ইন্টারপোল তালিকাভুক্ত পাচারকারী হাদিস রহমান গ্রেপ্তার: বন্য প্রাণী পাচার চক্রের শিকড় অনুসন্ধান জরুরি
ইন্টারপোল তালিকাভুক্ত পাচারকারী হাদিস রহমান গ্রেপ্তার

কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় বন বিভাগের অভিযানে গ্রেপ্তার হন হাদিস রহমান। ছবি: বন বিভাগের সৌজন্যে। বন্য প্রাণী সংরক্ষণকর্মী হিসেবে আমাদের দীর্ঘদিনের একটি হাহাকার হলো, বাংলাদেশ শুধু বন্য প্রাণী পাচারের শিকার নয়, বৈশ্বিক পাচার চক্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট রুট হিসেবেও ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই বাস্তবতার মধ্যেই আশার আলো দেখিয়েছে ইন্টারপোলের তালিকাভুক্ত বন্য প্রাণী পাচারকারী হাদিস রহমানের গ্রেপ্তার। তবে এর আগেও সে একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েও পরে মুক্তি পেয়েছে এবং আবারও তাঁকে আন্তর্জাতিক বন্য প্রাণী পাচারের সঙ্গে জড়িত পাওয়া গেছে। ফলে এবার দাবি একটাই, এই গ্রেপ্তারকে বিচ্ছিন্ন সাফল্য হিসেবে দেখলে চলবে না; বরং এটিকে কেন্দ্র করে দেশের অভ্যন্তরে সক্রিয় আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের শিকড় অনুসন্ধান এবং তাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি অভিযান পরিচালনা করা এখন সবচেয়ে জরুরি।

বাংলাদেশের বন্য প্রাণী পাচারের বাস্তবতা

২০২২ সালের নভেম্বরে কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেসের একটি গবেষণায় বাংলাদেশের ১৩টি বন্য প্রাণী বাজার জরিপ করে ৪২১ জন ব্যবসায়ীকে চিহ্নিত করা হয়, যাঁরা বন্য প্রাণী বিক্রির সঙ্গে জড়িত। মাঠপর্যায়ের তথ্য এবং বন বিভাগের বিভিন্ন সূত্র বলছে, দেশে একাধিক সংঘবদ্ধ পাচারকারী চক্র সক্রিয়।

বাংলাদেশ কেন বন্য প্রাণী পাচারের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ রুটে পরিণত হয়েছে, তার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। ভৌগোলিক অবস্থান, বন বিভাগের জনবল ও সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, দুর্বল সীমান্ত নজরদারি, অবৈধ অস্ত্রের প্রবাহ এবং আন্তর্জাতিক পাচারকারীদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল। বন্য প্রাণী ও মাদক চোরাচালানের কুখ্যাত অঞ্চল ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’ মিয়ানমার, লাওস ও থাইল্যান্ড—বাংলাদেশের খুব কাছেই অবস্থিত। ফলে আন্তর্জাতিক পাচার রুটগুলো সহজেই বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে পরিচালিত হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ

আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদ পাচার হয়। অন্যদিকে বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের তথ্য বলছে, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশে প্রায় ১৯ হাজারের বেশি পাচার হওয়া বন্য প্রাণী উদ্ধার করা হয়েছে।

ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের বিস্তৃত সীমান্ত, দুর্গম পাহাড়ি ও বনাঞ্চল এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলের দারিদ্র্য পাচার চক্রকে বাড়তি সুবিধা দেয়। দেশগুলোতে বন্য প্রাণীর বিপুল চাহিদা এবং নিজস্ব উৎস থাকায় বাংলাদেশকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করা পাচারকারীদের জন্য সুবিধাজনক। আমাদের সীমান্তের বহু অংশ পাহাড়ি, নদীবেষ্টিত ও বনাঞ্চলঘেরা হওয়ায় সার্বক্ষণিক নজরদারি কঠিন। এসব স্থানে সামান্য অর্থের বিনিময়ে স্থানীয় মানুষকে ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কগুলো বন্য প্রাণী ও তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সীমান্ত পার করে। দুই বছর আগে শেরপুর সীমান্তে কাজ করতে গিয়ে এক স্থানীয় বাসিন্দার কাছ থেকে শুনেছিলাম, মাত্র পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে বনরুই সীমান্ত পার করে দেওয়ার ঘটনা। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে এসব প্রাণীর মূল্য কোটি কোটি টাকা।

হাদিস রহমানের গ্রেপ্তার ও উদ্ধার অভিযান

বন বিভাগের সূত্র অনুযায়ী, হাদিস রহমানের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের একটি বন্য পাখি পাচার মামলা ১০ হাজার টাকা জরিমানার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছিল। এ ছাড়া ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ছয়টি হনুমান পাচারের ঘটনায় করা আরেকটি মামলা এখনো বিচারাধীন রয়েছে। সর্বশেষ চলতি মাসের ৮ ও ৯ জুন পরিচালিত দুটি পৃথক অভিযানে ৫৫টি বিরল প্রজাতির বন্য প্রাণী উদ্ধারের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে নতুন মামলা করেছে চট্টগ্রাম বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ এবং বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট। এই হাদিস ইন্টারপোলের নথিভুক্ত একজন পাচারকারী।

গত ৮ জুন কক্সবাজারের চকরিয়া থেকে ১টি উল্লুক, ১৩টি কচ্ছপসহ তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৯ জুন ঢাকার মিরপুর-১২ এলাকার একটি গুদামে অভিযান চালিয়ে আরও ৪২টি বিরল প্রজাতির দেশীয় বন্য প্রাণী উদ্ধার করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এটিকে দেশের অন্যতম বড় একক বন্য প্রাণী উদ্ধার অভিযান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

সমন্বয় ও জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তা

এই অভিযানের সাফল্যকে অবশ্যই স্বাগত জানাই। তবে একই সঙ্গে কিছু প্রশ্নও সামনে আসে, যেগুলোর উত্তর জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ। ঘটনার সূত্রপাত হয় দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের মাধ্যমে। প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়, স্বেচ্ছাসেবী বন্য প্রাণী সংরক্ষণকর্মীরা ক্রেতা সেজে কয়েক দিন যোগাযোগের পর একটি চশমাপরা হনুমান উদ্ধারের তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানান। পরে চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহযোগিতায় অভিযান পরিচালিত হয়। তবে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন সংরক্ষণকর্মীর অভিযোগ, ওই অভিযানে আরও ২৬টি বন্য পাখির উপস্থিতির তথ্য থাকা সত্ত্বেও সেগুলো উদ্ধার না করেই দায়সারাভাবে অভিযান শেষ করা হয়েছিল।

ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই এই অভিযান পরিচালিত হয় এবং বিপুলসংখ্যক বন্য প্রাণী উদ্ধার করা সম্ভব হয়। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে সেই সঙ্গে মনে হয়, গণমাধ্যম, স্বেচ্ছাসেবী সংরক্ষণকর্মী এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয় আরও কার্যকর হলে এ ধরনের আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্রগুলোর বিরুদ্ধে উদ্ধার অভিযানের পরিধি ও সাফল্য বাড়তে পারত।

প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও অতীতের ঘটনা

বন্য প্রাণী পাচার রোধে বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন নতুন নয়। ২০১৩ সালে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১৭০টি বন্য প্রাণীকে আটক করেছিল আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আনা প্রাণীগুলো পাকিস্তানের করাচিতে নেওয়ার কথা বলে সেগুলো ঢাকায় আনা হয়েছিল। এ ঘটনায় বন বিভাগ একটি মামলা করেছিল। কিন্তু পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জন্ম দেয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ওই মামলার আসামি নাজমুল হুদাকেই গাজীপুর সাফারি পার্কের পশুপাখি দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাঁর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান রাজু ট্রেডার্স টেন্ডার ছাড়াই সাফারি পার্কের প্রাণী দেখভালের দায়িত্ব পায় এবং ২০১৬ সাল পর্যন্ত টিকিট বিক্রির দায়িত্বেও ছিল। এমন উদাহরণগুলোই প্রশ্ন তোলে, বন্য প্রাণী অপরাধ দমনে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান কতটা দৃঢ়?

একদিকে যখন রাষ্ট্র বন্য প্রাণী পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা ভাবছে, অন্যদিকে অতীতের এমন ঘটনাগুলো স্বাভাবিকভাবেই নীতিনির্ধারণ, নজরদারি ও জবাবদিহি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে আমাদের শঙ্কিত করে। বন্য প্রাণী অপরাধ দমনে কেবল আইন প্রণয়ন বা অভিযান পরিচালনাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং স্বার্থের সংঘাত এড়ানোর কার্যকর ব্যবস্থা। অন্যথায় পাচারবিরোধী উদ্যোগের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও করণীয়

তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেটে বনায়ন, জলবায়ু সহনশীলতা এবং সবুজ কর্মসংস্থানের ওপর জোর দিয়ে একটি ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হয়েছে। এর আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ১৩তম অধিবেশনে ১০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ‘বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) বিল-২০২৬’ পাস হওয়া নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। এরই মধ্যে ইন্টারপোলের তালিকাভুক্ত পাচারকারী হাদিসের গ্রেপ্তার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের সক্ষমতার একটি বার্তা বহন করে।

কিন্তু প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। শুধু একজন পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন পুরো নেটওয়ার্ক উন্মোচন করা। সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি, বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটকে শক্তিশালী করা, বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দরে উন্নত স্ক্যানিং প্রযুক্তি ব্যবহার, বৈধ বন্য প্রাণী আমদানি-রপ্তানির জন্য ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু, উদ্ধারকৃত প্রাণীর পুনর্বাসন ও আন্তর্জাতিক বিনিময়ে বনবিভাগের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সহযোগিতা আরও জোরদার করা জরুরি।

বাংলাদেশ বর্তমানে বন্য প্রাণী পাচারের ট্রানজিট রুট হিসেবে পরিচিত। এবার সেই পরিচয় বদলে আঞ্চলিকভাবে বন্য প্রাণী অপরাধ দমনের নেতৃত্বদানকারী রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। হাদিস রহমানের গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে যদি পুরো নেটওয়ার্ক উন্মোচন করা যায়, তাহলে শুধু বাংলাদেশ নিজের বন ও বন্য প্রাণী রক্ষাই নয়, দক্ষিণ এশিয়ায় বন্য প্রাণী অপরাধ দমনের ক্ষেত্রেও একটি কার্যকর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।

সৈয়দা অনন্যা ফারিয়া বন্য প্রাণী সংরক্ষণকর্মী ও সহপ্রতিষ্ঠাতা, ডিপ ইকোলজি অ্যান্ড স্নেক কনজারভেশন ফাউন্ডেশন। মতামত লেখকের নিজস্ব।