চা-বাগানের সরু পথ ধরে হাঁটছিলেন আলোকচিত্রী কাজল হাজরা ও সাংবাদিক। হঠাৎ কাছের ঝোপ থেকে খসখস শব্দ। মুহূর্তেই তাদের চোখে পড়ে একটি প্রাণী। কাজল হাজরা চিনতে পেরে বলেন, ‘ওটা চিতাবিড়াল!’ কিন্তু প্রাণীটি দ্রুত ঘন ঝোপে মিলিয়ে যায়।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর সাফল্য
প্রথম সুযোগ হাতছাড়া হলেও কাজল হাজরা হাল ছাড়েননি। দীর্ঘ সময় ধৈর্য ধরে অপেক্ষার পর আবার দেখা মেলে চিতাবিড়ালটির। এবার আর দেরি করেননি তিনি। ক্যামেরা লেন্স তাক করে একটানা শাটার চাপতে থাকেন। কিছুক্ষণ পর প্রাণীটি জঙ্গলে হারিয়ে গেলেও ক্যামেরায় ধরা পড়ে তার বেশ কয়েকটি চমৎকার ছবি।
প্রায় চার বছর আগেও ছবি তুলেছিলেন
ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার কাজল হাজরা জানান, প্রায় চার বছর আগে লাউয়াছড়া বনে একবার চিতাবিড়ালের ছবি তুলেছিলেন। তিনি বলেন, ‘আগে চা-বাগান ও বনাঞ্চলে এ প্রাণী তুলনামূলক বেশি দেখা যেত, এখন খুব কম দেখা যায়। এমন বিরল বন্য প্রাণী ক্যামেরাবন্দী করতে পারলে সত্যিই অনেক ভালো লাগে।’
চিতাবিড়ালের সংখ্যা কমছে
কাজল হাজরা বলেন, বনভূমি ধ্বংস, আবাসস্থল সংকোচন এবং মানুষের সঙ্গে সংঘাত বৃদ্ধির ফলে দিন দিন কমে যাচ্ছে চিতাবিড়ালের সংখ্যা। তাই এ প্রাণীসহ অন্যান্য বন্য প্রাণীর নিরাপদ আবাস নিশ্চিত করতে বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
চিতাবিড়ালের বৈশিষ্ট্য
চিতাবিড়াল দেশের একটি দুর্লভ বন্য প্রাণী। এর ইংরেজি নাম লেপার্ড ক্যাট এবং বৈজ্ঞানিক নাম প্রাইওনেইলারাস বেঙ্গালেনসিস। আকারে এটি গৃহপালিত বিড়ালের মতো হলেও দেখতে অনেকটা চিতাবাঘের ক্ষুদ্র সংস্করণের মতো। বাংলাদেশ বন্য প্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক সজল দেব বলেন, সম্প্রতি একটি দুর্ঘটনায় আহত অবস্থায় একটি চিতাবিড়াল উদ্ধার করে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
প্রাণীটির দেহের দৈর্ঘ্য সাধারণত ৩৯ থেকে ৬৬ সেন্টিমিটার এবং লেজের দৈর্ঘ্য ১৭ থেকে ৩১ সেন্টিমিটার। ওজন তিন থেকে চার কেজি। অন্যান্য বুনো বিড়ালের তুলনায় এর পা তুলনামূলক লম্বা। দেহের ওপরের অংশ হালকা হলুদাভ এবং নিচের অংশ সাদাটে। সারা শরীরে অসংখ্য কালো ফোঁটা ও দাগ থাকে, যা ঘাড়ের কাছে এসে দুটি চওড়া ছোপে পরিণত হয়েছে।
আচরণ ও খাদ্যাভ্যাস
চিতাবিড়াল মূলত নিশাচর প্রাণী। তবে ভোর ও সন্ধ্যায়ও এদের সক্রিয় দেখা যায়। সাধারণত একাকী জীবন যাপন করে এবং গাছে চড়া ও সাঁতার কাটতে বেশ দক্ষ। বড় কীটপতঙ্গ, পাখি ও ছোট মেরুদণ্ডী প্রাণী এদের প্রধান খাদ্য। বনাঞ্চল, গাছপালায় ঘেরা এলাকা, ঝোপঝাড়, তৃণভূমি ও গরান বনে এদের বসবাস। সাধারণত বড় গাছের কোটরে আশ্রয় নেয়।
প্রজনন ও আয়ুষ্কাল
প্রজননের ক্ষেত্রে স্ত্রী ও পুরুষ চিতাবিড়াল দীর্ঘমেয়াদি জোড়া গঠন করে। সাধারণত ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে এদের প্রজননকাল। প্রায় ৬০ থেকে ৭০ দিন গর্ভধারণের পর একটি স্ত্রী চিতাবিড়াল দুই থেকে চারটি শাবকের জন্ম দেয়। শাবকগুলো প্রায় ১৮ মাস বয়সে পূর্ণবয়স্ক হয়। আবদ্ধ পরিবেশে এদের গড় আয়ুষ্কাল প্রায় ১৩ বছর।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভাড়াউড়া চা-বাগানে এই ছবি তোলা হয়।



