নরওয়ের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে ব্রাজিলের বিদায় নিশ্চিতের পর কেঁদে ফেলেন বদলি নামা নেইমার। মেটলাইফ স্টেডিয়ামে নিজের আবেগঘন প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, 'আমি চেষ্টা করেছি। আমি চেষ্টা করেছি। মেটলাইফ স্টেডিয়াম থেকে শুরু করেছিলাম, এখানেই শেষ করলাম। এই অধ্যায় এখন শেষ।'
এক বাক্যে শেষ হয়ে গেল এক প্রজন্মের স্বপ্ন
মাত্র কয়েকটি শব্দ। অথচ এই কয়েকটি শব্দেই যেন থেমে গেল এক প্রজন্মের স্বপ্ন, একটি দেশের দীর্ঘ প্রতীক্ষা, কোটি ফুটবলপ্রেমীর বুকের ভেতর জমে থাকা একরাশ না পাওয়ার গল্প। মেটলাইফ স্টেডিয়ামের আলো তখনো নিভে যায়নি। গ্যালারির উল্লাস ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু একজন মানুষের ভেতরে তখন যেন নিভে গেছে বহু বছরের এক আগুন। যে আগুন জ্বলেছিল সান্তোসের এক কিশোরের চোখে—একদিন ব্রাজিলকে আবার বিশ্বসেরা করার স্বপ্ন নিয়ে।
নেইমারের ফুটবল যাত্রা: শিল্প আর বেদনার গল্প
নেইমার জুনিয়রের গল্পটা কখনোই শুধু গোল, অ্যাসিস্ট কিংবা পরিসংখ্যানের গল্প ছিল না। এটি ছিল শিল্পের গল্প। এমন এক শিল্পী, যার পায়ের ছোঁয়ায় ফুটবল কখনো নাচত, কখনো গান গাইত, কখনো আবার কান্না করত। ২০১৪ সালে নিজেদের মাটিতে বিশ্বকাপ। কলম্বিয়ার বিপক্ষে সেই ভয়ংকর চোট। স্ট্রেচারে করে মাঠ ছেড়ে যাওয়ার দৃশ্যটি আজও ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক মুহূর্তগুলোর একটি। ২০১৮-তে ফিরে এসেও অপূর্ণতা। ২০২২-এ ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে অসাধারণ গোল করার পরও টাইব্রেকারের নির্মম পরিণতি। প্রতিবারই মনে হয়েছে—হয়তো এবার। কিন্তু 'হয়তো' আর বাস্তবের দূরত্ব কখনোই ঘুচল না।
ট্রফি নয়, অনুভূতিই আসল সাফল্য
তবু নেইমার হেরে যাননি। কারণ, একজন ফুটবলারের সাফল্য শুধু ট্রফি দিয়ে মাপা যায় না। কোটি শিশুর মুখে হাসি ফোটানো, অসংখ্য তরুণকে ফুটবল ভালোবাসতে শেখানো, আর প্রতিপক্ষকেও বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতে বাধ্য করার নামও সাফল্য। ব্রাজিলের হলুদ জার্সিতে ১০ নম্বরটি অনেকেই পরেছেন। কিন্তু একটি প্রজন্মের কাছে এই নম্বর মানেই নেইমার। তাঁর ড্রিবলিং, সাহস আর অদম্য আত্মবিশ্বাস—সব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের শেষ মহান শিল্পীদের একজন।
এক যুগের অবসান, কিন্তু অমর গল্প
হয়তো বিশ্বকাপ ট্রফিটা তাঁর হাতে ওঠেনি। কিন্তু এমন অনেক কিংবদন্তি আছেন, যাঁদের উত্তরাধিকার বিশ্বকাপ ট্রফির চেয়েও বড়। নেইমার তাঁদেরই একজন। মেটলাইফ স্টেডিয়ামে উচ্চারিত সেই বাক্য কেবল একজন ফুটবলারের বিদায় নয়; এটি একটি যুগের শেষ অধ্যায়। 'আমি চেষ্টা করেছি। আমি চেষ্টা করেছি। মেটলাইফ স্টেডিয়াম থেকে শুরু করেছিলাম, এখানেই শেষ করলাম। এই অধ্যায় এখন শেষ।' হয়তো সত্যিই শেষ। কিন্তু ফুটবলের ইতিহাসে নেইমারের নাম লেখা থাকবে শেষ বাঁশির অনেক পরেও। কারণ, কিছু গল্প ট্রফি দিয়ে নয়, অনুভূতি দিয়ে অমর হয়ে থাকে। আর সেই গল্পগুলোর একটি নাম—নেইমার জুনিয়র।



