বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে ভুলের সুযোগ থাকলেও নকআউট পর্বে তা নেই। এক রাতই ঠিক করে দেয় কার গল্প এগোবে আর কার থেমে যাবে। সিয়াটলের আলোয় এবার সেই বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে বেলজিয়াম ও সেনেগাল। একদিকে বহু বছর ধরে শিরোপার স্বপ্ন বয়ে চলা ইউরোপের দল, অন্যদিকে আফ্রিকার চিরচেনা উচ্চারণ 'আমাদের এখনও শেষ হয়নি'।
বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্মের শেষ অধ্যায়
বেলজিয়ামের এই দলটাকে একসময় বলা হতো ফুটবলের সোনালি প্রজন্ম। এমন এক দল, যাদের হাতে বিশ্বকাপ আসবে সেই বিশ্বাস ছিল কোটি মানুষের। কিন্তু সময় কারও জন্য অপেক্ষা করে না। অনেক মুখ চলে গেছে, অনেক গল্প শেষ হয়েছে। তবু কিছু নাম এখনও রয়ে গেছে—তিবো কোর্তোয়া, কেভিন ডি ব্রুইনে, রোমেলু লুকাকুরা যেন এক অসমাপ্ত স্বপ্নের শেষ পাহারাদার।
চলতি বিশ্বকাপে তাদের পথচলা ছিল অদ্ভুত। শুরুতে মিশরের সঙ্গে ড্র। এরপর ইরানের বিপক্ষে গোলশূন্য ম্যাচ। শেষ ম্যাচে নিউজিল্যান্ডকে ৫–১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে বেলজিয়াম গ্রুপের শীর্ষে ওঠে আসে। বেলজিয়ামের সবচেয়ে বড় শক্তি এখনও মাঝমাঠ। ডি ব্রুইনের পায়ে খেলার ছন্দ বদলায়। লুকাকু এখন নামেন বদলি হিসেবে এবং ম্যাচের গতি বদলে দেন। চোটে ভরা এক মৌসুমের পরও বিশ্বকাপে স্বল্প সময় খেলেই গোল করেছেন। তার ভূমিকা বদলেছে, গুরুত্ব কমেনি।
সেনেগালের নাটকীয় উত্থান
সেনেগালকে দেখে কেউ ভুল করলে ভুলটাই বড় হবে। এই দল নকআউটে এসেছে নাটকের ভেতর দিয়ে। প্রথম ম্যাচে ফ্রান্সের কাছে হার। এরপর নরওয়ের বিপক্ষে হার। তখন মনে হচ্ছিল যাত্রা শেষ। শেষ ম্যাচে ইরাককে ৫–০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে ফিরে আসে তারা। শেষ পর্যন্ত সেরা তৃতীয় স্থান পাওয়া দলগুলোর একটি হয়ে জায়গা করে নেয় শেষ ৩২-এ। এখানেই সেনেগালের ভয়ংকর দিক—যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, তখনই সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে সেনেগাল।
এই দলের শক্তি শুধু তারকায় নয়। তাদের শক্তি গতি, শক্তি শরীরী ফুটবল, শক্তি পাল্টা আক্রমণ। তারা প্রতিপক্ষকে বল দিতে রাজি, জায়গা দিতে রাজি নয়। এক মুহূর্তের ভুলকে তারা আঘাতে পরিণত করতে জানে।
আমাদু ওনানার দ্বৈত পরিচয়ের রাত
এই ম্যাচের আরেকটি ইতিহাস আছে। আমাদু ওনানা। জন্ম সেনেগালে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে খেলছেন বেলজিয়ামের হয়ে। শিকড় আর বর্তমানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক ফুটবলারের জন্য এই রাত অন্যরকম। সামনে থাকবে জন্মভূমির পতাকা, দায়িত্ব থাকবে নিজের বর্তমানকে বাঁচিয়ে রাখার।
কৌশল ও ইতিহাস
বেলজিয়াম চাইবে বলের দখল, ধৈর্য, ছোট ছোট পাসে জায়গা তৈরি করা। সেনেগাল চাইবে ম্যাচটাকে ভাঙা ছন্দে নিয়ে যেতে। যত সময় যাবে, তত চাপ বাড়বে বেলজিয়ামের ওপর। আর সেই চাপের ফাঁকেই তারা খুঁজবে দৌড়ে উঠে যাওয়া আক্রমণ। দুই দল এর আগে আন্তর্জাতিক ফুটবলে মুখোমুখি হয়নি। কোনো প্রতিশোধ নেই, পুরোনো ক্ষত নেই। আছে শুধু এক রাত।
সিয়াটলের আকাশের নিচে এক দল নামবে প্রমাণ করতে তাদের সময় এখনও শেষ হয়নি। আরেক দল নামবে দেখাতে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় গল্পগুলো এখনও আফ্রিকার বুক থেকেও জন্ম নিতে পারে।



