আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বৈষম্য, বঞ্চনা ও প্রতিহিংসার শিকার সশস্ত্র বাহিনীর ১৫০ জন অফিসারকে পুনর্বাসন, ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি এবং বকেয়া আর্থিক সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে, সেনাবাহিনীর ১১৫ জন, নৌবাহিনীর ২১ জন এবং বিমানবাহিনীর ১৪ জন অফিসারকে স্বাভাবিক অবসর ও ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়া হবে। বিধি অনুযায়ী তাদের বকেয়া বেতন-ভাতা, আর্থিক সুবিধা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বিশেষ আর্থিক প্রণোদনাও প্রদান করা হবে।
পুনর্বাসন প্রক্রিয়া ও কমিটি
২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট পর্যন্ত সশস্ত্র বাহিনীর তিন শাখায় চাকরিতে বৈষম্য ও প্রতিহিংসার শিকার কর্মকর্তাদের আবেদন পর্যালোচনা করতে সরকার একটি পদ্ধতি অনুসরণ করেছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করে এবং তিন বাহিনীর সদর দপ্তরও পর্ষদ গঠন করে। পরে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি এসব প্রস্তাব ও সুপারিশ বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। সেই কমিটির চূড়ান্ত সুপারিশের ভিত্তিতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে সরকার সিদ্ধান্তে আসে।
পূর্ববর্তী পদক্ষেপ
এর আগে, অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সশস্ত্র বাহিনী থেকে বরখাস্ত, চাকরিচ্যুত, বাধ্যতামূলক অবসর, অকালীন অবসর ও স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়া ১৪১ জন কর্মকর্তাকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেয়। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বরখাস্ত, চাকরিচ্যুত, বাধ্যতামূলক অবসর, অকালীন অবসর ও স্বেচ্ছা অবসরে যাওয়া কর্মকর্তারা চাকরি ফিরে পাওয়ার আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে, যার নেতৃত্বে ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার প্রতিরক্ষা ও জাতীয় সংহতি বিষয়ক বিশেষ সহকারী লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আব্দুল হাফিজ। কমিটি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পাওয়া আবেদন পর্যালোচনা করে সরকারের কাছে সুপারিশ পেশ করে।
বৈষম্যের শিকারদের অবস্থা
লেখক মোস্তফা কামালের মতে, আওয়ামী লীগ বৈষম্য-নিপীড়ন ও দলবাজি থেকে কেবল রাজনীতি-সমাজ-প্রশাসন নয়, বিভিন্ন বাহিনীসহ রাষ্ট্রের কোনো সেক্টরকেই রেহাই দেয়নি। তিন বাহিনীতে এর শিকাররা দম-নিশ্বাস বন্ধ করে ধুকরে ধুকরে ভোগে, লাজ-লজ্জায় গোপনও রাখে, আড়ালে-আবডালে কাঁদে, গোপনে চোখ মোছে। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও জাতীয় প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে তারা প্রস্তুত থাকলেও অপমান-অপদস্তের জন্য কি প্রস্তুত থাকে বা থাকতে হয়? এমন আঘাত যে জাতীয় নিরাপত্তা এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতায় নিয়োজিতদের জন্য কতো বেদনার ভুক্তভোগীরাই জানে।
সেনাবাহিনীর ভূমিকা ও রাজনীতি
বিশেষ করে দেশ ও জাতির ক্রান্তিলগ্নে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী সবসময় সর্বোচ্চ নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে অভ্যস্ত। ২০২৪ সালের গণআন্দোলন পরবর্তীতে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে যে ভূমিকা রাখতে হয়েছে তা কেবল দেশে নয়, বিশ্বের ইতিহাসেও জায়গা করে নিয়েছে। দলীয়পনা ও বৈষম্য চালাতে গিয়ে বিগতরা ভেবেছেন সেনাবাহিনীকে হেয় করার ষড়যন্ত্র জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব আর জাতীয় নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আমাদের সেনাবাহিনী। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে জন্ম নেওয়া এই বাহিনী শুধু দেশের সীমানা রক্ষা করেনি, দুর্যোগ-দুর্বিপাকে জনগণের পাশে দাঁড়ানো তাদের মজ্জাগত। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নিয়ে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছে।
দুঃখজনকভাবে মাঝেমধ্যেই সেনাবাহিনীকে খোঁচা দেওয়া, বিরক্ত-উত্তেজিত করার ক্রিয়াকর্ম এখনো রয়েছে। তাদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ স্লোগান ও অবমাননাকর মন্তব্য ছড়ানো হচ্ছে। এর অন্যতম উদ্দেশ্য দেশের ভেতরে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং বাইরের বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার নোংরা ষড়যন্ত্র। লেখক প্রশ্ন তুলেছেন, এরা কারা? উত্তর স্পষ্ট যারা রাষ্ট্রকে দুর্বল করতে চায়, যারা অবৈধ অস্ত্রের জোরে ক্ষমতার ভাগ চায়।
সেনাবাহিনীকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখা
লেখক মোস্তফা কামালের মতে, যে বার্তায় স্পষ্ট জাতীয় স্বার্থ, সংবিধান ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার স্বার্থে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে সর্বদা দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখা অত্যন্ত জরুরি। সশস্ত্র বাহিনীকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি বা পরিবারের স্বার্থে ব্যবহার না করে তাদেরকে দেশের সংবিধান ও জনগণের প্রতি আনুগত্য পালনে প্রণোদিত করাই আসল কথা। বর্তমান সেনা প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ‘সেনাপ্রধান হিসেবে নিজের মেয়াদকালে আমি রাজনীতিতে নাক গলাব না। আমি সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে হস্তক্ষেপ করতে দেব না। এটাই আমার স্পষ্ট অঙ্গীকার।’
সরকারের এই পদক্ষেপটি এ সময়ের অন্যতম একটি সেরা কাজ এবং বিশেষ বার্তা বহন করে। যে বার্তায় স্পষ্ট যে, সেনাবাহিনীকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রেখে পেশাদারিত্ব বজায় রাখা এবং বৈষম্যের শিকারদের ন্যায়বিচার দেওয়া সরকারের অগ্রাধিকার।



