ঢাকায় শেষ হলো আন্তর্জাতিক হ্যান্ডবল টুর্নামেন্ট। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের তরুণরা এখানে নেমেছিলেন শক্তি, গতি আর দক্ষতার পরীক্ষায়। কোর্টে চলছে হ্যান্ডবলের লড়াই, কিন্তু খেলার বাইরের পৃথিবীতে বিশ্বকাপ ফুটবলের কথা ঘুরে ফিরে এসেছে বারবার।
পল্টনে ফুটবলের জ্বর
পল্টনের ক্রীড়াঙ্গনে দিনের আলো গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলে দৃশ্য বদলে যায়। কয়েক ঘণ্টা আগেও যারা প্রতিপক্ষ ছিল, ম্যাচ শেষে তারাই একসঙ্গে বসে কথা বলে। কেউ হাতের মোবাইলে হাইলাইটস দেখছে, কেউ বিশ্বকাপের সূচি দেখছে, কেউ আলোচনা করছে কে এবার চ্যাম্পিয়ন হবে। মনে হয় না তারা ভিন্ন দেশের খেলোয়াড়। মনে হয় তারা সবাই একই স্টেডিয়ামের দর্শক।
নেপালের তরুণদের আগ্রহ
নেপালও এই টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছে। ফুটবলপ্রেমী দেশ হিসেবে পরিচিত নেপালের তরুণদের মধ্যেও বিশ্বকাপ নিয়ে আগ্রহ চোখে পড়ার মতো। নেপাল অনূর্ধ্ব ১৮ দলের খেলোয়াড় অনন্ত শ্রেষ্ঠা বললেন, “আমি স্পেনের সমর্থক। স্পেনের খেলা দেখতে ভালো লাগে।” তার সঙ্গে কথা বলতে বলতেই উঠে এলো আরেক বাস্তবতা। বাংলাদেশ যেমন বিশ্বকাপ এলেই আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলে ভাগ হয়ে যায়, নেপালের চিত্র কিছুটা আলাদা। অনন্ত বললেন, “নেপালে ব্রাজিল জনপ্রিয়। তবে মেসি আর রোনালদোর কারণে আর্জেন্টিনা আর পর্তুগালের সমর্থকও অনেক। নতুন প্রজন্ম এই দুই দল নিয়েই বেশি কথা বলে।”
বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে ফুটবলের আগুন
কিন্তু সবচেয়ে মজার দৃশ্য দেখা গেল বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে। হ্যান্ডবল খেলতে এসেও ফুটবল যেন তাদের ভেতরে অন্য এক আগুন জ্বালিয়ে রেখেছে। বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব ২০ জাতীয় হ্যান্ডবল দলের অধিনায়ক মো: রাতুল উদ্দিন বিশ্বকাপ এলেই অন্য মানুষ হয়ে যান। কোর্টে তিনি নেতৃত্ব দেন হাতে বল নিয়ে, কিন্তু ফুটবলের প্রসঙ্গ উঠতেই তার চোখে ভেসে ওঠে হলুদ জার্সি।
তিনি বললেন, “আমি ছোটবেলা থেকেই ব্রাজিলের সমর্থক। ব্রাজিলকে দেখলে মনে হয় ফুটবল শুধু প্রতিযোগিতা না, এটা আনন্দের ভাষা। আর নেইমার আমার কাছে শুধু খেলোয়াড় না, একজন শিল্পী। মাঠে ওর আত্মবিশ্বাস আর সৃজনশীলতা আমাকে অনুপ্রাণিত করে।”
ব্রাজিলের পক্ষে আরও সমর্থক
দলের সহ অধিনায়ক তৌফিকুর রহমানের পছন্দও ব্রাজিল। তবে তার ফুটবল নায়ক রাফিনিয়া। তৌফিকুর বললেন, “আমি লেফট উইংয়ে খেলি, তাই রাফিনিয়ার খেলা খুব দেখি। ওর গতি, জায়গা তৈরি করা আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অসাধারণ। বিশ্বকাপে ব্রাজিল খেললে আমি সবকিছু বাদ দিয়ে খেলা দেখি।”
দলের গোলকিপার মো: জাকারিয়া রহমান আবার বেশি মুগ্ধ নেইমারের জাদুতে। হেসে তিনি বললেন, “আমি গোল বাঁচাই, কিন্তু ফুটবল দেখতে গেলে চাই আক্রমণ। নেইমার বল পেলেই মনে হয় কিছু একটা হবে। ওর খেলা দেখলে বোঝা যায় ফুটবল শুধু হিসাবের খেলা না।”
আর্জেন্টিনার সমর্থকও আছে
তবে পুরো দলের মধ্যে আলাদা গল্প লিখছেন ইবাদত হোসেন রাসেল। তিনি ব্রাজিল নন, হৃদয় দিয়ে সমর্থন করেন আর্জেন্টিনাকে। রাসেল বললেন, “আমি মেসির জন্য আর্জেন্টিনার সমর্থক। ছোটবেলা থেকে ওকে দেখে বড় হয়েছি। আমার কাছে মেসি শেখায়, শান্ত থেকেও পৃথিবী জয় করা যায়।”
বিতর্ক আর আলোচনা
মালদ্বীপের আজিন আহমেদ জামির ব্রাজিলের গল্প করছেন, নেপালের কেউ মেসির অপেক্ষায়, আবার বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে চলছে নেইমার বনাম মেসি বিতর্ক। কখনো কখনো সেই আলোচনা এত দূর গড়ায় যে কোচ এসে মনে করিয়ে দিতেন আগামীকাল কিন্তু ম্যাচ আছে। তারপরও ফুটবল থামে না। রাতের খাবার শেষে আবার শুরু হয় আলোচনা। কে জিতবে, কে হারবে, কোন গোল হবে টুর্নামেন্টের সেরা।
পল্টনের এই কোর্ট তখন আর শুধু হ্যান্ডবলের কোর্ট ছিল না। হয়ে ওঠেছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফুটবল গ্যালারির ছোট্ট এক প্রতিরূপ। প্রতিপক্ষ নেই, আছে শুধু পছন্দের পার্থক্য। এখানে ভিন্ন দেশের পতাকা ছিল কিন্তু আবেগের ভাষা এক।



