জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচনা করেছেন ইরাকের ৩০ বছর বয়সী স্ট্রাইকার আয়মান হুসেইন। বুধবার ভোরে বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে শক্তিশালী নরওয়ের কাছে ১-৪ গোলে হারলেও তার পা থেকে এসেছে দলের একমাত্র গোলটি। দল হেরে গেলেও তিনি ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে রেখে গেছেন নিজের দক্ষতার স্বাক্ষর।
কোচের প্রশংসা
ইরাকের প্রধান কোচ গ্রাহাম আর্নল্ড বলেন, 'সে এমন একজন খেলোয়াড় যাকে বক্সের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন। আমি তার জন্য খুব খুশি ও গর্বিত।'
কঠিন শৈশব ও সংগ্রাম
হুসেইন এমন এক ইরাকে বেড়ে উঠেছেন, যেখানে অস্থিরতা ও সংকটের মধ্যেও ফুটবল ছিল ঐক্যের প্রতীক। ইরাকি খেলোয়াড়রা আধা-পেশাদার ছিলেন এবং দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকটের কারণে জর্ডানে গিয়ে টুর্নামেন্ট খেলতে হতো। সেই সময় প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারাত। ২০০৬ থেকে ২০০৮ সালের শিয়া-সুন্নি সংঘাতে দেশে গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি বিরাজ করছিল।
এই কঠিন সময়েই হুসেইনের ব্যক্তিজীবনে নেমে আসে দুঃখ। ২০০৮ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে তার বাবা, যিনি ইরাকি সেনাসদস্য ছিলেন, বাড়ি তৈরির সরঞ্জাম কিনতে বের হলে আল-কায়েদার গুলিতে নিহত হন। কয়েক বছর পর তার বড় ভাইকে অপহরণ করা হয়, যার খোঁজ আজও পাওয়া যায়নি।
মায়ের উৎসাহ
এক সাক্ষাৎকারে হুসেইন বলেন, 'আমি পরিবারের দেখাশোনা করতে ফুটবল ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু আমার মা রাজি হননি।' মায়ের উৎসাহেই তিনি ফুটবলে থেকে যান এবং ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের পর প্রথমবারের মতো ইরাককে বিশ্বকাপে পৌঁছে দেন। ২০১৫ সালে জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া এই স্ট্রাইকার এখন পর্যন্ত ৩৪টি আন্তর্জাতিক গোল করেছেন।
বিমানবন্দরে হেনস্থা
বিশ্বকাপের প্রস্তুতিও মসৃণ ছিল না। চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পর শিকাগোর ও'হেয়ার বিমানবন্দরে প্রায় সাত ঘণ্টা আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তাকে। সেই হেনস্থার জবাব তিনি দিয়েছেন মাঠেই— নরওয়ের বিপক্ষে দুর্দান্ত হেডে গোল করে।
গোলমেশিনের কীর্তি
শূন্যে থাকা বলকে গোলে পরিণত করার নিখুঁত কারিগর হুসেইন। ইরাকের ঐতিহাসিক বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে তিনি ছিলেন দলের সেরা পারফর্মার। আন্তঃ-কনফেডারেশন প্লে-অফের মাধ্যমে টুর্নামেন্টে পৌঁছানোর পথে তিনি ১২টি গোল করেন, যা তার যেকোনো সতীর্থের করা গোলের দ্বিগুণেরও বেশি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে জ্বলে উঠেছিলেন তিনি— মার্চ মাসে গুয়াদালুপে বলিভিয়ার বিরুদ্ধে ২-১-এর জয়সূচক গোলটি তারই, যা ইরাকের বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা নিশ্চিত করে।
এই গোলমেশিন যদি বর্তমান ফর্ম ধরে রাখতে পারেন, তবে গ্রুপ-আই থেকে পরের পর্বে যাওয়ার স্বপ্ন হয়তো এখনো বাঁচিয়ে রাখতে পারবে ইরাক— যদিও এই গ্রুপে ফ্রান্স এবং সেনেগালও রয়েছে।



