দানি ওলমো: মেসির চেয়েও প্রিয় ছিল ফুটবল, ছোটবেলার স্মৃতিকথা
দানি ওলমো: মেসির চেয়েও প্রিয় ছিল ফুটবল

স্পেনের ১০ নম্বর জার্সি গায়ে মাঠে নামেন দানি ওলমো। ছোটবেলার স্মৃতি মনে পড়লে তিনি বলেন, ফুটবল যেন তার পায়ের সঙ্গে আঠার মতো লেগে থাকত। সারাক্ষণ খেলতে চাইতেন, এমনকি বল কোলে নিয়েই ঘুমাতেন। বাড়ির বারান্দায় ছোট দুটি গোলপোস্ট বসিয়ে দিয়েছিলেন মা-বাবা, সেখানে তিনি ও তার ভাই কার্লোস খেলতেন। বয়স তখন দুই কি আড়াই। ভাই তাকে দুই পোস্টের মাঝখানে দাঁড় করিয়ে জোরে জোরে বল লাথি মারতেন।

মেসির চেয়ে খেলাই বড়

দানি ওলমোর কাছে খেলার চেয়ে বড় আর কিছু ছিল না। তিনি জানেন সব ফুটবলারই এই কথা বলেন, কিন্তু তার বেলায় কথাটা কতখানি সত্য, তার উদাহরণ দেন। লা মাসিয়ায় (বার্সেলোনার ইয়ুথ একাডেমি) যোগ দেওয়ার আগের কথা। কাস্তেলদাফেলসের একটা ম্যাচে বাবা ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করছিলেন, তিনি বাবার সঙ্গে গিয়েছিলেন। বয়স তখন ৮। মনের আনন্দে একটা বল নিয়ে খেলছিলেন। হঠাৎ বাবার এক বন্ধু এসে বললেন, 'দানি, জলদি এসো! কী ঘটতে যাচ্ছে, তুমি বিশ্বাস করতে পারবে না! লিওনেল মেসির সঙ্গে তোমার ছবি তোলা হবে!'

ভাবতে পারেন! মেসি! তা-ও কাস্তেলদাফেলসের মতো জায়গায়! ছবি তুলতে কে না চাইবে! কিন্তু দানি ওলমোর প্রতিক্রিয়া ছিল, 'মেসির সঙ্গে ছবি? নাহ, তুলব না। দেখছ না, আমি খেলছি।' ইচ্ছের বিরুদ্ধেই তাকে মেসির পাশে দাঁড় করিয়ে ছবি তোলা হয়েছিল। মেসিকে একটা কথাও বলেননি। শুধু ক্যামেরার 'ক্লিক' শব্দটার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। শব্দটা হতেই একছুটে চলে গিয়েছিলেন বলের কাছে। ভাবটা এমন, যেন তিনি মেসির বিরাট উপকার করলেন!

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সেই ছবি আজও তার বাড়িতে ফ্রেমে বাঁধাই করা আছে। কিন্তু সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, তার খেলার মহামূল্যবান সময় কেউ এসে নষ্ট না করুক, হোক সে কোনো মহাতারকা। বুঝতেই পারছেন, ফুটবলকে কতটা ভালোবাসতেন! এমনকি মেসিও তার মনোযোগ সরাতে পারেনি। দুঃখিত, লিও!

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

লা মাসিয়ার দিনগুলো

শুধু খেলতে চাইতেন, মেসির সঙ্গে দেখা করে আপ্লুত হননি। হয়েছিলেন সেদিন, যেদিন লা মাসিয়ায় যোগ দিলেন। কেঁদেই ফেলেছিলেন। লা মাসিয়ার দিনগুলো নিয়ে তার অনেক স্মৃতি। ক্লাবটা সব সময়ই হৃদয়ে একটা বিশেষ জায়গা জুড়ে থাকবে। পুরো ফুটবল–বিশ্বের কাছেই লা মাসিয়া অনুকরণীয়। কত কিংবদন্তি এই ক্লাব থেকে বেরিয়েছেন, ফুটবল বিদ্যা রপ্ত করেছেন।

তবে চাপও ছিল। সত্যিকারের চাপ। কেননা আপনি জানেন, সব সময় কেউ না কেউ আপনার ওপর নজর রাখছে। প্রতিদিন ভাবতেন, যেকোনো দিনই এখানে তার শেষ দিন হতে পারে। বার্সেলোনায় দারুণ কিছু টুর্নামেন্টে খেলেছেন। অসাধারণ কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। অনেক কিছু শিখেছেন। এমনকি একবার ক্যাম্প ন্যুতেও একটা ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন। সেই মাঠ, যে মাঠ তাদের কাছে একটা পবিত্র ভূমি, একটা স্বপ্ন!

বার্সেলোনা ছেড়ে ক্রোয়েশিয়া

তাহলে সাতটি বছর কাটানোর পর কেন তিনি এই অবিশ্বাস্য জায়গাটা ছেড়ে চলে গেলেন? সত্যি বলতে তার একটা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা প্রজেক্টের প্রয়োজন ছিল। তিনি মানুষটাই এমন—শুধু খেলতে চাইতেন। তার চাওয়া ছিল ওই বলটা। প্রথম দিকে বার্সেলোনা কর্তৃপক্ষ বিশ্বাসই করতে পারেনি যে সত্যি সত্যি তিনি চলে যাচ্ছেন। বার্সেলোনা ছেড়ে কেউ ক্রোয়েশিয়ায় যায় না। কেউই না। কিন্তু তিনি গিয়েছিলেন। বাবা যখন তাকে প্রস্তাবটার কথা জানালেন, সঙ্গে সঙ্গেই বললেন, 'যাব।' ব্যস, এইটুকুই। সহজ হিসাব।

আহা, ফুটবল ক্রোয়েশিয়া সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। তবে এটুকু বুঝতেন, বার্সায় থাকলে হয়তো সিস্টেমের মারপ্যাঁচে তিনি হারিয়েই যাবেন; আর দশজন সাধারণ খেলোয়াড়ের মতো হয়ে থাকবেন, যেখানে মূল দলে পা রাখার কোনো পরিষ্কার রাস্তা নেই। বার্সার মূল দলে জায়গা করে নেওয়াটা আদতেই বড্ড কঠিন।

ডার্বি ম্যাচের স্মৃতি

দানি ওলমোর কাছে সবচেয়ে আলাদা হয়ে থাকবে ডার্বির (ক্রোয়েশিয়ার একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লিগ) একটি ম্যাচ। তখন বয়স মাত্র ১৯। চোট কাটিয়ে মাঠে ফিরেছেন, তাই দলে নিয়মিত খেলা হচ্ছিল না। কখনো সুযোগ পাচ্ছিলেন, কখনো বাদ পড়ছিলেন। ওই সপ্তাহের মাঝামাঝি তাদের একটা ইউরোপীয় ম্যাচ ছিল। কোচ তাকে ফর্মে ফেরার একটা সুযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি নেমেই লাল কার্ড খেয়ে বসলেন! স্বাভাবিকভাবেই, ডার্বি ম্যাচের দিন শুরুতে তাকে আবার সাইড বেঞ্চে বসতে হলো। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচের ফলাফল যখন তাদের পক্ষে, ১-০, বিকল্প খেলোয়াড় হিসেবে তাকে মাঠে নামালেন কোচ।

এটাই ছিল তার সুযোগ। চারপাশ উত্তাল। মাঠে যখন পা রাখলেন, মনে হলো চোখের সামনে পুরো জীবন এক পলকে ভেসে উঠল! মাঠে নামার কয়েক মিনিটের মাথায় প্রতিপক্ষ গোল করে সমতা ফিরিয়ে আনল। ফলাফল তখন ১-১। মনে আবেগের ঝড় বইছিল। এত বড় ম্যাচে কোচ তার ওপর ভরসা করেছেন, এই ভরসার প্রতিদান তাকে দিতেই হবে।

তখন তার শুধু পায়ে বলটা দরকার। ৭৮তম মিনিটে সেই মুহূর্তটা এল। তাদের চিলিয়ান উইঙ্গার জুনিয়র ফার্নান্দেজ ওয়ান-টু পাসে খেলবে বলে এগোচ্ছিল, কিন্তু ডি-বক্সের ঠিক বাইরে ডিফেন্ডাররা তাকে আটকে দিল। তখনই বলটা এল তার কাছে, ফাঁকা জায়গায়, গোলপোস্ট থেকে প্রায় ২৫ গজ দূরে। একদম জোরালো আর মাটিঘেঁষা একটা শট মারলেন। গোলরক্ষক ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু পোস্টের একদম কোনা দিয়ে যাওয়া বলটার ধারেকাছে পৌঁছানোর সাধ্য তার ছিল না। নিখুঁত শট, ভীষণ সুন্দর! পুরো স্টেডিয়াম উল্লাসে ফেটে পড়ল। তিনিও। সতীর্থরা যখন তাকে ঘিরে উদ্‌যাপন করছে, বারবার শুধু একটা কথাই বলছিলেন, 'কে এরমোসো এস এল ফুতবল!' ফুটবল কতই না সুন্দর!