ফুটবলে শক্তি হিসেবে আবির্ভাবের ঘটনা কখনও হঠাৎ করে ঘটে না। এর পেছনে লাগে বহু বছরের নিবেদন, পরিকল্পনা এবং অবশ্যই বিনিয়োগ। যার ধারাবাহিকতায় উঠে এসেছে মরক্কোও। যাদের ফুটবলে দীর্ঘদিনের বিনিয়োগের সুফল মিলতে শুরু করেছে। ২০০৮ সাল থেকে দেশটির বাদশাহ ষষ্ঠ মোহাম্মদের দূরদর্শী পরিকল্পনায় ফুটবলকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে।
মোহাম্মদ ষষ্ঠ ফুটবল একাডেমির ভূমিকা
সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই ২০১০ সালে যাত্রা শুরু করে মোহাম্মদ ষষ্ঠ ফুটবল একাডেমি। দেশের সব স্তরে একটি অভিন্ন ফুটবল সংস্কৃতি গড়ে তোলাই ছিল এর লক্ষ্য। অনেকের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে মরক্কোর সাফল্যের সবচেয়ে বড় ভিত্তি এই একাডেমিই।
এছাড়া অতীতের ব্যর্থতাও তাদের জাগাতে ভূমিকা রাখে। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছিল মরক্কো। এরপর ২০১৮ সালের আগে আর কোনো বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে পারেনি অ্যাটলাস লায়ন্স। ১৯৯০-এর দশকে আফ্রিকা কাপ অব নেশনসেরও তিনটি আসর মিস করেছিল তারা। প্রতিভা খোঁজা, খেলোয়াড় গড়ে তোলা এবং পেশাদার ফুটবল কাঠামো—সব ক্ষেত্রেই সুসংগঠিত পরিকল্পনার অভাবই ছিল এমন হতাশাজনক ফলের মূল কারণ।
ফাউজি লেকজার নেতৃত্বে পরিবর্তন
তবে সেই চিত্র পাল্টাতে শুরু করে রয়্যাল মরোক্কান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি ফাউজি লেকজার নেতৃত্বে নেওয়া দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের মাধ্যমে। ২০১৭ সালে লেকজা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মরক্কোর ফুটবলে আমূল পরিবর্তন আসে। বয়সভিত্তিক দল থেকে শুরু করে পুরুষ ও নারী ফুটবল, সব পর্যায়ে একই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়।
যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ। প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়ে মরক্কো। এর ৩৬ বছর আগে আফ্রিকার প্রথম দল হিসেবে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব পেরিয়ে নকআউটে ওঠার কীর্তিও গড়েছিল তারা।
তবে সেই সেমিফাইনালের পথ মোটেও সহজ ছিল না। গ্রুপ পর্বে বেলজিয়ামকে হারানোর পর নকআউটে স্পেন ও পর্তুগালের মতো ইউরোপীয় পরাশক্তিকে বিদায় করে শেষ চারে ওঠে মরক্কো। শেষ পর্যন্ত তাদের যাত্রা থামে ফ্রান্সের কাছে।
অলিম্পিক ব্রোঞ্জ ও যুব বিশ্বকাপ জয়
প্রায় দেড় বছর পর ২০২৪ প্যারিস অলিম্পিকে তারিক সেকতিউইয়ের অধীনে আবারও নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দেয় মরক্কো। ব্রোঞ্জপদক জিতে তারা দেখিয়ে দেয়, কাতার বিশ্বকাপের সাফল্য কোনো দুর্ঘটনা ছিল না। সেমিফাইনালে তারা হেরেছিল এমন এক স্পেন দলের কাছে, যেখানে ছিলেন ফেরমিন লোপেস, পাও কুবার্সি, আলেক্স বায়েনা ও পাবলো বারিওসের মতো লা লিগার প্রতিষ্ঠিত তারকারা।
তবে মরক্কোতে একটি বিষয় সবাই স্বীকার করেন যে, এই সাফল্যের বড় অংশ এসেছে ইউরোপে বেড়ে ওঠা প্রবাসী ফুটবলারদের হাত ধরে। কাতার বিশ্বকাপে মরক্কোর দলে থাকা প্রায় ৭০ শতাংশ খেলোয়াড়ই ইউরোপে জন্মেছেন, সেখানে বেড়ে উঠেছেন অথবা ইউরোপীয় ক্লাবে খেলেন। মরক্কোর সবচেয়ে বড় তারকা আশরাফ হাকিমি স্পেনে জন্মেছেন এবং খেলছেন প্যারিস সেন্ত জার্মেইতে।
তবে এখন দেশের মাটিতেই আরও বেশি ফুটবলার তৈরি করার দিকে মনোযোগ রয়েছে তাদের। স্থানীয় পর্যায়ে স্কাউটিং উন্নত হয়েছে, আর গত বছরের শুরুতে চিলিতে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জিতে তার প্রমাণ দিয়েছে তারা। আর্জেন্টিনাকে ২-০ গোলে হারিয়ে জেতা সেই ফাইনালে শুরুর একাদশের চারজনই ছিলেন মোহাম্মদ ষষ্ঠ ফুটবল একাডেমির ছাত্র—ফুয়াদ জাহুয়ানি, ইয়াসিন খালিফি, হোসাম এসসাদাক এবং ইয়াসির জাবিরি। জাবিরিই করেছিলেন ম্যাচের দুটি গোল এবং হয়েছিলেন ম্যাচসেরা।
বিশ্বকাপ বাছাই ও অবকাঠামো উন্নয়ন
আগামী বিশ্বকাপে ওঠার পথও ছিল একেবারে মসৃণ। বাছাইপর্বের আটটি ম্যাচের সবকটিই জিতেছে মরক্কো। করেছে ২২ গোল, হজম করেছে মাত্র দুটি। এবার তো মূল পর্বে তারা একের পর বাধা পার হয়ে নিশ্চিত করেছে কোয়ার্টার ফাইনাল। শুধু কি তাই? টানা দ্বিতীয় আসরে তাদের দাপুটে ফুটবল নতুন শক্তির-ই জানান দিচ্ছে।
এদিকে অবকাঠামো উন্নয়নও চলছে দ্রুতগতিতে। যার স্বীকৃতিও মিলেছে আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থাগুলোর কাছ থেকে। ২০২৫ আফ্রিকা কাপ অব নেশনস, ২০২৬ নারীদের আফ্রিকা কাপ অব নেশনস এবং স্পেন-পর্তুগালের সঙ্গে যৌথভাবে ২০৩০ বিশ্বকাপ আয়োজন করবে মরক্কো।
রাবাতের প্রিন্স মুলাই আবদেল্লাহ স্টেডিয়াম, তাঞ্জিয়ারের ইবনে বতুতা স্টেডিয়াম, আগাদিরের আদরার স্টেডিয়াম এবং কাসাব্লাঙ্কার মোহাম্মদ পঞ্চম স্টেডিয়াম ইতোমধ্যেই আধুনিকায়ন করা হয়েছে।
তবে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নির্মাণাধীন হাসান দ্বিতীয় স্টেডিয়াম। ২০২৮ সালে শেষ হওয়ার কথা এই স্টেডিয়ামের নির্মাণকাজ। ১ লাখ ১৫ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার এই ভেন্যু হবে মরক্কো জাতীয় দলের নতুন ঠিকানা এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ স্টেডিয়াম। শুধু ফুটবল নয়, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আয়োজনেও ব্যবহৃত হবে এটি।
নারী ফুটবলের অগ্রগতি
নারী ফুটবলও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে মরক্কোতে। ২০২৪ নারী আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে স্বাগতিক হিসেবে ফাইনালে উঠেছিল অ্যাটলাস লায়নেসরা। যদিও ৮৮ মিনিটে জেনিফার এচেগিনির গোলে ৩-২ ব্যবধানে নাইজেরিয়ার কাছে হেরে রানার্সআপ হয় তারা। আগামী আসরে আবারও স্বাগতিক হিসেবে এবার শিরোপা জয়ের লক্ষ্য তাদের।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, তরুণ প্রতিভা গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক সাফল্য। সব মিলিয়ে মরক্কোর ফুটবল এখন নিজেদের ইতিহাসে অন্যতম সেরা সময় পার করছে।



