চোটের কারণে আগের দুই ম্যাচে খেলতে পারেননি নেইমার। মায়ামি তাঁর অপেক্ষায়, ব্রাজিল তাঁর অপেক্ষায়। সেই অপেক্ষার নাম—নেইমার। আগামীকাল স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ। গ্রুপ ‘সি’–এর সমীকরণে ব্রাজিল এগিয়ে। ২ ম্যাচে ৪ পয়েন্ট। কিন্তু এই সমীকরণের ভেতরে আরেকটি গল্প আছে, যা সংখ্যায় ধরা পড়ে না। হ্যাঁ, ব্রাজিলের ফুটবল যেন এখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি।
ব্রাজিলের পারফরম্যান্সে নেইমারের অভাব
মরক্কোর সঙ্গে ১–১ ড্র। নিস্তেজ, প্রায় অন্যমনস্ক প্রথমার্ধ। এরপর হাইতির বিপক্ষে ৩–০ জয়। সেখানে আবার দেখা গেছে ঝলক, কিন্তু তা যেন পুরো আলো নয়, শুধু বিদ্যুৎ–চমকের মতো ক্ষণিক ঝলকানি। যেন এক বিশাল সিম্ফনি বাজছে, কিন্তু প্রধান বেহালাটি এখনো মঞ্চে ওঠেনি। সেই বেহালা—নেইমার।
নেইমারের চোটের ইতিহাস
৩৪ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড। নামের পাশে প্রতিভার যে প্রমাণপত্র নিয়ে তিনি যাত্রা শুরু করেছিলেন, গত দেড় দশকে তা ক্রমে রূপ নিয়েছে এক মোটা মেডিক্যাল ফাইলে। পুরো ক্যারিয়ারে ৬৫১ দিন তিনি মাঠের বাইরে কাটিয়েছেন গোড়ালির লিগামেন্ট, হাঁটুর ক্রুশিয়েট টিয়ারের ক্ষত এবং আরও কত চোট নিয়ে! তবু ব্রাজিল তাঁকে ডেকেছে। কোচ কার্লো আনচেলত্তি জানেন, বড় মঞ্চে অভিজ্ঞতার মূল্য কতটা। প্রায় তিন বছর পর জাতীয় দলে ফেরা। চোট জর্জর এক অধ্যায় পেরিয়ে আবার বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরে আসার গল্প, কিন্তু গল্পটি এখনো অসম্পূর্ণ। কারণ, এই টুর্নামেন্টে এখনো তাঁর পা বল ছোঁয়নি।
অনুশীলনে ফেরা
গত সপ্তাহে নেইমার পূর্ণ অনুশীলনে ফিরেছেন। গত সোমবার প্রথমবার দলের সঙ্গে ট্যাকটিক্যাল সেশন করেছেন, যা দেখে সতীর্থ গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি বলেছেন, ‘ওকে দেখলেই বোঝা যায়, কতটা ক্ষুধার্ত।’ এ ক্ষুধা শুধু মাঠে নামার নয়, আরও একবার নিজেকে প্রমাণ করার। প্রশ্ন এখন একটাই—তিনি খেলবেন কি না?
হয়তো শুরু করবেন বেঞ্চে। হয়তো শেষ আধা ঘণ্টায় নামবেন। কিন্তু তাঁর উপস্থিতি, এমনকি সম্ভাবনাটুকুও ম্যাচের আবহ বদলে দেয়। কারণ, নেইমার শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি ব্রাজিলের ফুটবলীয় স্মৃতির একটি সেতু। একদিকে পেলের সোনালি অতীত, অন্যদিকে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের ঝলমলে বর্তমান—এই দুই সময়কে যুক্ত করে রাখেন তিনি।
ভিনিসিয়ুসের ভূমিকা
ভিনিসিয়ুস এখন দলের প্রাণ। সর্বশেষ পাঁচ আন্তর্জাতিক ম্যাচে ৬ গোলের অবদান। ৩ গোল, ৩ অ্যাসিস্ট। তাঁর গতি, ড্রিবল, সিদ্ধান্ত—সবই আধুনিক ফুটবলের ভাষা। কিন্তু নেইমারের ভাষা অন্য রকম। একটু কবিতার মতো, একটু অপ্রত্যাশিত, একটু অসম্ভবকে সম্ভব করার জেদ।
স্কটল্যান্ডের চ্যালেঞ্জ
এবার প্রতিপক্ষ স্কটল্যান্ড, ইতিহাস যাদের পক্ষে নয়। বিশ্বকাপে দক্ষিণ আমেরিকার কোনো দলের বিপক্ষে কখনো জেতেনি। ব্রাজিলের বিপক্ষে ৪ ম্যাচে ৪ হার, ১ ড্র। কিন্তু ইতিহাস কখনো কখনো শুধু প্রেক্ষাপট। গল্পটা লেখা হয় বর্তমানেই। স্টিভ ক্লার্কের দল অভিজ্ঞ। মরক্কোর বিপক্ষে তাদের একাদশে ছিল ৬০৯ আন্তর্জাতিক ম্যাচের অভিজ্ঞতা, স্কটিশ ফুটবলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। তাদের খেলা সরাসরি, শারীরিক, সেট–পিসে বিপজ্জনক। এ ম্যাচে তারা জানে, একটি পয়েন্টও তাদের ইতিহাস বদলে দিতে পারে, সত্যি করে দিতে পারে প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বে ওঠার স্বপ্ন।
ব্রাজিলের দলগত অবস্থা
এখন পর্যন্ত ব্রাজিলের সবচেয়ে ভালো পারফরমার ভিনিসিয়ুস। তাই মায়ামির এই ম্যাচ শুধু ব্রাজিলের জন্য নয়, স্কটল্যান্ডের জন্যও এক সন্ধিক্ষণ। ব্রাজিলের ডান দিক নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তা আছে। রাফিনিয়া চোটে নেই। তরুণ রায়ান হাইতির বিপক্ষে সুযোগ পেয়েছেন, তবে জেনিতের লুইস এনরিকের নামও শোনা যাচ্ছে। মাঝমাঠে পাকেতা, কাসেমিরো, ব্রুনো গিমারাইস, বেশ ভারসাম্যপূর্ণ ছক। রক্ষণে মার্কিনিওস, গ্যাব্রিয়েল মাগালাইস, দানিলোরা স্থিরতা দিয়েছেন। সবকিছু ঠিকঠাক। তবু কোথাও যেন কিছু অসম্পূর্ণ। হয়তো সেই অসম্পূর্ণতার নাম নেইমার।
নেইমারের স্কটল্যান্ড স্মৃতি
এই স্কটল্যান্ডের বিপক্ষেই ব্রাজিলের তাঁর প্রথম জোড়া গোল। ১৫ বছর পর আবার সেই প্রতিপক্ষ। সময় বদলেছে, শরীর বদলেছে, বদলেছে মঞ্চও। লন্ডনের সেই প্রীতি ম্যাচ থেকে এবার বিশ্বকাপ। ফুটবল কখনো কখনো নাটকের মতো। চরিত্রগুলো ফিরে আসে, দৃশ্য বদলায়, কিন্তু আবেগ একই থাকে।
আগামীকাল ভোরে মায়ামিতে যদি নেইমার মাঠে নামেন, তাহলে সেটা শুধু একটি বদলি নামা হবে না। হবে এক প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা। হয়তো তাঁর শেষ অধ্যায়ের শুরু। আর যদি না–ও নামেন, তাহলেও তাঁর ছায়া থাকবে। প্রতিটি পাসে, প্রতিটি আক্রমণে, প্রতিটি ‘যদি’র ভেতরে। কারণ, কিছু খেলোয়াড় মাঠে না থাকলেও খেলার ভেতরে থাকেন।



