টিভি পর্দা থেকে শুরু করে মাঠ-ঘাট-বন্দর, সব জায়গায় এখন শোরগোল শুধু ফুটবল নিয়ে। পছন্দের দলের জার্সি পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে সবাই, আর ফ্লেক্স করছে তাদের জার্সিতে থাকা তারকা নিয়ে। ব্রাজিলের পাঁচ তারকা, জার্মানির চার আর আর্জেন্টিনার তিন। যে যতবার বিশ্বকাপ জিতেছে, তাদের লোগোতেই শোভা পেয়েছে আরেকটি তারকা। ব্যতিক্রম শুধু উরুগুয়ে। দুইবার বিশ্বকাপ জিতেও তাদের জার্সিতে জ্বলজ্বল করছে চারটি তারকা।
উরুগুয়ের জার্সিতে চার তারকার রহস্য
লাতিন আমেরিকার দল উরুগুয়ে ছিল বিশ্বকাপের প্রথম দিককার জায়ান্ট। বিশ্বকাপের অভিষেক থেকে শুরু করে ষাটের দশক পর্যন্ত অপ্রতিরোধ্য এক দল ছিল তারা। এরপর তাদের আধিপত্য হারিয়ে গিয়েছে কালের ক্রমে। কিন্তু দুই বিশ্বকাপ জিতেও জার্সিতে দিব্যি চারটি তারকা লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায়, কারণটা কী?
কারণটা খুঁজে পেতে পেছনে ফিরে যেতে হবে পুরো ১০০ বছর আগে, যখন ফুটবল বিশ্বকাপ বলে ছিল না কোনো কিছু। তখন মানুষের আকর্ষণ ছিল অলিম্পিক নিয়ে। কিন্তু যখনই ঘোষণা করা হয়, অলিম্পিক থেকে বাদ পড়ছে ফুটবল, ফিফা প্রেসিডেন্ট জুলে রিমে খেপে উঠলেন তেলেবেগুনে। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, অলিম্পিকে খেলা না হলে ফিফা নিজেই আয়োজন করবে ফুটবলের টুর্নামেন্ট। নাম হবে ফুটবল বিশ্বকাপ।
প্রথম বিশ্বকাপ জয়
ইউরোপীয়দের পেছনে ফেলে ১৯৩০ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের আয়োজন হলো উরুগুয়েতে। নিজেদের মাটিতে তাদের দুর্দান্ত ফুটবলের কাছে পাত্তাই পায়নি ইউরোপীয়রা। এত দিন পর্যন্ত নিজেদের ফুটবলকে সর্বেসর্বা ভাবা ইউরোপ বুঝতে পারল, ইউরোপের বাইরে ফুটবল ঠিক কতটা জনপ্রিয়। প্রথম আয়োজনে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা নিজেদের করে নেয় উরুগুয়ে।
উরুগুয়ের এমন উত্থান অবশ্য অবাক করার মতো কিছু নয়। কারণ, বিশ্বকাপের আগে হওয়া শেষ দুই অলিম্পিকে স্বর্ণপদক পেয়েছিল উরুগুয়ে। ১৯২৪ ও ১৯২৮ অলিম্পিককে ধরা হয় বিশ্বকাপের সূচনালগ্ন হিসেবে। কারণ, ওই দুটি আসর ছিল অন্যান্য অলিম্পিকের চেয়ে আলাদা। ওই দুই আসরে অলিম্পিকের ফুটবল তত্ত্বাবধান করেছিল ফিফা। সে আসর দুটি উন্মুক্ত ছিল সব খেলোয়াড়ের জন্য। এর আগে অলিম্পিকে খেলতে পারতেন শুধু অপেশাদার খেলোয়াড়েরা। মূলত ওই দুটি অলিম্পিক আসর দেখেই ফিফা বুঝতে পেরেছিল বিশ্বকাপ আসর কীভাবে সাজাতে হয়, বড় দলের বিশাল আয়োজন কীভাবে করতে হয়। ফিফার তৎকালীন সভাপতি জুলে রিমে ১৯২৪ ও ১৯২৮ অলিম্পিকের জয়ীকে আখ্যা দিয়েছিলেন চ্যাম্পিয়ন অব দ্য ওয়ার্ল্ড হিসেবে। সেই হিসাবে উরুগুয়েও চার বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন।
ফিফার স্বীকৃতি
মজার ব্যাপার হলো ১৯৯২ সালের আগপর্যন্ত উরুগুয়ে কিন্তু দুটি তারকাই ব্যবহার করত। এরপরই তারা খুঁজে পায় দুটি অমূল্য নথি, যেখানে ফিফা নিজে থেকে উরুগুয়েকে ১৯২৪ ও ১৯২৮ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। তাই ফিফার কাছে তারা আবেদন করে উরুগুয়েকে চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার। নথি থেকে ফিফাও না করার সুযোগ পায়নি। ফলাফল? ১৯৯২ সাল থেকে নিয়মিত চার তারকা ব্যবহার করে আসছে তারা। সেই থেকে বিশ্বকাপের জার্সিতেও চারটি লোগো ব্যবহার করে আসছে উরুগুয়ে।
গুঞ্জন আছে, ২০২১ সালে উরুগুয়েকে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়েছিল লোগো থেকে তারকার সংখ্যা কমিয়ে ফেলতে। কিন্তু এরপর আর তা নিয়ে কোনো কথা শোনা যায়নি। ২০২৩ সালে ফিফা ডটকম আনুষ্ঠানিক এক বিবৃতিতে উরুগুয়ের চারটি তারকার কথা মেনে নেয়। এর পর থেকে চার তারকা নিয়ে আর কোনো বিপত্তিতে পড়তে হয়নি তাদের।



