলজেরিয়ার বিপক্ষে করেছিলেন হ্যাটট্রিক। লাউতারো মার্তিনেজও দারুণ ফর্মে আছেন; অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে গোল করার পর জর্ডানের বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে গোল করেন। মাঝমাঠে রদ্রিগো ডি পল, এনজো ফার্নান্দেজ ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার দলের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করছেন। রক্ষণে ক্রি রোমেরো ও লিসান্দ্রো মার্তিনেজ প্রতিপক্ষকে কম সুযোগ দিচ্ছেন। গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ তিন ম্যাচে মাত্র একবার বল জাল থেকে কুড়িয়েছেন।
সতর্ক আর্জেন্টিনা কোচ ও অধিনায়ক
নকআউটের আগে সতর্ক স্কালোনি। আর্জেন্টিনা কোচের কথা, ‘নকআউটে কোনো প্রতিপক্ষকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কেপ ভার্দে প্রমাণ করেছে তারা এখানে কাকতালীয়ভাবে আসেনি। আমাদের সর্বোচ্চ মনোযোগ নিয়েই খেলতে হবে।’
একই সুর শোনা গেছে অধিনায়ক মেসির কণ্ঠেও, ‘এখানে একটি ভুলই সবকিছু বদলে দিতে পারে। আমাদের শান্ত থাকতে হবে, নিজেদের ফুটবল খেলতে হবে এবং প্রতিটি মুহূর্তকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।’
কেপ ভার্দের রূপকথা
চলতি আসরে সবচেয়ে বড় রূপকথাগুলোর একটি লিখছে কেপ ভার্দে। প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলতে এসেই তারা শেষ বত্রিশে জায়গা করে নিয়েছে। গ্রুপ ‘এইচ’-এ স্পেনের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র দিয়ে শুরু। এরপর উরুগুয়ের বিপক্ষে ২-২ গোলে সমতা এনে চমক দেয়। শেষ ম্যাচে সৌদি আরবের সঙ্গে ০-০ গোলে ড্র করে ৩ পয়েন্ট নিয়ে নকআউটে উঠে ইতিহাস গড়ে। তিন ম্যাচে মাত্র ২ গোল করেছে, হজমও করেছে মাত্র ২টি।
কেপ ভার্দের সবচেয়ে বড় নায়ক গোলরক্ষক ভোজিনহা। ৪০ বছর বয়সি এই অভিজ্ঞ গোলকিপার স্পেনের বিপক্ষে সাতটি অসাধারণ সেভ করে বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। উরুগুয়ে ও সৌদি আরবের বিপক্ষেও তার দৃঢ়তা দলকে টিকিয়ে রেখেছে। তিনি ইতোমধ্যেই চলতি বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গোলকিপার হিসেবে আলোচনায় উঠে এসেছেন।
অধিনায়ক রায়ান মেন্ডেস আক্রমণে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। মাঝমাঠে কেভিন পিনা দলের ভারসাম্য ধরে রেখেছেন। রক্ষণে পিকো লোপেস ও তার সতীর্থরা অসাধারণ দৃঢ়তা দেখিয়েছেন। উরুগুয়ের বিপক্ষে পিছিয়ে পড়েও ২-২ সমতায় ফেরাটা কেপ ভার্দের মানসিক শক্তির বড় প্রমাণ।
কোচ ও গোলকিপারের আত্মবিশ্বাস
ম্যাচের আগে কেপ ভার্দে কোচ বুবিস্তা বলেছেন, ‘আর্জেন্টিনা বিশ্বের অন্যতম সেরা দল। কিন্তু নকআউটে ভয় নিয়ে মাঠে নামলে কোনো সুযোগ থাকে না। আমরা নিজেদের ফুটবল খেলতে চাই।’
গোলকিপার ভোজিনহার কণ্ঠেও আত্মবিশ্বাস, ‘আমরা জানি আর্জেন্টিনা কতটা শক্তিশালী দল। কিন্তু মাঠে নামার পর নাম নয়, পারফরম্যান্সই সবকিছু। আমরা ভয় নিয়ে খেলতে আসিনি। নিজেদের সামর্থ্যে বিশ্বাস আছে। শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত আমরা লড়াই করে যাব।’
পরিসংখ্যান ও কৌশল
পরিসংখ্যান বলছে আর্জেন্টিনা স্পষ্ট ফেবারিট। পূর্ণ ৯ পয়েন্ট, ৮ গোল, মাত্র ১ গোল হজম এবং দুর্দান্ত ছন্দে থাকা মেসিকে নিয়ে তারা শিরোপা ধরে রাখার অন্যতম দাবিদার। অন্যদিকে কেপ ভার্দে মাত্র ৩ পয়েন্ট নিয়েই দেখিয়ে দিয়েছে, ফুটবলে শুধু জয়ের সংখ্যাই সব নয়; কখনও কখনও লড়াই আর বিশ্বাসও ইতিহাস লেখে।
দুই দলের এর আগে কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ হয়নি। তাই বিশ্বকাপের এই নকআউটেই প্রথমবারের মতো মুখোমুখি হবে তারা। কৌশলগতভাবে ম্যাচের সবচেয়ে বড় লড়াই হবে আর্জেন্টিনার বলের নিয়ন্ত্রণের বিপক্ষে কেপ ভার্দের শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ ও দ্রুত পাল্টা আক্রমণ। স্কালোনির দল দীর্ঘ সময় বল নিজেদের দখলে রেখে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতে চাইবে। অন্যদিকে কেপ ভার্দে অপেক্ষা করবে সুযোগের, তারপর গতির ঝড় তুলে আঘাত হানার চেষ্টা করবে।
কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিটের লড়াইয়ের চেয়েও এই ম্যাচের গুরুত্ব অনেক বেশি। এটি একদিকে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার অভিযান, অন্যদিকে প্রথম বিশ্বকাপেই রূপকথা লিখে ফেলা এক ছোট্ট দেশের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রাম।



