১৯৯৮ বিশ্বকাপ: রোনালদোর রহস্য ও ফুটবলের বদলে যাওয়া পৃথিবী
১৯৯৮ বিশ্বকাপ: রোনালদোর রহস্য ও ফুটবলের বদলে যাওয়া পৃথিবী

১৯৯৮ সালের ১২ জুলাই। প্যারিসের উত্তরে সাঁ-দেনির স্টেড দ্য ফ্রান্স আলো, আবেগ আর ইতিহাসের এক বিশাল সমুদ্রে পরিণত হয়। গ্যালারিতে বসে থাকা হাজার হাজার মানুষ এসেছিলেন একটি জাতির স্বপ্নের পরিণতি দেখার জন্য। মাঠের একপাশে ব্রাজিল বিশ্ব ফুটবলের চিরন্তন সাম্রাজ্য। অন্য পাশে ফ্রান্স নিজেদের মাটিতে প্রথমবার বিশ্বকাপ ছোঁয়ার অপেক্ষায় থাকা এক জাতি।

রাত শেষ হবে ট্রফি হাতে কারও উল্লাসে, কারও চোখের জলে। কিন্তু তখনও কেউ জানত না, এই বিশ্বকাপ শুধু একটি শিরোপার গল্প হয়ে থাকবে না। এটি হয়ে উঠবে নতুন বিশ্বের ফুটবল-ঘোষণাপত্র, বহুসাংস্কৃতিক সমাজের বিজয়গাথা, এক বিস্ময়কর রূপকথার নাম এবং এক রহস্যময় ট্র্যাজেডির চিরন্তন স্মৃতি।

ফ্রান্সের নবজাগরণ

বিশ্বকাপ ফ্রান্সে ফিরেছিল ৬০ বছর পর। ১৯৩৮ সালের পর আবারও ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ বসেছিল ফরাসি মাটিতে। কিন্তু এই ফ্রান্স আর আগের ফ্রান্স ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যের পতন, আফ্রিকা ও উত্তর আফ্রিকা থেকে ব্যাপক অভিবাসন, সামাজিক পরিবর্তনে দেশটি নতুন পরিচয় খুঁজছিল।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নব্বইয়ের দশকের ফ্রান্স ছিল বৈচিত্র্যের ফ্রান্স। আলজেরিয়া, মরক্কো, তিউনিসিয়া, সেনেগাল, গিনি, মার্টিনিক, গুয়াদেলুপসহ পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ এসে মিশেছে এই সমাজে। কিন্তু এই বৈচিত্র্যকে ঘিরে বিতর্কও কম ছিল না। ফরাসি পরিচয় কী? একজন ফরাসি বলতে কাকে বোঝায়? ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিল ফুটবলের ভাষায়।

নতুন যুগের সূচনা

ফিফার জন্যও এই বিশ্বকাপ ছিল এক নতুন যুগের সূচনা। প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা ২৪ থেকে বাড়িয়ে ৩২ করা হয়। বিশ্বকাপ আরও বৈশ্বিক রূপ পায়। আফ্রিকা, এশিয়া, উত্তর আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নতুন দরজা খুলে যায়। ফুটবল তখন ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার একচেটিয়া আধিপত্য থাকছে না। নতুন শক্তিরা উঠে আসছে। নতুন গল্প জন্ম নিচ্ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ফ্রান্স বিশ্বকাপের আগে সবচেয়ে বড় আলোচনায় ছিল ব্রাজিল। মাত্র ২১ বছর বয়সেই রোনালদো পৃথিবীর সেরা ফুটবলার। তার গতি, ড্রিবলিং, শক্তি এবং গোল করার ক্ষমতা দেখে অনেকেই মনে করতেন, তিনি পেলে ও মারাদোনার উত্তরসূরি। অন্যদিকে ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় আশা ছিলেন জিনেদিন জিদান। আলজেরীয় অভিবাসী পরিবারের সন্তান। মার্সেইয়ের শ্রমজীবী পরিবেশ থেকে উঠে আসা এই ফুটবলার তখনও বিশ্বমঞ্চের সর্বোচ্চ নায়ক হয়ে ওঠেননি। কিন্তু যারা তাকে কাছ থেকে দেখতেন, তারা জানতেন তার মধ্যে অসাধারণ কিছু আছে।

গ্রুপপর্বের নাটকীয়তা

৩২ দলের প্রথম বিশ্বকাপে নতুন মুখের অভাব ছিল না। জামাইকা প্রথমবার বিশ্বকাপে এসেছে। তাদের সমর্থকদের রঙিন উৎসব বিশ্বকাপকে অন্য মাত্রা দিয়েছিল। দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথমবার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে অংশ নিচ্ছে। ইরান এসেছে রাজনৈতিক উত্তেজনার আবহে। আর ছিল ক্রোয়েশিয়া। মাত্র কয়েক বছর আগে স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে উঠে আসা দেশটি। রক্ত, ধ্বংস আর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া একটি রাষ্ট্র। তাদের অনেক খেলোয়াড় যুদ্ধের স্মৃতি বুকে নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন।

বিশ্বকাপ শুরু হতেই দেখা গেল গোলের উৎসব। ফ্রান্স জয় দিয়ে শুরু করল। দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারাল। এরপর সৌদি আরবের বিপক্ষে ৪-০ গোলের জয়। তবে আনন্দের মাঝেও ধাক্কা ছিল। সৌদি আরবের বিপক্ষে লাল কার্ড দেখেন জিদান। দুই ম্যাচ নিষিদ্ধ হন তিনি। পুরো ফ্রান্স উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। যার ওপর সবচেয়ে বেশি ভরসা, সেই নায়কই কি দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অনুপস্থিত থাকবেন?

অন্যদিকে নাইজেরিয়া বিশ্বকে মুগ্ধ করছিল। স্পেনের বিপক্ষে ৩-২ গোলের অবিশ্বাস্য জয় ফুটবল বিশ্বকে নাড়া দেয়। জে জে ওকোচা, সেলেস্টিন বাবায়ারো, তারিবো ওয়েস্টদের দল ঘোষণা দিল, আফ্রিকা আর শুধু অংশ নিতে আসে না, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেও আসে। স্পেন বিদায় নিল গ্রুপপর্ব থেকেই। এটি ছিল আসরের অন্যতম বড় অঘটন।

ডেনমার্কও খেলছিল দুর্দান্ত ফুটবল। ব্রায়ান লড্রুপ ও মাইকেল লড্রুপের নেতৃত্বে দলটি ছিল সৃজনশীলতা আর সাহসের প্রতীক। রোমানিয়ার কেন্দ্রে ছিলেন জর্জি হাজি। 'কার্পাথিয়ান মারাদোনা' নামে পরিচিত এই কিংবদন্তি মিডফিল্ডার তার শেষ বিশ্বকাপে আবারও দেখালেন কেন তাকে এত শ্রদ্ধা করা হয়।

আর্জেন্টিনা এসেছিল প্রতিশোধের আগুন নিয়ে। চার বছর আগে মারাদোনার বিদায়ের কান্না এখনও তাজা। এবার দলের নেতৃত্বে গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, এরিয়েল ওর্তেগা, দিয়েগো সিমেওনে। গ্রুপপর্বে তারা দুর্দান্ত। ইংল্যান্ডও এগিয়ে যাচ্ছে। দলের এক তরুণ তারকা ডেভিড বেকহ্যাম ইতোমধ্যে আলোচনায়। কিন্তু কেউ জানত না, কয়েকদিন পর তার জীবন বদলে যাবে।

নকআউটের উত্তেজনা

নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড মুখোমুখি হলো। ফকল্যান্ড যুদ্ধের স্মৃতি, ১৯৮৬ সালের ‘হ্যান্ড অব গড’। চারপাশের রাজনৈতিক আবেগে ফুটবল ছাপিয়ে যেন আগুন জ্বলে উঠল মাঠে। গোল, পালটা গোল। আবার গোল। উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছে। এরপর আসে সেই মুহূর্ত। সিমেওনের উসকানিতে বেকহ্যাম পা বাড়ালেন। রেফারি লাল কার্ড দেখালেন। বিশ্ব স্তব্ধ। ইংল্যান্ড দশজনের দলে পরিণত হলো। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নিল তারা। বেকহ্যাম রাতারাতি ইংল্যান্ডের সবচেয়ে সমালোচিত মানুষ হয়ে গেলেন। পুতুল পোড়ানো হলো। সংবাদপত্র তাকে বিশ্বাসঘাতক বলল। কিন্তু ভবিষ্যৎ তখনও লেখা বাকি ছিল।

অন্যদিকে ক্রোয়েশিয়া নিজেদের রূপকথা লিখছিল। দাভোর শুকার গোলের পর গোল করছেন। রবার্ট প্রসিনেচকি, জভোনিমির ববানেরা দলটিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন। তাদের খেলা ছিল সৌন্দর্য, আবেগ এবং জাতীয় গর্বের এক অনন্য মিশ্রণ।

কোয়ার্টার ফাইনাল

কোয়ার্টার ফাইনালে বিশ্বকাপ পৌঁছায় নতুন উত্তেজনায়। ব্রাজিল বনাম ডেনমার্ক। টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা ম্যাচ। গোলের পর গোল। আক্রমণের পর আক্রমণ। শেষ পর্যন্ত ৩-২ ব্যবধানে জিতে যায় ব্রাজিল। ডেনমার্ক বিদায় নেয় মাথা উঁচু করে।

অন্যদিকে নেদারল্যান্ডস বনাম আর্জেন্টিনা ম্যাচ ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় লড়াই। শেষ মুহূর্তে ফ্রাঙ্ক ডি বুরের দীর্ঘ পাস। ডেনিস বার্গক্যাম্পের অসাধারণ প্রথম স্পর্শ। একটি কাট। একটি শট। গোল। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সুন্দর গোল। আর্জেন্টিনার স্বপ্ন শেষ।

ফ্রান্সকে পেরোতে হয় ইতালির কঠিন পরীক্ষা। জিদান ফিরে এসেছেন। তবু ম্যাচে গোল নেই। টাইব্রেকারে গিয়ে ফ্রান্স জিতে যায়। একটি জাতির স্বপ্ন বেঁচে থাকে।

এরপর আসে সেই ম্যাচ, যা বিশ্বকাপের চেহারা বদলে দেয়। ক্রোয়েশিয়া বনাম জার্মানি। সবাই ধরে নিয়েছিল জার্মানরা জিতবে। কিন্তু ক্রোয়েশিয়ারা অন্য গল্প লিখল। ৩-০ গোল। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের অপমানজনক বিদায়। পৃথিবী নতুন শক্তির উত্থান দেখল।

সেমিফাইনাল

সেমিফাইনালে ব্রাজিল বনাম নেদারল্যান্ডস। রোনালদো আবারও আলো ছড়ালেন। কিন্তু ডাচরাও হার মানেনি। ম্যাচ গড়াল টাইব্রেকারে। ব্রাজিল জিতল। আরেকটি ফাইনাল নিশ্চিত।

অন্য সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়া প্রথমে ফ্রান্সকে স্তব্ধ করে দেয়। দাভোর শুকারের গোল। পুরো দেশ স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। কিন্তু তখন সামনে আসেন লিলিয়ান থুরাম। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে খুব কম গোল করা এই ডিফেন্ডার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাতে দুটি গোল করেন। ফ্রান্স ফাইনালে। ক্রোয়েশিয়ার স্বপ্ন শেষ হলেও তারা ইতোমধ্যেই ইতিহাস লিখে ফেলেছে। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে তারা বিশ্বকাপ শেষ করে তৃতীয় হয়ে। দাভোর শুকার জিতে নেন গোল্ডেন বুট।

ফাইনালের রহস্য

তারপর আসে ফাইনালের দিন। ১২ জুলাই ১৯৯৮। প্যারিস, স্টেড দ্য ফ্রান্স। কিন্তু ম্যাচ শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এক অদ্ভুত খবর। রোনালদো অসুস্থ। কেউ বলছে খিঁচুনি হয়েছে। কেউ বলছে মানসিক সমস্যা। কেউ বলছে চিকিৎসা জটিলতা। ব্রাজিল শিবির নীরব। হঠাৎ করে দলের তালিকা থেকে তার নামও সরানো হয়। পরে আবার যোগ করা হয়। বিশ্ব বিভ্রান্ত। আজও সেই ঘটনার পুরো সত্য রহস্যে ঢাকা।

ম্যাচ শুরু হলো। কিন্তু রোনালদোকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি যেন নিজের ছায়া। ফ্রান্স শুরু থেকেই আত্মবিশ্বাসী। ব্রাজিল অস্বাভাবিকভাবে নিষ্প্রভ। প্রথমার্ধে কর্নার থেকে উঠে এসে জিদানের হেড। গোল। প্যারিস বিস্ফোরিত হলো আনন্দে। কিছুক্ষণ পর আবার জিদান। আরেকটি হেড। আরেকটি গোল। স্টেডিয়াম তখন উৎসবের নগরী। ব্রাজিল চেষ্টা করল। কিন্তু সেদিন তারা নিজেদের খুঁজে পেল না। শেষ মুহূর্তে ইমানুয়েল পেতি তৃতীয় গোল করলে সব সন্দেহ শেষ হয়ে যায়। ফ্রান্স ৩, ব্রাজিল ০।

শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ মানুষের স্বপ্ন বাস্তব হয়ে যায়। ফ্রান্স প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। প্যারিসের রাস্তায় মানুষ নেমে আসে। নীল, সাদা আর লালের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে শহরজুড়ে। জিদান হয়ে ওঠেন জাতীয় নায়ক। কিন্তু এই জয় শুধু একটি ট্রফির নয় ছিল বহুসাংস্কৃতিক ফ্রান্সের জয়। একটি দলের জয়, যেখানে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত খেলোয়াড় আছে, আরব বংশোদ্ভূত খেলোয়াড় আছে, ক্যারিবীয় বংশোদ্ভূত খেলোয়াড় আছে। তারা দেখিয়ে দিয়েছিল, বৈচিত্র্য দুর্বলতা নয়, শক্তি।

উত্তরাধিকার

১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ শেষ হয়েছিল ট্রফি প্রদান অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। কিন্তু তার উত্তরাধিকার আজও বেঁচে আছে। এটি ছিল ৩২ দলের প্রথম বিশ্বকাপ। আফ্রিকান ফুটবলের আত্মবিশ্বাসের উত্থান। ক্রোয়েশিয়ার রূপকথা। বেকহ্যামের পতন ও ভবিষ্যৎ পুনর্জন্মের সূচনা। রোনালদোর সবচেয়ে বড় রহস্য, দাভোর শুকারের অমরত্বের সঙ্গে ছিল জিনেদিন জিদানের রাজমুকুট পরার গল্প।

আজও ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপের কথা উঠলে মানুষ শুধু ফ্রান্সের প্রথম শিরোপার কথা বলে না। তারা মনে করে সেই গ্রীষ্মকে, যখন ফুটবল নতুন পৃথিবীর দরজা খুলেছিল। যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ বিশ্বকে বিস্মিত করেছিল। যখন এক তরুণ ইংরেজ খলনায়কে পরিণত হয়েছিল। যখন এক ব্রাজিলিয়ান বিস্ময় রহস্যে হারিয়ে গিয়েছিল। আর যখন প্যারিসের আকাশে জন্ম নিয়েছিল এক নতুন সূর্য জিনেদিন জিদান।

১৯৯৮ ফুটবলের ইতিহাসে লেখা এক আবেগময় মহাকাব্য, যেখানে ট্রফির চেয়েও বড় হয়ে উঠেছিল মানুষের, জাতির এবং স্বপ্নের গল্প।