বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিপক্ষে জাপানের ১০০ বাচ্চার কৌশল
বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিপক্ষে জাপানের কৌশল

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েক বছর আগের একটা ভিডিও হয়তো তোমার চোখে পড়ে থাকবে। জাপানের তিনজন জাতীয় দলের ফুটবলার—হোতারু ইয়ামাগুচি, হিরোশি কিয়োতাকে ও ইয়োসুকে ইদেগুচি একটা মাঠে খেলছেন ১০০ জন স্কুলপড়ুয়া বাচ্চার বিপক্ষে! শুনতে বেশ মজার মনে হলেও ভিডিওটা কিন্তু দারুণ। তুমি অবাক হয়ে দেখবে, ওই তিন ফুটবলার ১০০ জন বাচ্চার ভিড় সামলে ঠিকই একে অপরকে পাস দিচ্ছেন। তাঁদের কৌশলটা ছিল একদম সোজা। ১০০ জন বাচ্চা সব সময় বলের দিকে ছুটে আসত, এই সুযোগে ওই তিন খেলোয়াড় বলটা মাঠের একদম অন্য প্রান্তে পাস করে দিতেন, যেখানে তাঁদের একজন ফাঁকায় দাঁড়িয়ে থাকতেন। বাচ্চারা পজিশন নিয়ে খেলতে জানে না, তাই তাদের বোকা বানানো সহজ। কিন্তু আসল চমকটা অন্য জায়গায়। বর্তমান জাপান জাতীয় দল যখন প্রতিপক্ষের ১১ জন পরিণত খেলোয়াড়ের বিপক্ষে মাঠে নামে, তখনো তারা ঠিক এ কৌশলটাই কাজে লাগায়!

জাপানের আক্রমণভাগের কৌশল

জাপান সাধারণত ৩-৪-৩ ফরমেশনে খেলে। কিন্তু যখন তারা আক্রমণে যায়, তখন সামনের দিকে পাঁচজন খেলোয়াড় থাকে। তাদের মূল লক্ষ্য থাকে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের দৃষ্টির আড়ালে ফাঁকায় থাকা একজন খেলোয়াড়কে খুঁজে বের করা এবং হুট করে মাঠের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে বল পাঠিয়ে দেওয়া। ১০০ বাচ্চার বিপক্ষে যে কৌশল কাজে লেগেছে, পেশাদারদের বিপক্ষে তার ১০ শতাংশ কাজে লাগলেও তো অনেক!

উইংব্যাকদের বিশেষত্ব

জাপানের উইংব্যাকদের একটা মজার বৈশিষ্ট্য আছে। রাইটব্যাক রিতসু দোয়ান খেলেন ডান দিকে; কিন্তু তিনি বাঁ পায়ের খেলোয়াড়। আবার লেফটব্যাক কেইতো নাকামুরা খেলেন বাঁ দিকে; কিন্তু তিনি ডান পায়ের খেলোয়াড়। ফলে তাঁরা শুধু দৌড়ে গিয়ে ক্রসই করেন না; বরং যেকোনো সময় ভেতরের দিকে ঢুকে শট নিতে পারেন বা দারুণ সব কোনাকুনি পাস দিতে পারেন। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে নাকামুরা এভাবেই ভেতরে ঢুকে গোল করেছিলেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সুইডেন ম্যাচের উদাহরণ

সুইডেনের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচটার কথাই ধরো। ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে মিডফিল্ডার দাইচি কামাদা বাঁ দিক থেকে বল পেয়ে ডান পায়ে ক্রস করেন ডান দিকের উইংব্যাক ইউকিনারি সুগাওয়ারার উদ্দেশে। বল মাটিতে পড়ার পর সুইডেন কোনোমতে সেটা ক্লিয়ার করে; কিন্তু বল পেয়ে যান আও তানাকা। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বলটা আবার বাঁ দিকে ফাঁকায় থাকা কামাদাকে দেন। কামাদা জোরালো কিক করলেও সেটা গোলরক্ষক আটকে দেন। জাপানের খেলাটাই এমন, মাঠের অন্য প্রান্তে সব সময় তাদের একজন খেলোয়াড় ফাঁকায় দাঁড়িয়ে থাকেন।

ব্রাজিলের দুর্বলতা

কিন্তু এটা কেন ব্রাজিলের জন্য বিপদের? ব্রাজিলের সঙ্গে জাপানের এই কৌশল দারুণ কাজে লাগতে পারে। কারণ, এই মুহূর্তে সেলেসাওদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তাদের ফুলব্যাক পজিশন। রাইটব্যাক দানিলোর বয়স টুর্নামেন্ট শেষ হতে হতে ৩৫ ছুঁয়ে ফেলবে, আগের মতো সেই গতিশীল ফুলব্যাক তিনি আর নেই। লেফটব্যাক ডগলাস সান্তোসও ঠিক বিশ্বমানের নন। তবে সেন্ট্রাল ডিফেন্সে মার্কিনহোস ও গ্যাব্রিয়েল দারুণ শক্তিশালী। তাই তাঁদের সঙ্গে বাতাসে লড়াই না করে, তাঁদের মাথার ওপর দিয়ে বল মাঠের এপাশ-ওপাশ করাটাই জাপানের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

ব্রাজিলের সম্ভাব্য প্রতিরোধ

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, জাপানের এই পাঁচজনের আক্রমণভাগকে ব্রাজিল সামলাবে কীভাবে? সাধারণত অন্য দলগুলো জাপানের এই কৌশল আটকাতে নিজেদের একজন মিডফিল্ডারকে নিচে নামিয়ে রক্ষণভাগে পাঁচজনের একটা দেয়াল তৈরি করে। নেদারল্যান্ডস যেমন ফ্রেঙ্কি ডি ইয়ংকে নিচে নামিয়ে এনেছিল। ব্রাজিলের হয়ে এই কাজটা কে করবেন? কাসেমিরো কি ডি ইয়ংয়ের মতো নিচে নামবেন? নাকি তরুণ রায়ানকে ডান দিকে খেলিয়ে এই দায়িত্ব দেওয়া হবে? কিংবা ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলত্তি কি আদৌ এটাকে কোনো সমস্যা বলে মনে করেন?

বিশ্বকাপের ইতিহাস ও জাপানের সম্ভাবনা

ফুটবলকে বিশ্বজনীন খেলা বলা হলেও, বিশ্বকাপ কিন্তু এখনো মূলত পশ্চিম ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার দলগুলোর দখলেই আছে। অন্যদিকে জাপানকে সব সময়ই সম্ভাবনাময় দল হিসেবে ধরা হয়। তাদের চমৎকার সব কৌশল ও খেলোয়াড়দের মধ্যকার বোঝাপড়া দেখে অন্য কোচরাও অবাক হন। কিন্তু বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জাপান আগে কখনোই কোনো ম্যাচ জেতেনি। এবার যদি তারা বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিলকে বিদায় করে দিতে পারে, তবে সেটা হবে বিশাল এক অর্জন। আর কৌশলগত দিক থেকে বিচার করলে, ব্রাজিলের বিপক্ষে জাপানের এই ১০০ বাচ্চার কৌশল নিখুঁতভাবে কাজে লেগেও যেতে পারে!