মাঙ্গা সংস্কৃতি যেভাবে বদলে দিল জাপানের ফুটবল
মাঙ্গা সংস্কৃতি যেভাবে বদলে দিল জাপানের ফুটবল

ফুটবল কি শুধুই ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার খেলা? এশিয়ার কি কোনো স্থান নেই? ২০২২ সালের পর থেকে একটি এশিয়ান দল ৯০ মিনিটে কোনো ইউরোপীয় দলের কাছে হারেনি। জার্মানি, স্পেন, পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল—সবাই এই দলের কাছে হেরেছে। ইংল্যান্ডকে ওয়েম্বলিতেও হারিয়ে এসেছে তারা। এই দলগুলোর মধ্যে ১১টি বিশ্বকাপ ভাগাভাগি। সম্প্রতি নেদারল্যান্ডসের মতো দলকেও শেষ মুহূর্তের গোলে বাগে এনেছে তারা। এখন নিশ্চয়ই বুঝেছেন, এই গল্প জাপানের।

মাঙ্গার শুরু

১৯৮১ সালে তাকাহাশি ইউইচি নামে এক শিল্পী একটি ছেলের গল্প আঁকতে শুরু করেন, যার ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা অসীম এবং স্বপ্ন বিশ্বকাপ জয়। তখন জাপানে ফুটবল মানে ছিল কর্পোরেট টুর্নামেন্ট, যেখানে কর্মচারীরা সপ্তাহান্তে বিনোদনের জন্য খেলতেন, মাঠে কয়েক হাজার দর্শক আসতেন। পেশাদার লিগের অস্তিত্ব ছিল না। সেই সময়ে বিশ্বকাপে খেলা ছিল দূরের স্বপ্ন।

ক্যাপ্টেন সুবাসা সেই সময়েই জন্ম নেয়। এই মাঙ্গা চরিত্রটি রক্তমাংসের নয়, কিন্তু তার প্রভাব ছিল বিপ্লবী। মাঙ্গাটি প্রথম সপ্তাহেই ৬০ লাখ কপি বিক্রি হয়। পুরো প্রজন্ম এই মাঙ্গা পড়ে ফুটবলে প্রেমে পড়ে। শুধু জাপান নয়, ইউরোপ ও আরব বিশ্বেও ছড়িয়ে পড়ে। ইউরোপে এটি 'অলিভার অ্যান্ড বেনজি' এবং আরব বিশ্বে 'ক্যাপ্টেন মাজেদ' নামে পরিচিত হয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিশ্বজয়ীদের অনুপ্রেরণা

এই মাঙ্গা ভবিষ্যৎ বিশ্বজয়ীদের ছোট হাতেও পৌঁছে যায়। ২০১০ বিশ্বকাপের ফাইনালে জয়সূচক গোল করা আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা জাপানের ভিসেল কোবেতে খেলতে এসে বলেছিলেন, 'চরিত্রগুলোর অভিনব খেলার ধরনের কথা এখনও মনে পড়ে। এই জাপানে, যেখানে অ্যানিমে তৈরি হয়েছিল, সেখানে খেলতে এসে আমি আনন্দিত।' তার সতীর্থ ফার্নান্দো তরেস বলেছিলেন, 'আমি ফুটবল খেলা শুরুই করেছিলাম এই কার্টুনের কারণে। আমি সবসময় অলিভার হতে চেয়েছিলাম।' লিওনেল মেসি, ডেভিড ভিয়া, লুকাস পোডলস্কি, আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরো—সবাই এই মাঙ্গা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জাপানের পরিকল্পনা

সেই সময় জাপান বিশ্বকাপে ছিল না, কিন্তু তাদের বই অন্য ফুটবল জাতির বিশ্বজয়ীদের অনুপ্রেরণা দিয়েছে। সংস্কৃতির শক্তি এমনই! জাপানও স্বপ্ন দেখেছে, এবং ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন তা বাস্তবায়নের জন্য সবকিছু করেছে। ১৯৯২ সালে, বিশ্বকাপে অভিষেকের আগেই, তারা ১০০ বছরের মধ্যে বিশ্বকাপ জেতার পরিকল্পনা করে। ব্রাজিলের জিকো, গ্যারি লিনেকার, তরুণ আর্সেন ওয়েঙ্গার—সবাই জাপানে এসেছেন। তৃণমূল পর্যায়েও কাজ করেছে জাপান; ছয় বছরের শিশুরা সপ্তাহে চারদিন, তিন ঘণ্টা করে অনুশীলন করত।

বর্তমান সাফল্য

১৯৯৮ সালে প্রথম বিশ্বকাপে জাপানের শুরুর একাদশের সব খেলোয়াড় দেশীয় জে লিগের ছিলেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে ডাচদের বিপক্ষে তাদের ইউরোপের শীর্ষ লিগে খেলা ফুটবলারের সংখ্যা অনেক। ডাচ লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা এখন জাপানি, বায়ার্ন ও আয়াক্সের ডিফেন্ডার দলে আছেন। এই খেলোয়াড়দের ফল বড় দলের বিপক্ষে দেখা যায়। সম্প্রতি ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়েও জাপান ব্রাজিলকে ৩-২ গোলে হারিয়েছে। গত রাতে দুবার পিছিয়ে পড়েও তিনবারের বিশ্বকাপ ফাইনালিস্ট নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ২-২ ড্র করেছে।

নকআউট বাধা

তবে নকআউট পর্ব এখনও জাপানের জন্য কাঁটা। চারবার খেলে চারবারই হেরেছে। ২০১৮ সালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে ২-০ গোলে এগিয়েও শেষ ২০ মিনিটে হেরেছে, ২০২২ সালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে পেনাল্টিতে স্বপ্নভঙ্গ। এই বাধা অতিক্রম করতে জাপান আবারও সংস্কৃতির কাছে ফিরে গেছে।

ব্লু লক

জাপানে এখন 'ব্লু লক' নামে একটি মাঙ্গা জনপ্রিয়, যা জাপানের সেরা স্ট্রাইকার তৈরির গল্প বলে। ক্যাপ্টেন সুবাসার মতো এটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া স্পোর্টস মাঙ্গা। এই মাঙ্গা জাপানের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যৌথ অংশীদারিত্বে প্রকাশিত হচ্ছে। অ্যাসোসিয়েশন আশা করছে, বিদেশে জন্ম নেওয়া জাপানিরাও এই প্রকল্পে সাড়া দেবে এবং দেশের হয়ে খেলবে।

দীর্ঘ দিনের মিথ ভাঙতে সময় লাগে। জাপান সেই সময় নিয়েছে। 'ফুটবল শুধু ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার'—এই মিথ হয়তো আজই নয়, কিন্তু অচিরেই ভাঙবে। আর সেই মিথ ভাঙার প্রকল্পে সর্বাগ্রে আছে মাঙ্গা সংস্কৃতির ছোঁয়ায় বদলে যাওয়া জাপান।