সামনে ২০৩০ কমনওয়েলথ গেমস। দুই দশক পর আবারও এই বিশাল ক্রীড়াযজ্ঞের আয়োজন করতে যাচ্ছে ভারত। কিন্তু নতুন আসরের প্রস্তুতির মাঝেই সামনে এসেছে এক অস্বস্তিকর সত্য—১৬ বছর আগে হওয়া ২০১০ দিল্লি কমনওয়েলথ গেমসের দেনা এখনো পুরোপুরি শোধ করতে পারেনি দেশটি।
অর্থনৈতিক বোঝা ও মামলার জটিলতা
ভারতীয় গণমাধ্যম ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের’ এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০১০ সালের সেই কেলেঙ্কারি-বিদ্ধ আসরের আর্থিক ও আইনি জটিলতার জের এখনো টানছে ভারত। তথ্য অধিকার আইনে (আরটিআই) পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও ওই গেমসের ২৮.০৫ কোটি রুপি বকেয়া পরিশোধ করতে হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারকে।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২২ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত বিভিন্ন আদালতে ২০১০ গেমস-সংক্রান্ত ২৯টি মামলা এখনো বিচারাধীন। এই মামলাগুলোর ২৪টিতে বিভিন্ন ভেন্ডর বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জড়িত, যেখানে কেন্দ্রীয় সরকার একটি পক্ষ। বিচারাধীন থাকার কারণে এই দেনার চূড়ান্ত পরিমাণ আসলে কত, তা এখনো নির্দিষ্ট করে বলতে পারছে না সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়।
ভবিষ্যৎ আয়োজনের পরিকল্পনা
২০৩০ থেকে ২০৪০ সালের মধ্যে একাধিক ক্রীড়া আসর আয়োজনের পরিকল্পনায় এগোচ্ছে ভারত। ২০৩০ কমনওয়েলথের জন্য ইতিমধ্যে আয়োজক স্বত্ব পেয়েছে আহমেদাবাদ। একই শহরে ২০৩৬ অলিম্পিক গেমস আয়োজনের জন্য বিড করেছে ভারত। এ সপ্তাহে খবর বেরিয়েছে, ২০৩৮ এশিয়ান গেমস আয়োজনের জন্যও বিড করবে তারা।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বলছে, চার বছর পর আহমেদাবাদে কমনওয়েলথ গেমসের শতবর্ষ পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ভারত। তবে সেই প্রস্তুতির পাশাপাশি পুরোনো দেনা মেটাতে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দও রাখতে হচ্ছে। সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন টেলিকম সংস্থা এমটিএনএলকে ২৮ কোটি রুপির বেশি পরিশোধ করা হয়েছে।
খরচ ও দুর্নীতি
গত ১৮ মার্চ লোকসভায় উপস্থাপিত একটি সংসদীয় কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছে, অবশিষ্ট দায় মেটানোর জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৫০ কোটি রুপির প্রয়োজন হবে। ২০১০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত গেমস–সংক্রান্ত মামলা লড়তে আইনজীবীদের ফি বাবদ ৬.৩৭ কোটি রুপি এবং সালিসি ফি বাবদ ৬.৬৩ কোটি রুপি খরচ করেছে ভারত সরকার।
দিল্লি কমনওয়েলথ গেমস দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়ম, অবকাঠামো ত্রুটি, নির্মাণ বিলম্ব ও দুর্বল আবাসনব্যবস্থার কারণে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছিল। ২০০৩ সালে প্রাথমিক ব্যয় ২৯৭ কোটি রুপি ধরা হলেও ২০১০ সালে তা এক লাফে ১৮৫৩২ কোটি রুপিতে পৌঁছায়। ২০১১ সালে সরকারের হিসাব ও নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী ইলেকট্রনিকস করপোরেশন অব ইন্ডিয়াকে দেওয়া হয়েছিল ৩৪৬ কোটি রুপির চুক্তি, নুসলি সুইজারল্যান্ডকে দেওয়া হয়েছিল ১২৮ কোটি রুপির চুক্তি।
দুর্নীতির অভিযোগ ও বিচার
কেনাকাটা থেকে শুরু করে অবকাঠামো নির্মাণসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে খরচ বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনার মধ্যে গেমস আয়োজক কমিটির প্রধান সুরেশ কালামাডির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। ২০১১ সালে গ্রেপ্তার হয়ে ১০ মাস জেলও খাটেন তিনি। তবে চলতি বছরের জানুয়ারিতে মৃত্যুর আগে আদালত তাঁকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেন।
২০১০ সালের সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার কথা বারবার বলা হলেও, পুরোনো দেনার বোঝা এখনো পুরোপুরি নামাতে পারেনি ভারত। ২০৩০ কমনওয়েলথ সামনে রেখে তাই প্রশ্ন উঠছেই, নতুন আয়োজন কি অতীতের ছায়া কাটিয়ে উঠতে পারবে?



