বিশ্ব ফুটবলে আফ্রিকার জাগরণ: মরক্কো থেকে কেপ ভার্দে, বদলে যাচ্ছে ধারণা
বিশ্ব ফুটবলে আফ্রিকার জাগরণ: মরক্কো থেকে কেপ ভার্দে

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে মরক্কো প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে সেমিফাইনালে ওঠার পর ২০২৬ বিশ্বকাপে আফ্রিকার একাধিক দল নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে। বেলজিয়াম, স্পেন ও পর্তুগালের মতো ইউরোপীয় শক্তিকে হারিয়ে মরক্কো ইতিহাস গড়েছিল। এবার দক্ষিণ আফ্রিকা, কেপ ভার্দে, ডিআর কঙ্গো, মিসর, সেনেগাল, ঘানা ও আইভরিকোস্টও বড় দলের বিপক্ষে লড়াই করে দেখিয়েছে আফ্রিকার ফুটবল আর আগের জায়গায় নেই।

মরক্কোর পথ দেখানো

২০২২ সালের আগে আফ্রিকার কোনো দল কখনো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে খেলেনি। ক্যামেরুন (১৯৯০), সেনেগাল (২০০২) এবং ঘানা (২০১০) কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত গিয়ে থেমে গিয়েছিল। মরক্কোর সাফল্য পুরো মহাদেশের আত্মবিশ্বাসের পুনর্জন্ম ঘটায়। ২০২৬ বিশ্বকাপে মরক্কো আবারও নিজেদের অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রত্যাবর্তন

দীর্ঘ ১৬ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে আসে দক্ষিণ আফ্রিকা। ২০১০ সালে স্বাগতিক হিসেবে খেলার পর এবার তারা কঠিন বাছাইপর্ব পেরিয়ে নিজেদের যোগ্যতায় টিকিট নিশ্চিত করে। গ্রুপ পর্বে দক্ষিণ কোরিয়াকে ১-০ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো নকআউটে ওঠে। দলগত সমন্বয় ও শৃঙ্খলাই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কেপ ভার্দের চমক

মাত্র পাঁচ লাখের কিছু বেশি জনসংখ্যার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে প্রথমবার বিশ্বকাপে এসে সবাইকে চমকে দেয়। গ্রুপ পর্বে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন ও উরুগুয়ের বিপক্ষে ড্র করে নকআউট পর্বে জায়গা করে নেয়। নকআউট পর্বে বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ৩-২ গোলে হেরে বিদায় নেয়। ম্যাচ শেষে লিওনেল মেসি বলেন, 'বিশ্বকাপে কেউ কাউকে বিনা লড়াইয়ে কিছু ছেড়ে দেয় না।'

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ডিআর কঙ্গোর প্রত্যাবর্তন

১৯৭৪ সালের পর ২০২৬ বিশ্বকাপে ফিরে আসে ডিআর কঙ্গো। দীর্ঘ পরিকল্পনা ও ইউরোপে খেলা কঙ্গোলিজ বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের অন্তর্ভুক্তির ফলে দলটি ধীরে নিজেদের গুছিয়ে তোলে। প্রতিটি ম্যাচে লড়াই করে তারা পুরো আফ্রিকাকে মনে করিয়ে দেয় যে এই দেশের ফুটবলে এখনো অনেক সম্ভাবনা রয়েছে।

মিসরের ধৈর্য ও কৌশল

সাতবার আফ্রিকা কাপ অব নেশনস জয়ী মিসর ২০২২ বিশ্বকাপে না খেলতে পারার হতাশা কাটিয়ে ২০২৬ সালে ফিরে আসে। রাউন্ড অব সিক্সটিনে আর্জেন্টিনাকে প্রায় হারিয়ে দিয়েছিল তারা। অভিজ্ঞতা ও তরুণদের সমন্বয়ে গড়া স্কোয়াড ধৈর্য ধরে খেলে এবং কৌশলগত দৃঢ়তা দেখায়।

সেনেগালের ধারাবাহিকতা

২০০২ সালে বিশ্বকাপে অভিষেকেই কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা সেনেগাল ২০২২ ও ২০২৬ বিশ্বকাপেও নকআউট পর্বে খেলে ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে। দলগত ভারসাম্য, মানসিক দৃঢ়তা ও উচ্চগতির প্রেসিং তাদের অন্যতম শক্তি।

ঘানার নতুন প্রজন্ম

২০১০ সালের হৃদয়ভাঙা রাতের পর ঘানা ২০২৬ বিশ্বকাপে নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের নিয়ে এসেছে। তরুণদের সংখ্যা বেশি থাকায় দলে গতি ও সাহস ছিল। প্রতিটি ম্যাচে প্রতিপক্ষকে কঠিন চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, আগামী কয়েক বছরে ঘানা আবারও আফ্রিকার অন্যতম সেরা দলে পরিণত হতে পারে।

আইভরিকোস্টের পুনরুত্থান

দ্রগবা-ইয়ায়া তুরের সোনালি প্রজন্ম বিদায় নেওয়ার পর আইভরিকোস্ট ২০২৬ বিশ্বকাপে নতুন পরিচয়ে হাজির হয়। আক্রমণে গতি, মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ ও রক্ষণে দৃঢ়তা—সব মিলিয়ে তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ফুটবল উপহার দিয়েছে। ইউরোপের শীর্ষ লিগে খেলা খেলোয়াড়দের অভিজ্ঞতা তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে।

পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের ফল

গত এক দশকে আফ্রিকার অনেক দেশ ফুটবলে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। আধুনিক প্রশিক্ষণকেন্দ্র, তরুণদের জন্য একাডেমি ও ইউরোপে বেড়ে ওঠা আফ্রিকান বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের জাতীয় দলে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৬ বিশ্বকাপে আফ্রিকা থেকে রেকর্ডসংখ্যক দল অংশ নেয় এবং অধিকাংশই গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে নকআউটে ওঠে।

ভবিষ্যতের সম্ভাবনা

ফুটবল–বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আফ্রিকার দলগুলোর এই পরিবর্তন হঠাৎ করে আসেনি। বয়সভিত্তিক ফুটবলে বিনিয়োগ, আধুনিক প্রশিক্ষণব্যবস্থা ও ইউরোপের শীর্ষ লিগে নিয়মিত খেলা আফ্রিকান ফুটবলারদের অভিজ্ঞতার ফল এখন স্পষ্ট। একসময় যেসব দলকে শুধু শারীরিকভাবে শক্তিশালী বলা হতো, এখন তারা ট্যাকটিক্যালি পরিণত ও মানসিকভাবে দৃঢ়। আগামী এক দশকের মধ্যে বিশ্বকাপের শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবে আফ্রিকার কোনো দলকে দেখা অবাক করার মতো হবে না।