ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে পর্তুগাল বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর টিকিট কেটেছে ঠিকই, কিন্তু এই ম্যাচ দিয়ে ক্রোয়েশিয়ার তারকা মিডফিল্ডার লুকা মদরিচের বিশ্বকাপ যাত্রা শেষ হয়ে গেল। আগামী বিশ্বকাপে তাঁকে আর দেখা যাবে কি না, তা নিয়ে ঘোর সংশয় রয়েছে। তবে একজন ফুটবল কোচ হিসেবে ম্যাচটার দিকে তাকালে জয়-পরাজয়ের ঊর্ধ্বে কিছু ট্যাকটিক্যাল বিষয়, মদরিচের বিদায় এবং ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে নিয়ে একটি বড় প্রশ্ন সামনে চলে আসে।
মদরিচ: সাইলেন্ট লিডারের বিদায়
আক্রমণে ফাইনাল পাস দেওয়া, মাঝমাঠে বল হোল্ড করা বা রক্ষণে সহায়তা—সবকিছুতেই মদরিচ অনন্য। চারজন খেলোয়াড় ঘিরে ধরেছে অথচ মাথা ঠান্ডা রেখে বলটা বের করে ঠিকঠাক পাস দিয়ে দিচ্ছেন, এমন কঠিন পরিস্থিতি তিনি অনায়াসে সামলান। এ ম্যাচেও মদরিচ ভালো খেলেছেন। কখনো কখনো মনে হয়, মদরিচের ফুসফুস বোধ হয় দুটি! নইলে পুরো মাঠ একই ছন্দে, একই তালে চষে বেড়ান কীভাবে! তাঁকে একজন ‘সাইলেন্ট লিডার’ বলা যায়। কোনো হাঁকডাক নেই, কিন্তু বছরের পর বছর মাঝমাঠে রাজত্ব করে যাচ্ছেন। পুরো দল তাঁকে অনুসরণ করে। আধুনিক ফুটবলে যে ‘ডাবল পিভট’ ধারণা, তা সম্ভবত মদরিচই জনপ্রিয় করেছেন। মদরিচের মতো খেলোয়াড় থাকলে ‘ডাবল পিভট’ কৌশলটা বেশি কার্যকর হয়। ম্যাচ শেষে মদরিচকে সান্ত্বনা জানান রোনালদো।
পর্তুগালের উইং প্লে: সমস্যা ও সমাধান
এবার আসা যাক ম্যাচের ট্যাকটিক্যাল বিশ্লেষণে। এই ম্যাচের অনেকটা সময় পর্তুগাল যেভাবে উইং প্লে করেছে, তা মোটেও তাদের নামের সঙ্গে যায় না। প্রথমার্ধে তাদের দুই উইঙ্গার ছিলেন রাফায়েল লিয়াও ও পেদ্রো। তাঁদের খেলায় একটা প্রবণতা ছিল—তাঁরা উইং ধরে না এগিয়ে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভেতরের দিকে ঢুকে খেলতে আগ্রহী ছিলেন। ফলে বল উইংয়ের ঠিকঠাক পজিশনে না নিয়েই তাঁরা মাঝখানে ছাড়ছিলেন। সেখান থেকে দু-একটা সুযোগ হয়তো তৈরি হয়েছে, কিন্তু এই স্তরের ম্যাচ জেতার জন্য তা যথেষ্ট ছিল না। তা ছাড়া হাফ স্পেসেও পর্তুগালের পর্যাপ্ত খেলোয়াড় ছিল না ম্যাচের একটা লম্বা সময়।
কোচের কৌশলগত পরিবর্তন
পর্তুগাল ম্যাচটা শুরু করেছিল ৪-২-৩-১ ছকে। কিন্তু ম্যাচের ৬৩ মিনিটে কোচ রবার্তো মার্তিনেজ একাদশে একটি কৌশলগত পরিবর্তন আনেন। তিনি রাইট ব্যাক কানসেলোকে তুলে আক্রমণভাগ শক্তিশালী করতে রামোসকে মাঠে নামান। তার ফলও এসেছে। তখন তারা তিন ব্যাকে চলে যান এবং ফরমেশন দাঁড়ায় ৩-২-৪-১। এই ট্যাকটিক্যাল পরিবর্তনের পর পর্তুগালের খেলোয়াড়েরা হাফ স্পেসে অনেক সময়ই বল নিয়ে দ্রুত আক্রমণ করেছেন। এ সময় কিছু কার্যকর ক্রসও হয়েছে।
রক্ষণভাগের দুর্বলতা
তবে পর্তুগালের রক্ষণ লাইন নিয়ে কিছুটা আপত্তি আছে। মনে হয়েছে রক্ষণভাগ যথেষ্ট সজাগ ছিল না। ক্রোয়েশিয়ার গোলটার জন্য তাদের উইং ব্যাকরাই দায়ী। তারা খানিকটা গা-ছাড়া ছিল মনে হয়েছে। না হলে আন্তর্জাতিক ফুটবলের এই পর্যায়ে এমন গোল কোনোভাবেই হজম করার কথা নয়।
ক্রোয়েশিয়ার ক্লান্তি ও ভারসাম্যহীনতা
অন্যদিকে ক্রোয়েশিয়ার হারের পেছনে বড় কারণ ছিল তাদের ক্লান্তি। মাঠে মাঝেমধ্যেই তাদের ক্লান্ত লেগেছে, মনে হচ্ছিল ম্যাচের ওপর থেকে মনোযোগ হারাচ্ছে। যখন আক্রমণে উঠছিল, তখন দলগত কাঠামো ঠিক ছিল না। রক্ষণ লাইনেও কোনো ভারসাম্য ছিল না। ‘ভারসাম্য’ বলতে বোঝাচ্ছি—একজন প্রেসিংয়ে গেলে অন্যজন কভারিংয়ে থাকবে এবং আরেকজন সাপোর্টিং পজিশনে যাবে। এই চেইনটা ক্রোয়েশিয়ার ঠিকঠাক হচ্ছিল না। তাদের ম্যান মার্কিং ভালো হলেও বলের ফ্লাইট বুঝতে ডিফেন্ডাররা অনেক সময়ই ভুল করেছেন।
রোনালদো: আধুনিক ফুটবলে স্ট্রাইকারের ভূমিকা
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে নিয়ে কিছু কথা বলতেই হয়। পেনাল্টি থেকে তিনি একটি গোল পেয়েছেন। কিন্তু একটা ব্যাপার বিশেষভাবে বলব—আধুনিক ফুটবলে এখন স্ট্রাইকারদেরও দলের প্রয়োজনে নিচে নেমে রক্ষণকে সহায়তা করতে হয়। রোনালদোর কাছ থেকে এই জিনিসটা তেমন দেখছি না। জানি না এটা কোচের নির্দেশনা কি না। তবে দল রক্ষণের সময় কিছুটা ভুক্তভোগী হচ্ছে।
রোনালদোর খেলার সময় নিয়ে বিতর্ক
রোনালদো এ ম্যাচে ৮১ মিনিট পর্যন্ত খেলেছেন। তাঁকে এতটা সময় খেলানো উচিত কি না, এমন প্রশ্ন অনেকেই করেন। একজন কোচ হিসেবে মত এখানে খুব স্পষ্ট—দলের যতক্ষণ পর্যন্ত তাঁকে মাঠে প্রয়োজন, ঠিক ততক্ষণই রোনালদোর মাঠে থাকা উচিত। তার বেশি এক মিনিটও নয়।
স্পেনের উন্নতি: ক্রসিং ও ট্রানজিশন
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে স্পেন ভালো খেলেছে। তাদের যে বড় দুর্বলতা ছিল ক্রসিং আর ট্রানজিশনে, সেটা অস্ট্রিয়া ম্যাচে দেখা যায়নি। এ ম্যাচে তারা ৩৩টি ক্রস করছে। সাধারণত ম্যাচে গড়ে স্পেনের পাস থাকে ৭৫০-এর বেশি, কিন্তু এ ম্যাচে সেটা ৫৭০টি। এর অর্থ আড়াআড়ি পাস কমিয়ে সামনের দিকেই বেশি খেলেছে তারা।



