ব্রেমেন প্রিমিয়ার লিগের সপ্তম আসর: প্রবাসী বাংলাদেশিদের ক্রিকেট উৎসব
ব্রেমেন প্রিমিয়ার লিগের সপ্তম আসর: প্রবাসীদের ক্রিকেট উৎসব

জার্মানির ব্রেমেনে বসবাসরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী, গবেষক, চাকরিজীবী ও প্রবাসীদের অংশগ্রহণে গত শনি ও রোববার অনুষ্ঠিত হয়েছে ব্রেমেন প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) সপ্তম আসর। দুই দিনব্যাপী এই টুর্নামেন্ট শুধু ক্রিকেট প্রতিযোগিতাই নয়, বরং প্রবাসী বাংলাদেশিদের মিলনমেলা, সম্প্রীতি ও আনন্দ-উৎসবে পরিণত হয়। সাত বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে আয়োজিত হয়ে আসা বিপিএল বর্তমানে ব্রেমেনে বসবাসরত বাংলাদেশিদের সবচেয়ে বড় ও জনপ্রিয় ক্রিকেট টুর্নামেন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

দল গঠন ও প্রস্তুতি

প্রায় এক মাস আগে জমজমাট প্লেয়ার্স বিডিংয়ের মাধ্যমে প্রায় ৮০ ক্রিকেটারকে নিয়ে ৬টি ফ্র্যাঞ্চাইজি তাদের দল গঠন করে। বিডিং শেষে প্রতিটি দল নিয়মিত অনুশীলন, দলীয় পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি ম্যাচের মাধ্যমে নিজেদের গড়ে তোলে। দীর্ঘ এক মাসের প্রস্তুতির পর মাঠে গড়ায় বহুল প্রতীক্ষিত সিজন-৭।

প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী দল

এবারের আসরে অংশ নেয় ছয়টি দল। ফয়জুল আলিম শামিম ও তার দুই সন্তান সাফওয়ান-জাবিরের মালিকানাধীন আম রুটেন, নাসির ও শাহিনের ব্রেমেন ম্যাটাডরস, হাসনায়েন ও তৌকিরের লুইসেন্টাল রক্স, ইন্দ্রজিৎ ও অলকের রোট-গ্রুন ব্রেমেন, মামুন ও অপুর ব্রেমেন ভিক্টোরিয়ান এবং মামুন এমজের ঈগলস ২.০। প্রতিটি দলেই ছিল অভিজ্ঞ ও তরুণ ক্রিকেটারদের সমন্বয়, যার ফলে পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে দেখা গেছে দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ফাইনাল ও চ্যাম্পিয়ন

টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় চমক ছিল ব্রেমেন ম্যাটাডরস। প্রথমবারের মতো বিপিএলে অংশ নিয়েই দলটি দুর্দান্ত নৈপুণ্য দেখিয়ে ফাইনালে জায়গা করে নেয় এবং রানার্সআপ হওয়ার গৌরব অর্জন করে। অন্যদিকে গত আসরে রানার্সআপ হওয়া আম রুটেন এবার দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করে শিরোপা জিতে নেয়। ধারাবাহিক পারফরম্যান্স, দলীয় ঐক্য ও পরিকল্পিত ক্রিকেটের মাধ্যমে দলটি নিজেদের প্রথম শিরোপা নিশ্চিত করে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চ্যাম্পিয়ন দলের মালিকের পরিবারের উপস্থিতি

চ্যাম্পিয়ন দলের মালিক শামিমের পরিবারের উপস্থিতিও এবারের আসরে বিশেষভাবে সবার নজর কাড়ে। তার দুই ছেলে—আট বছর বয়সী সাফওয়ান এবং সাত বছর বয়সী জাবির—ক্রিকেটের প্রতি অসাধারণ ভালোবাসা ও আগ্রহ নিয়ে পুরো টুর্নামেন্টে সরব উপস্থিতি ছিল। খেলোয়াড়দের উৎসাহ দেওয়া, প্রতিটি ম্যাচ মনোযোগ দিয়ে দেখা এবং ক্রিকেট নিয়ে তাদের উচ্ছ্বাস মাঠে উপস্থিত দর্শকদেরও মুগ্ধ করে। আয়োজকদের মতে, নতুন প্রজন্মের এই আগ্রহই প্রবাসে বাংলাদেশি ক্রিকেটের ভবিষ্যতের জন্য আশাব্যঞ্জক বার্তা বহন করে।

ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স

এবারের টুর্নামেন্টে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে একক আধিপত্য বিস্তার করেন শাহরিয়ার দীপ্ত। ব্যাট ও বল—দুই বিভাগেই অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়ে তিনি পুরো আসরের সবচেয়ে আলোচিত ক্রিকেটারে পরিণত হন। একাধিক ম্যাচে ম্যাচসেরা নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি তিনি সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক, সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি, টুর্নামেন্টের সবচেয়ে মূল্যবান খেলোয়াড় (এমভিপি), প্লেয়ার অব দ্য টুর্নামেন্ট এবং প্লেয়ার অব দ্য ফাইনালের পুরস্কার জিতে নেন। ফাইনালে মাত্র ৫২ বলে ৮৯ রানের ঝোড়ো ইনিংস খেলে তিনি দলের শিরোপা জয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার অলরাউন্ড পারফরম্যান্স এবারের বিপিএলকে দীর্ঘদিন স্মরণীয় করে রাখবে বলে মনে করছেন ক্রিকেটপ্রেমীরা।

তরুণ প্রতিভা ও পুরস্কার

তরুণ ক্রিকেটারদের মধ্যেও ছিল দারুণ সম্ভাবনার ঝলক। ভবিষ্যতের প্রতিভাবান ক্রিকেটার হিসেবে ‘রাইজিং স্টার’ পুরস্কার অর্জন করেন মাহমুদ হাসান (রুদ্র)। মাঠে অসাধারণ ক্যাচ, দ্রুত থ্রো ও নিখুঁত ফিল্ডিংয়ের স্বীকৃতি হিসেবে দেওয়া হয় বেস্ট ফিল্ডার পুরস্কার।

দর্শক উপস্থিতি ও কমিউনিটি অংশগ্রহণ

দুই দিনব্যাপী টুর্নামেন্টে শুধু ব্রেমেন নয়, জার্মানির বিভিন্ন শহর থেকেও বাংলাদেশিরা উপস্থিত হয়ে খেলোয়াড়দের উৎসাহ দেন। পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেকেই মাঠে এসে পুরো দিন কাটান। শিশুদের আনন্দ, দর্শকদের করতালি এবং প্রতিটি ম্যাচের উত্তেজনা পুরো আয়োজনকে প্রাণবন্ত করে তোলে।

পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান

পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশি কমিউনিটির পরিচিত মুখদের সরব উপস্থিত ছিল। তাদের মধ্যে মঞ্জুর মোর্শেদ, রাকিবুল ইসলাম রানা, আকিল হোসেন, রাকিব হাসান প্রমুখ। তাঁরা বিজয়ীদের হাতে ট্রফি ও বিভিন্ন ক্যাটাগরির পুরস্কার তুলে দেন এবং এমন আয়োজনের প্রশংসা করেন।

আয়োজকদের প্রতিক্রিয়া

ব্রেমেন স্টুডেন্ট কমিউনিটির প্রেসিডেন্ট ফাহিম শাহরিয়ার বলেন, ‘প্রবাসে বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যে সৌহার্দ্য, ঐক্য ও পারস্পরিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতে খেলাধুলার বিকল্প নেই। ব্রেমেন প্রিমিয়ার লিগ সেই লক্ষ্যেই সফলভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ভবিষ্যতেও এই আয়োজন আরও বড় পরিসরে, আরও বেশি অংশগ্রহণকারী নিয়ে নিয়মিত অনুষ্ঠিত হবে বলে আমরা আশাবাদী।’

উপসংহার

প্রবাসের ব্যস্ত জীবন, কর্মব্যস্ততা ও পড়াশোনার চাপের মধ্যেও ক্রিকেটকে কেন্দ্র করে যে বন্ধন, ভালোবাসা ও পারস্পরিক সহযোগিতার এক অনন্য পরিবেশ তৈরি হয়েছে, ব্রেমেন প্রিমিয়ার লিগ তারই প্রতিচ্ছবি। সাত বছরের পথচলায় এই টুর্নামেন্ট এখন শুধু একটি ক্রিকেট প্রতিযোগিতা নয়; এটি ব্রেমেনে বসবাসরত বাংলাদেশিদের অন্যতম বৃহৎ সামাজিক ও ক্রীড়া উৎসবে পরিণত হয়েছে।

লেখক: তৌকির আহমেদ, অ্যারোস্পেস সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার, ব্রেমেন, জার্মানি