যুক্তরাষ্ট্র নানাভাবে ইরানকে দমাতে চেয়েছে, লাঞ্ছিত করেছে। চেয়েছে অপমান করে হারিয়ে দিতে। আর ফিফা গোটা সময়টায় ছিল ঠুঁটো জগন্নাথ।
মহাকাব্যের নায়কের মতো লড়াই
মহাকাব্যের নায়কেরা নাকি সব সময় হেরে যান। দাবিটার সঙ্গে চুলচেরা হিসাব–নিকাশ করা একাডেমিকরা একমত না হলেও মিথের জন্মের জন্য পরাজিত নায়ক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নিজেদের সবটা দিয়ে তাঁরা মানবতাকে জিতিয়ে দেন, নিষ্ঠুর এই দুনিয়ার সব ক্রূরতাকে উন্মোচন করে ক্রুশবিদ্ধ মহানায়কেরা জাগতিক সব পাপ গায়ে মেখে পাপী–তাপীদের আরেকটা সুযোগ করে দেন।
এ দুনিয়ার নোংরাগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইরত এই বীরেরা আমাদের জন্য আশা জ্বালিয়ে দিয়ে যান লড়াইয়ের, প্রেরণা দেন নতুন স্বপ্নের। এ কারণেই মানুষের ইতিহাসে মিথ সবচেয়ে জরুরি, জরুরি মহাকাব্যের নায়কেরা। কিন্তু মহাকাব্যের নায়ক কি কেবল প্রাচীন যুগের মিথের গল্পেই থাকে?
আধুনিক যুগে কি মহাকাব্যের নায়কেরা জন্মান না? অবশ্যই জন্মান। আমাদের চোখের সামনেই তেমনই একদল মহানায়ককে আমরা দেখলাম শক্তিমানদের সব নোংরামির বিরুদ্ধে নিজেদের সবটা দিয়ে লড়াই করতে। শেষ পর্যন্ত তাঁরা জ্বলেপুড়ে মরে ছারখার হন, কিন্তু তাঁরা মাথা নোয়ান না।
ইরানের প্রতিরোধগাথা
‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’–এর বুড়োটার মতো তাঁদের ধ্বংস করা হয়, কিন্তু তাঁদের হারানো যায় না। হাজার হাজার বছরের ইতিহাসের ধারাকে বজায় রেখে সম্রাট দারিউস দ্য গ্রেটের উত্তরপুরুষেরা আমাদের সামনে দেদীপ্যমান হয়ে ওঠেন। আমাদের আধুনিক মহাকাব্যের নায়ক হয়ে ওঠে ইরানি ফুটবল দল।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় আসর বিশ্বকাপ ফুটবল এবার আয়োজিত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে। এর আয়োজক ফিফা, যাদের সদস্যসংখ্যা জাতিসংঘের চেয়ে বেশি এবং যারা প্রায় ১০০ বছর আগে এই আসরের সূচনা করেছিল বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব আর মৈত্রীর মহান ব্রত নিয়ে, তারা পরিণত হয়েছে যেকোনো প্রকারে অর্থ ও ক্ষমতা অর্জনের লোভী দানবে।
ইউক্রেনে হামলার প্রতিবাদে ফিফা রাশিয়াকে নিষিদ্ধ করেছে, যদিও এই রাশিয়াই আয়োজক ছিল আট বছর আগে। পাশের দেশ ইউক্রেনে হামলার জন্য যদি রাশিয়া নিষিদ্ধ হতে পারে, বহুদূরের দেশ ইরানে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রেরও নিষিদ্ধ হওয়ার কথা। তবে একচক্ষু দানব সাইক্লপসের মতো ফিফা বিশ্বমোড়লদের ঘাঁটায় না, উল্টো তাদের তোষামোদ করে। কেবল অন্যায় যুদ্ধই নয়, মেনে নেয় সব অন্যায় আচরণও।
ট্রাম্পের উন্মাদনা ও বিপুল হামলার পরও ইরানকে ধ্বংস করা যায়নি। উল্টো তারা অনবদ্য প্রতিরোধগাথা রচনা করেছে। শুধু তা–ই না, বৈশ্বিক চেতনাকে সম্মান জানাতে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির ফুটবল দল অংশ নিয়েছে বিশ্বকাপে।
ভিসা জটিলতা ও বাধা
যেহেতু গ্রুপ পর্বের তিনটি খেলাই যুক্তরাষ্ট্রে, তাই স্বাভাবিকভাবেই ইরানের ফুটবল ফেডারেশন শুরুতে সে দেশের অ্যারিজোনায় প্রশিক্ষণ ক্যাম্প স্থাপনের পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু ভিসা জটিলতার কারণে এ সিদ্ধান্ত বদলাতে হয়। প্রশাসনিক ও কারিগরি কর্মীদের ভিসা প্রদানে অনিশ্চয়তার কারণে দলটি শেষ পর্যন্ত মেক্সিকো সীমান্তের কাছে তিহুয়ানায় তাদের বেস স্থাপন করতে বাধ্য হয়।
ইরান দল তুরস্কের আনতালিয়ায় প্রায় তিন সপ্তাহ প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর তিহুয়ানায় আসে। খেলোয়াড়দের মার্কিন ভিসা দেওয়া হয়েছিল প্রথম ম্যাচের মাত্র ১০ দিন আগে। তবে দলের মোট ১৪ জন সাপোর্ট স্টাফ সদস্যকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ভিসা দেওয়া হয়নি। ফিফা এ ব্যাপারে কিছুই করতে পারেনি।
টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় বৈষম্যগুলোর একটি হলো ইরান দলকে প্রতিটি ম্যাচের আগে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে হতো এবং ম্যাচ শেষ হওয়ার পরপরই ফিরে যেতে হতো। ইরানকে প্রতিটি ম্যাচের মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগে ভেন্যুতে যাওয়ার এবং ম্যাচ শেষ হওয়ার পরপরই তিহুয়ানায় ফিরে যাওয়ার বিধান মেনে চলতে হচ্ছিল। বিশ্বকাপের মতো আসর তো দূরের কথা, অখ্যাত লীগের খেলোয়াড়দেরও খেলার পর রিকভারি সময় লাগে। তা না পেলে শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে।
ইরানের কোচ আমির গালেনোয়ি বলেন, ‘যখন আপনি একটি ম্যাচ খেলেন, শারীরিকভাবে আপনি পরে দুর্বল থাকেন। আর যদি সঙ্গে সঙ্গে তিন ঘণ্টার ফ্লাইটে উঠতে হয়, তাহলে রিকভারি প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়। তারা এটা তিনবার করেছে। তাদের আচরণ সত্যিই ভয়াবহ ছিল।’
এই কাজ টুর্নামেন্টের বিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক, যুক্তরাষ্ট্রের ক্রোধ আর ফিফার সাক্ষী গোপাল আচরণের নির্মম শিকার হন ইরানিরা।
মাঠের ভেতরে-বাইরে বৈষম্য
প্রথম ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ২-২ গোলে ড্র করার পরপরই ইরান দলকে মার্কিন কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিকভাবে তিহুয়ানায় ফিরে যেতে আদেশ দেন। উইঙ্গার মেহেদি তোরাবির সিঙ্গেল এন্ট্রি ভিসা তিনি তিহুয়ানায় ফিরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যায়। পরে আলোচনার মাধ্যমে তার জন্য মাল্টি এন্ট্রি ভিসা আবার ইস্যু করে। তবে এই চাপান–উতোরে দলের প্রস্তুতিতে চাপ পড়ে।
শক্তিশালী বেলজিয়ামের সঙ্গে অনবদ্য খেলা উপহার দিয়ে ইরান গোলশূন্য ড্র করে। ইরানের গোলরক্ষক আলীরেজা বেইরানভেন্দকে অনেকে তুলনা দেন হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়া পারস্য যোদ্ধাদের সঙ্গে।
প্রথম দুটি ম্যাচের পর তীব্র সমালোচনার মুখে মিসরের সঙ্গে ম্যাচের আগে মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ জানায়, ইরানকে সিয়াটলের ম্যাচের দুই দিন আগে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে, তবে ম্যাচের পর আবার ফিরে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকবে। ইরান দলকে তিনটি গ্রুপ ম্যাচের পরেই রাত্রিযাপন না করে তিহুয়ানায় ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়।
শুধু দলই নয়, সমর্থকদের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ট্র্যাভেল ব্যান ইরানের সাধারণ সমর্থকদের বিশ্বকাপে আসার পথ বন্ধ করে দেয়। খেলোয়াড়, কোচ ও মূল সাপোর্ট স্টাফদের জন্য ছাড় দেওয়া হলেও দ্বৈত নাগরিকত্ব ও বৈধ ভিসা ছাড়া সাধারণ ইরানি ভক্তরা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারেনি। আরেকটা বড় ধাক্কা ছিল টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র কয়েক দিন আগে ইরানের ফুটবল ফেডারেশনের টিকিট বরাদ্দ বাতিল করা হয়। ফলে যেসব সমর্থক ইতিমধ্যে ভ্রমণের ব্যবস্থা করে ফেলেছিলেন, তাঁরা সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায় পড়েন। ম্যাচ চলাকালে প্রেসবক্সে ইরানি সংবাদমাধ্যমেরও কোনো উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ছিল না।
পতাকা বিতর্ক ও শেষ লগ্নের নাটক
এর আগে ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর ইরানি ফুটবল ফেডারেশন ঘোষণা দেয়, তারা ৫ ডিসেম্বরের বিশ্বকাপ ড্র অনুষ্ঠান বর্জন করবে। কারণ, ফেডারেশনের সভাপতি মেহদি তাজকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ভিসা দেওয়া হয়নি। দলের মাত্র চারজন সদস্য এই অনুমোদন পান।
এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে ফিলিস্তিনের পতাকার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া ফিফা বিশ্বকাপের মাঠে ইরানের ঐতিহাসিক ‘লায়ন অ্যান্ড সান’ পতাকা নিষিদ্ধ করে। তবু সোফাই স্টেডিয়ামে বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে ম্যাচে বিপুলসংখ্যক ইরানি সমর্থক নিষিদ্ধ পতাকা নিয়ে ঢুকে পড়েন। ফিফার অতিরিক্ত নিরাপত্তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা সত্ত্বেও মাঠজুড়ে লায়ন অ্যান্ড সান পতাকা ছড়িয়ে পড়ে। ফুটবল মাঠের এই প্রতিরোধ অবশ্য নতুন নয়। সে এক বড় ইতিহাস।
মাঠের বাইরে তো বটেই, মাঠেও ছিল বৈষম্য। সবচেয়ে ন্যক্কারজনক ঘটনা দেখা যায় গ্রুপ পর্বের শেষ দিনে। আরেক গ্রুপে মুখোমুখি হয় অস্ট্রিয়া আর আলজেরিয়া। হিসাবটা এমন ছিল যে যদি খেলাটা ড্র হয়, তাহলে দুই দলই পরের রাউন্ডে যাবে, আর বাদ পড়বে ইরান। অন্যদিকে ড্র না হলে যে দল হারবে, সেই দল বাদ পড়বে আর দ্বিতীয় রাউন্ডে যাবে ইরান। এরপর যা হলো তা অনেক ফুটবলপ্রেমীর কাছে ন্যক্কারজনক।
দুই দলই নিজেদের মধ্যে রক্ষণাত্মক খেলতে থাকে, তবে দুই দলই দুইবার করে গোল দেয় আর খেলা ২-২ অবস্থায় শেষ হবে বলেই মনে হচ্ছিল। কিন্তু ইনজুরি টাইমের শেষ মিনিটের আলজেরিয়া নাটকীয়ভাবে একটি গোল দেয়। ইরানিরা উল্লাসে মেতে ওঠে। কিন্তু নাটকের তখনো বাকি। মরিয়া অস্ট্রিয়া সেন্টার থেকে বল নিয়ে বাঁ উইং ধরে আগায়, ক্রস করে এবং দারুণ হেডে গোল দিয়ে সমতা আনে। অস্ট্রিয়ার উল্লাসে বাদ পড়ে ইরান।
আপাতদৃষ্টিতে খুবই উত্তেজনাপূর্ণ মনে হলেও কেউ কেউ খেলাটিকে রেসলিং ম্যাচের সঙ্গে তুলনা দেন, যেখানে প্রবল উত্তেজনা থাকলেও আসলে পুরোটাই পাতানো। অস্ট্রিয়ার শেষ গোলের সময় আলজেরিয়াকে ম্যাচ জিততে স্রেফ কয়েক সেকেন্ড জানপ্রাণ দিয়ে রক্ষণ করা উচিত ছিল, অথচ দেখা যায়, দলের ছয়জন খেলোয়াড় উইংয়ের দিকে এগিয়ে যান, পেনাল্টি বক্স মোটামুটি ফাঁকা হয়ে যায় এবং গোলদাতা সহজ সুযোগ পান। এ পর্যায়ের খেলায় এহেন ভুল দৃষ্টিকটু, কারও কারও মতে ভীষণ সন্দেহজনক। তাঁরা যেন মেহেদি তারেমির কথার সঙ্গেই একমত হন, যিনি মনে করেন—ইরানকে যত দ্রুত সম্ভব বিশ্বকাপ থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।
ইরানের বার্তা: হার না মানা জয়
ইরানকে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় করা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র আর ফিফা হয়তো স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছে, কিন্তু আসল জয়টা তো ইরানই পেল; যে ইরান এত বাধার পরও মানুষে মানুষের মৈত্রীর জয়গান গেয়েছে আর অবিশ্বাস্য সহ্যক্ষমতা দেখিয়েছে। একটি ম্যাচেও না হারা ইরান ম্যাচ শেষে এমন এক বার্তা ড্রেসিংরুমে রেখে গেছে, যা কেবল নিজেদের উন্নত শিরের গর্বের কথাই বলেনি, তাতে ধন্যবাদ দিয়েছে সাধারণ মানুষকেও। কারণ, ইরানের মতো তাদেরও লড়াই শাসকগোষ্টীর বিপক্ষে।
বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে ড্রেসিংরুমে রেখে যাওয়া ইরানি দলের চিঠিতে লেখা ছিল:‘হাজার বছরের প্রাচীন পারস্য থেকে আজকের সভ্য ইরান পর্যন্ত ইরানের চেতনা আজও জীবন্ত ও অটল। আমরা গর্ব নিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসে এসেছিলাম, সম্মানের সঙ্গে খেলেছি এবং মর্যাদা নিয়ে বিদায় নিচ্ছি। লস অ্যাঞ্জেলেসকে তাদের আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ। আর ইরানের জন্য এই ১৮০ মিনিটে যাঁরা হৃদয়, কণ্ঠ ও আত্মা উজাড় করে সমর্থন দিয়েছেন, সেই প্রত্যেক ইরানিকে ধন্যবাদ। পৃথিবীর সব জাতির মধ্যে শান্তি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠিত হোক।’
ইরানের এই হার না–মানা হার আসলে বিশ্বকাপ জয়ের সমান। ইরানের এই বার্তা আমাদের বিশ্বকাপ ট্রফি। মহাকাব্যের নায়কদের মতো ইরানিরা নিজেরা বিদায় নিয়ে আমাদের জন্য রেখে গেছে লড়াইয়ের দুর্দান্ত অনুপ্রেরণার গল্প।



