ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফির জন্য পুরো বিশ্ব চার বছর ধরে অপেক্ষায় থাকে। হাজার মাইল দূরের দেশের জন্য পতাকা ওড়ানো, জার্সি কেনা, ‘কী হয়’ শঙ্কা নিয়ে রাত জেগে অধীর অপেক্ষায় থাকা—বিশ্বকাপ ঘিরে আছে এমন হাজারো গল্প। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, বিশ্বকাপ কেন ঠিক চার বছর পরপরই হয়? এত বড় আয়োজন তো চাইলেই প্রতিবছর করা যায়। তবে চার বছরের অপেক্ষা কেন?
ঐতিহাসিক পটভূমি
এ জন্য প্রায় ১৩০ বছর পেছনে ফিরে যেতে হবে। ১৮৯৬ সালে গ্রিসের এথেন্সে শুরু হয়েছিল আধুনিক অলিম্পিকের যাত্রা। চার বছর পর, ১৯০০ সালে অলিম্পিকের দ্বিতীয় আসরে ‘আনঅফিশিয়াল স্পোর্টস’ হিসেবে জায়গা করে নেয় ফুটবল। কিন্তু সেই আসরে ফুটবলের জনপ্রিয়তা ছাড়িয়ে গিয়েছিল বাকি সব ইভেন্টকে। যে কারণে তার ঠিক চার বছর পর অলিম্পিকের বলয় ভেঙে সাত দেশ মিলে তৈরি হয় ‘ফিফা’। যাদের লক্ষ্যই ছিল অলিম্পিকের বাইরে নিজস্ব একটি টুর্নামেন্ট করা। কিন্তু বিভিন্ন কারণে সেই পরিকল্পনা শুধু কাগজে–কলমেই থেকে যাচ্ছিল, বাস্তবে পরিণত হচ্ছিল না।
১৯০৯ সালে ইতালির তুরিনে একটি বহুজাতিক টুর্নামেন্টের আয়োজন করেন স্যার থমাস লিপটন। ইতালি, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের একটি করে ক্লাব নিয়ে আয়োজন করা হয় ‘লিপটন ট্রফি’। সেটাকে অনেকেই ধরে থাকেন আধুনিক বিশ্বকাপ বা চ্যাম্পিয়নস লিগের ব্লুপ্রিন্ট হিসেবে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও ফিফার পুনরুজ্জীবন
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে ভেস্তে যায় ফিফার পরিকল্পনা। সঙ্গে ছিল মহারথী অলিম্পিক। তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পেরে উঠছিল না ফিফা। ১৯২১ সালে ফিফার দায়িত্বে বসেন সাবেক ফরাসি সেনাপ্রধান মঁসিয়ে জুলে রিমে। তাঁর হাত ধরেই প্রাণ ফিরে পায় ফিফা। অলিম্পিকের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় ১৯৩২ অলিম্পিক থেকে বাদ দেওয়া হয় ফুটবলকে। সেই সুযোগটাই লুফে নেন জুলে রিমে। ২৮ মে ১৯২৮ নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে প্রথমবারের মতো সিদ্ধান্ত হয়, মাঠে গড়াবে ফিফার নিজস্ব টুর্নামেন্ট। এ যেন ফুটবলের অলিম্পিক।
চার বছরের ব্যবধানের যুক্তি
বলা বাহুল্য, অলিম্পিক ফরম্যাট তখন সর্বজনস্বীকৃত। ফিফা তাই সেটিতে আর হাত দেয়নি। চার বছর পরপর ভিন্ন ভেন্যুতে আয়োজন করা যেমন সুবিধাজনক, তেমনই দলগুলোও নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায়। তখন অবশ্য এত দল খেলত না, ছিল না বাছাইপর্বের কড়াকড়িও। কিন্তু স্বাগতিকদের গুছিয়ে নিতে চার বছর একেবারেই মোক্ষম সময়।
তবে এখন যেহেতু দল বেড়েছে, বেড়েছে খেলাও। বিশ্বকাপের মূল আসর হয়তো এক মাসের কিন্তু ‘বিশ্বকাপ’ শুরু হয়ে যায় তিন বছর আগে থেকেই। ২০২৬ বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব শুরু হয়েছিল ২০২৩ সালের ১২ অক্টোবর। আর শেষ হয়েছে ৩১ মার্চ ২০২৬। অর্থাৎ পুরো ২ বছর ৫ মাস ১৯ দিন লেগেছে বিশ্বকাপের ৪৮টি দল খুঁজে বের করতে। চার বছরের বিরতি না থাকলে এই দলগুলো বিশ্বকাপে সুযোগ পেত কীভাবে?
আবেগ ও মর্যাদা
আর তৃতীয়তে আছে বিশ্বকাপের আমেজ আর আবেগ। কোনো জিনিস প্রতিদিন পেলে তার গুরুত্ব কমে যায়। চার বছর পরপর হয় বলেই বিশ্বকাপের মর্যাদা এত বেশি। ফুটবলের মৌসুম প্রতিবছরই চলতে থাকে। নিয়মিত ফুটবল দেখা দর্শকদের কাছে তার আবেদন থাকলেও বাকিরা অপেক্ষা করে বিশ্বকাপের জন্যই।
বিশ্বকাপের আমেজ জিইয়ে রাখতেই চার বছর কেটে যায়। এবার তো আরও ভালো, দুই বিশ্বকাপের মধ্যে সবচেয়ে কম বিরতি এবার। গতবার কাতারে শীতকালীন বিশ্বকাপ হওয়ায় ব্যবধানটাও কমে এসেছে। মাত্র ৩ বছর ৫ মাস ২৩ দিনের বিরতি দিয়েই মাঠে গড়াচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর টুর্নামেন্ট। এর থেকে আনন্দের কী হতে পারে?



