প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে দেশের প্রথিতযশা সংগীতশিল্পী ফেরদৌসী রহমানের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘লোকে বলে প্রেম, আমি বলি জ্বালা’। গত ২৮ জুন ছিল তাঁর ৮৫তম জন্মদিন। ঠিক এদিনই তাঁর হাতে বইটি তুলে দিতে প্রথমা প্রকাশনের পক্ষ থেকে শিল্পীর বাসভবনে যান প্রথম আলোর হেড অব কালচারাল প্রোগ্রাম কবির বকুল ও প্রথম আলো ট্রাস্টের সমন্বয়ক মাহবুবা সুলতানা।
জন্মদিন উদযাপনের স্মৃতি
ফেরদৌসী রহমানের জন্মদিন বাড়িতে সেভাবে উদযাপন করা হতো না। তাঁর বড় ভাই (সাবেক প্রধান বিচারপতি) মোস্তফা কামালের (১৯৩৩-২০১৫) জন্মদিনে হইচই হতো, গান-কবিতা হতো, খাওয়াদাওয়া হতো। বাবা তাঁর মেয়ের জন্মদিন প্রথম উদযাপন করেন সেদিন, যেদিন তিনি ম্যাট্রিকে স্ট্যান্ড করলেন। সারা দেশে মেয়েদের মধ্যে প্রথম। সম্মিলিত মেধাতালিকায় সপ্তম।
সেবার কেক কাটা, বেলুন-ফেস্টুন ওড়ানো—সেসবের কিছুই হয়নি। সবাই মিলে আনন্দ করেছিলেন। হয়েছিল গানবাজনা, গল্পসল্প। ফেরদৌসী রহমানের অনেক বন্ধু গান করেছিলেন। অনুষ্ঠান চলেছিল অনেক রাত পর্যন্ত। বাবা বেঁচে থাকতে সেই একবারই ঘটা করে ফেরদৌসী রহমানের জন্মদিন উদযাপন করা হয়েছিল। পরে তাঁকে বাবা বলেছিলেন, ‘এবার তোমার জন্মদিন উদযাপন হলো, এরপর তুমি এমন কাজ কোরো, যেন দেশের মানুষ তোমার জন্মদিন পালন করে।’
পরিবার ও শিল্পীজীবনের প্রভাব
ফেরদৌসী রহমানের বাবা বাংলা গানের কিংবদন্তি আব্বাসউদ্দীন আহমদ (১৯০১-১৯৫৯)। বাবাকেই তিনি তাঁর জীবনের গুরু মানেন। তিনিই তাঁর ওস্তাদ, স্বপ্নদ্রষ্টা ও পথপ্রদর্শক। আব্বাসউদ্দীন চেয়েছিলেন, মেয়ে আর সবার চেয়ে আলাদা হবে, তাঁর নিজস্ব পরিচয় হবে, সে স্বাবলম্বী হবে, বাংলা সংগীতকে তুলে ধরবে বিশ্বদরবারে। বাবা ছিলেন তাঁর সবচেয়ে ভালো বন্ধু। আত্মজীবনীতে বারবার উঠে এসেছে তাঁর বাবার কথা।
মা লুৎফুন্নেসা (১৯১৮-২০০৩) ছিলেন নানা গুণে গুণান্বিত। সমাজের নানা বিষয়, মেয়েদের এগিয়ে নেওয়া নিয়ে তিনি কবি সুফিয়া কামালের সঙ্গে কাজ করেছেন। মায়ের প্রভাবই ফেরদৌসী রহমানের মনকে নাড়া দিয়েছিল মেয়েদের স্বাধীনতা বা পরাধীনতা, স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা কিংবা লেখাপড়া শিখে তা কাজে লাগানোর ব্যাপারে।
সংগীতজীবনের নানা দিক
ফেরদৌসী রহমান বাংলাদেশের সংস্কৃতিজগতের একজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তিনি গান গেয়েছেন, চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করেছেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের শুরু থেকে ‘এসো গান শিখি’ নামের অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তিনি দেশের কয়েক প্রজন্মের মানুষকে সংগীতে হাতেখড়ি দিয়েছেন। বহু শিল্পীর প্রথম গুরু তিনি। দেশের বেশ কয়েক প্রজন্মের কাছে তাঁর পরিচিতি ‘এসো গান শিখি’র ‘খালামণি’।
বইটি প্রকাশের দিন চ্যানেল আইয়ের ক্যামেরাসহ সহমহাব্যবস্থাপক অনন্যা রুমা এবং অভিনেতা তানভির হোসেন প্রবাল উপস্থিত হন। সবার অনুরোধে সহকর্মী মাহবুবা শিল্পীকে গেয়ে শোনালেন ‘যার ছায়া পড়েছে, মনেরও আয়নাতে’—সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের লেখা ফেরদৌসী রহমানের গাওয়া গানটি।
একাকী জীবন ও সংগীতের প্রতি ভালোবাসা
ফেরদৌসী রহমান বলেন, ‘৮০ বছর পার করার পর প্রতিটি দিন আমার কাছে বোনাস মনে হয়। একটা ঝলমলে রঙিন জীবন কাটিয়েছি। আর তাই এখনকার এই একাকী জীবন নিয়ে আমার কোনো অভিযোগ নেই। এই একাকী জীবন নিয়ে আমার ভাবনা হলো, সৃষ্টিকর্তা আমার পরীক্ষা নিচ্ছেন।’ তাঁর স্বামী রেজাউর রহমান (১৯৩৮-২০২৪) তিন বছর আগে হঠাৎ এক দিনের নোটিশে তাঁকে ছেড়ে গেছেন। দুই ছেলে পরিবার নিয়ে বিদেশে। তিনি একা অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন সহকারী নাজমাকে নিয়ে।
আত্মজীবনী ‘লোকে বলে প্রেম, আমি বলি জ্বালা’ গ্রন্থে ফেরদৌসী রহমান বলেছেন, তাঁর কাছে সংগীত মানে জীবন। তিনি মনে করেন, মানুষের জীবনজুড়ে বিরাজ করে সুর ও সংগীত। গান গেয়ে, গান শুনে, সংগীতকে ভালোবেসে জীবনের এতটা পথ পেরিয়ে গেছে তাঁর। তাই আজও তিনি প্রথম দিনের মতোই ভালোবাসেন সংগীতকে।
বই প্রকাশনা ও ভবিষ্যৎ অনুষ্ঠান
ফেরদৌসী রহমান বলেছেন, তাঁর কাছে ‘প্রেম’ মানে শুধু নারী-পুরুষের সম্পর্ক নয়। তাঁর কাছে ‘প্রেম’ হলো তাঁর সংগীত, তাঁর গান। সংগীতই তাঁর পুরো জীবন, তাঁর পুরো সত্তা আর আত্মাকে আলিঙ্গন করে রেখেছে। ‘স্যাটিসফেকশন’ বা ‘পরিতৃপ্তি’—একজন শিল্পীর জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। এই তৃপ্তি কিংবা অতৃপ্তিই তাঁর সংগীতজীবন পরিচালনা করে। তিনি বলেছেন, একজন শিল্পীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তাঁর সাধনা চালিয়ে যাওয়া। তাই সংগীতকে তিনি বলছেন তাঁর ‘জ্বালাও’।
বইটি নিয়ে প্রথমা প্রকাশন আগামী ৭ জুলাই একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে রাজধানীর ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে।



