আর্লিং হলান্ড: ব্রিনের ছোট্ট ছেলেটি এখন ব্রাজিলের ভয়
আর্লিং হলান্ড: ব্রিনের ছোট্ট ছেলেটি এখন ব্রাজিলের ভয়

বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ১৬-এর হাইভোল্টেজ ম্যাচে মুখোমুখি হচ্ছে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল ও ইউরোপের নতুন পরাশক্তি নরওয়ে। বাংলাদেশ সময় রাত দুইটায় অনুষ্ঠিত এই ম্যাচের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন নরওয়ের গোলমেশিন আর্লিং ব্রাউট হলান্ড। প্রতিপক্ষের একমুহূর্তের ভুলকে সামান্য সুযোগে রূপান্তর করে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে যাঁর জুড়ি মেলা ভার; গতি, উচ্চতা, শারীরিক শক্তি আর গোল করার সহজাত ক্ষমতা যাঁকে বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকারে পরিণত করেছে—তিনিই সেই হলান্ড।

জন্ম ও শৈশব

২০০০ সালের ২১ জুলাই ইংল্যান্ডের লিডস শহরে জন্ম নেন আর্লিং ব্রাউট হলান্ড। তাঁর বাবা আলফ-ইঙ্গে হলান্ড তখন ইংলিশ ক্লাব লিডস ইউনাইটেডের হয়ে খেলতেন। জন্মসূত্রে ইংল্যান্ডের সংযোগ থাকলেও তাঁর পরিবার দ্রুতই নরওয়ের ছোট্ট শহর ব্রিনেতে ফিরে আসে।

খেলাধুলা যেন হলান্ডের রক্তেই মিশে ছিল। হলান্ডের বাবা ছিলেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের অভিজ্ঞ ফুটবলার এবং মা গ্রি মারিতা ব্রাউট ছিলেন নরওয়ের জাতীয় পর্যায়ের অ্যাথলেট। ছোটবেলা থেকেই আলাদা ছিলেন তিনি। কোনো খেলায় হেরে গেলে জিততে না পারা পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যেতেন। ফুটবলের পাশাপাশি হ্যান্ডবল, গলফ ও অ্যাথলেটিকসেও অংশ নেন। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে স্ট্যান্ডিং লং জাম্পে ১.৬৩ মিটার লাফ দিয়ে নিজের বয়সী শিশুদের মধ্যে বিশ্ব রেকর্ড গড়ে নিজের শারীরিক সক্ষমতার জানান দিয়েছিলেন তিনি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাবার কাছ থেকে শিক্ষা

আলফ-ইঙ্গে হলান্ডের ফুটবল ক্যারিয়ার দীর্ঘ হয়নি। দীর্ঘদিন হাঁটুর সমস্যায় ভোগার পাশাপাশি ২০০১ সালে রয় কিনের বিতর্কিত ট্যাকলের ঘটনাও তাঁর ক্যারিয়ারকে কঠিন করে তোলে। শেষ পর্যন্ত অল্প বয়সেই পেশাদার ফুটবলকে বিদায় জানাতে হয় তাঁকে। তবে অবসরের পর আলফ-ইঙ্গে ছেলের ওপর নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন চাপিয়ে দেননি; বরং শিখিয়েছেন যে একজন ফুটবলারের সবচেয়ে বড় সম্পদ প্রতিভা নয়, শৃঙ্খলা। প্রতিদিনের অনুশীলন, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও শরীরের যত্ন নেওয়ার এ দীক্ষাই হলান্ডকে ছোটবেলা থেকে শিখিয়েছেন তাঁর বাবা।

ব্রিনের ক্লাব থেকে স্বপ্নের শুরু

মাত্র পাঁচ বছর বয়সে স্থানীয় ক্লাব ব্রিনে এফকের একাডেমিতে যোগ দেন হলান্ড। লম্বা গড়ন, বল ছাড়া গতিময় দৌড় এবং গোলের সামনে সঠিক পজিশন নেওয়ার ক্ষমতার কারণে দ্রুতই কোচদের নজরে আসেন তিনি। শৈশবে বিভিন্ন পজিশনে খেলার অভিজ্ঞতা তাঁর ফুটবলীয় বুদ্ধিমত্তাকে আরও পরিপক্ব করে তোলে। অনুশীলন শেষে অন্যরা বাড়ি ফিরলেও আর্লিং মাঠে থেকে শট ও বল নিয়ন্ত্রণের একক অনুশীলন চালিয়ে নিজেকে আরও নিখুঁত করার চেষ্টা করতেন।

সুলশারের হাত ধরে বদলে যাওয়া

২০১৭ সালে ১৬ বছর বয়সে হলান্ড নরওয়ের শীর্ষ ক্লাব মোলদেতে যোগ দেন। ক্লাবটির কোচ ও নরওয়ের কিংবদন্তি স্ট্রাইকার ওলে গুনার সুলশার হলান্ডকে প্রতিপক্ষের রক্ষণের ফাঁক খুঁজে নেওয়া, সঠিক সময়ে রান নেওয়া এবং ঠান্ডা মাথায় ফিনিশিং করার কৌশল শেখান। সুলশারের অধীনে এই বিশেষ অনুশীলনের মধ্যেই ২০১৮ সালে মোলদের হয়ে লিগে একের পর এক গোল করে ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর নজরে চলে আসেন তিনি।

অস্ট্রিয়ায় বিস্ফোরণ

২০১৯ সালের শুরুতে অস্ট্রিয়ার ক্লাব রেড বুল সাল্ৎসবুর্গে যোগ দিয়ে গোলের বন্যা বইয়ে দেন হলান্ড। উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগে অভিষেক ম্যাচেই হ্যাটট্রিক করে বিশ্ববাসীকে চমকে দেন তিনি। একই বছর অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে দেশের হয়ে হন্ডুরাসের বিপক্ষে এক ম্যাচেই রেকর্ড ৯টি গোল করে ফুটবল ইতিহাসে নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করেন।

ডর্টমুন্ডে তারকার জন্ম

২০১৯ সালের শেষ দিকে জার্মান ক্লাব বরুসিয়া ডর্টমুন্ডে যোগ দেন তিনি। বুন্দেসলিগার কঠিন প্রতিযোগিতায় নিজের অভিষেক ম্যাচেই বদলি হিসেবে নেমে মাত্র ২৩ মিনিটে হ্যাটট্রিক করে সবাইকে স্তব্ধ করে দেন হলান্ড। এরপর চ্যাম্পিয়নস লিগ ও বুন্দেসলিগা দুই মঞ্চেই গোলের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বিশ্বসেরা তরুণ তারকাদের কাতারে নিজের নাম প্রতিষ্ঠিত করেন।

স্বপ্নের ক্লাব, স্বপ্নের শুরু

২০২২ সালে বাবার সাবেক ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দেন হলান্ড। সিটির হয়ে প্রথম মৌসুমেই ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে এক মৌসুমে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড ভেঙে ফেলেন তিনি। ম্যানচেস্টার সিটিকে প্রিমিয়ার লিগ, এফএ কাপ, উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগসহ ঐতিহাসিক ট্রেবল জেতাতে প্রধান ভূমিকা রেখে আধুনিক ফুটবলে স্ট্রাইকারের ভূমিকাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন।

নরওয়ের স্বপ্ন

ক্লাব ফুটবলে সম্ভাব্য সব শিরোপা জিতলেও জাতীয় দল নরওয়ের ঐতিহ্যগত সীমাবদ্ধতার কারণে বড় কোনো ট্রফি জেতা হয়নি হলান্ডের। তবু দেশের জার্সিতে তিনি সব সময় শতভাগ উজাড় করে দেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে নরওয়ের এই পর্যায়ে আসার অন্যতম বড় ট্রাম্পকার্ড তিনিই। তাই ব্রাজিলের বিপক্ষে ম্যাচটি হলান্ডের জন্য বিশ্বমঞ্চে নিজের সামর্থ্য প্রমাণ করার অনেক বড় একটি সুযোগ।

মাঠের বাইরের মানুষটি

মাঠে হলান্ডকে যতটা আগ্রাসী দেখা যায়, মাঠের বাইরে তিনি ততটাই শান্ত ও প্রচারবিমুখ। ফিটনেস, নিয়মিত ঘুম, সুষম খাদ্য এবং সঠিক রিকভারি প্রক্রিয়ায় তাঁর কঠোর শৃঙ্খলা ফুটবল বিশ্বে বেশ আলোচিত, যা তাঁর দীর্ঘ সময় ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের অন্যতম প্রধান কারণ।

হলান্ড কেন এত ভয়ংকর

হলান্ড শুধু লম্বা বা শক্তিশালী নন, তাঁর মূল শক্তি ফুটবলীয় বুদ্ধিমত্তা। বল ছাড়া দৌড়, দুই পায়ে সমান দক্ষতা, শক্তিশালী হেডিং ক্ষমতা এবং প্রতিপক্ষের ভুল বুঝে নেওয়ার অসাধারণ সামর্থ্য তাঁকে বিশ্বের সবচেয়ে কার্যকর স্ট্রাইকার বানিয়েছে। অনেকেই তাঁর মধ্যে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও ইব্রাহিমোভিচের শারীরিক সক্ষমতা এবং প্রথাগত ‘নাম্বার নাইন’-এর গোলক্ষুধার মিশ্রণ খুঁজে পান। যদিও হলান্ড নিজেকে কারও সঙ্গে তুলনা করতে পছন্দ করেন না। তিনি বিশ্বাস করেন, প্রত্যেক খেলোয়াড়ের নিজস্ব পরিচয় থাকা উচিত।

ব্রাজিলের সামনে নতুন পরীক্ষা

বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ভুলের কোনো সুযোগ নেই। ব্রাজিলের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে নরওয়ের সবচেয়ে বড় অস্ত্র আর্লিং ব্রাউট হলান্ড। তাঁর একটি গতিময় দৌড় বা নিখুঁত শটই লিখে দিতে পারে ম্যাচের নতুন ইতিহাস। ব্রিনের ছোট্ট শহর থেকে যাত্রা শুরু করা এই ছেলেটি আজ ব্রাজিলের বিপক্ষে নতুন কোনো রূপকথা লিখবেন কি না, তা মাঠেই দেখা যাবে।