বাজেট ও বিশ্বকাপে বাঙালি ফুটবলপাগলের দোটানা
বাজেট ও বিশ্বকাপে বাঙালি ফুটবলপাগলের দোটানা

বাজেট আর বিশ্বকাপ—চার বছর পরপর বাঙালি ফুটবলপাগল মধ্যবিত্তের জীবনে এই দুটি দুর্যোগ একসঙ্গে নাজিল হয়। অর্থাৎ অর্থনীতি আর আবেগ—দুই দিক থেকেই সর্বনাশ। গতকাল বাজেট অধিবেশন শেষ হতেই অফিসে নীল দলের সমর্থকেরা আসন্ন বিশ্বকাপ উপলক্ষে এমন উৎসব শুরু করেছে যেন অর্থমন্ত্রী বাজেটে সবার জন্য ফ্রি আর্জেন্টিনার জার্সি ঘোষণা দিয়েছেন। চাঁদা তুলে জার্সি কিনে ছবি তুলছে, ফেসবুকে ‘ফুটবল ইজ নট জাস্ট আ গেম’ টাইপ স্ট্যাটাস মারছে। হলুদ দলের সংখ্যালঘু সাপোর্টার হিসেবে আমিও কিছুটা চাপে পড়লাম! নতুন বাজেটে নানা খাতে পকেটে একটা বাড়তি চাপের পাশাপাশি প্রতি চার বছর পরপর এই সময় ঘরে আসে নতুন এই আরেক চাপ—বিশ্বকাপ!

বউয়ের আর্জেন্টিনা সমর্থন ও জার্সি দুর্ভোগ

এদিকে বাসায় বউ আর্জেন্টিনার সমর্থক। বউ আর্জেন্টিনার সাপোর্টার হলে যা হয়, বিশ্বকাপ শেষ হলে আমার জার্সি আমি খুঁজে পাই বউয়ের ঘর মোছার বালতিতে। এবারও আগের বিশ্বকাপে গুছিয়ে রাখা জার্সিটা খুঁজে না পেয়ে যা বোঝার বুঝে গেলাম। মাসের চিপা বাজেট থেকেই নতুন জার্সি কেনার বাজেটটাও বের করতে হলো। তবে এবার জার্সিতে খুব বেশি খরচ করতে মন চাইল না। আগামী বিশ্বকাপের জার্সিতে আরেকটা স্টার বেড়ে গেলে ভালো একটা প্লেয়ার এডিশন কিনে শোডাউন করব, এই চিন্তা করতে করতে সিপাহীবাগ থেকে গুলিস্তানের টেম্পোতে চড়ে বসলাম।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গুলিস্তানের জার্সি বাজার

ভাড়া দিলাম গুলিস্তানের, নামার পর মনে হলো জাতিসংঘের সদর দপ্তরের সামনে এসে নামলাম। আকাশ দখল করে উড়ছে নানা দেশের পতাকা আর রাস্তা, ফুটপাত দখল করে চলছে জার্সি বিক্রেতাদের হাঁকডাক। দেখে মনে হলো এবারের বাজেটে শুধু নির্দিষ্ট দুটি দলের সাপোর্টের ওপর ট্যাক্স বসালে দেশের বাজেট-ঘাটতি তো দূর, উল্টো আমরা আইএমএফকে লোন দিতে পারতাম বলে মনে হচ্ছে! জার্সির মার্কেট ঘুরে মাথা ঘুরে যাওয়ার অবস্থা! জার্সির মার্কেটে গিয়ে বুঝলাম, জার্সির কোয়ালিটির সংখ্যা আর ঢাকার মশার সংখ্যা—দুটোই অগণিত। সবারটাই প্লেয়ার এডিশন, দোকানদারদের কথা শুনলে মনে হয়, এই জার্সিটা আমি না কিনলে কালকেই মেসি বা নেইমার ফোন দিয়ে বলবে, ‘ভাই, জার্সিটা কি এখনো আছে?’ আর জার্সির দামও আমার বাজেটের বাইরে। এর মধ্যেই দেখলাম পাশ থেকে একজন হাঁক দিচ্ছে ‘তিন শ টাকায় জার্সি... অফার দামে ছাড়ছি...!’ হাঁকডাক শুনে দাঁড়াতেই দোকানি আমার গায়ে আর্জেন্টিনার জার্সি ধরে সাইজ মাপতে মাপতে বলল, ‘মামা, একের মাল। প্লেয়ার এডিশন, আপনার সাইজ...।’ মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল, থামিয়ে দিয়ে বললাম নীল না, হলুদ দাও।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পারিবারিক শান্তি ও ব্রাজিল জার্সি

এর মধ্যেই মনে পড়ল পারিবারিক শান্তি বজায় রাখতে কোনো ফাউল করা যাবে না। বাসায় ঢুকতে লাল কার্ড খেতে না চাইলে হলুদ জার্সির সঙ্গে একটা নীল জার্সিও ব্যাগে ভরতে হবে। ইতিমধ্যে আকাশে মেঘও হাঁকডাক দিচ্ছে। বৃষ্টি শুরু হলে রাস্তার এই দোকান গুটিয়ে যাবে, তখন এই দামে আর জার্সি পাওয়া যাবে না। দোকান গোছাতে গোছাতেই আর্জেন্টিনার জার্সির মাপেই ব্যাটা একটা ব্রাজিলের জার্সি ব্যাগে ঢুকিয়ে দিল।

বাসায় ফিরে ধরা খাওয়া

জার্সি অভিযান শেষে বাসায় ঢুকতেই দেখি বউ সোফায় বসে আছে!—ব্যাগে কী?—কিছু না, অফিসের কাগজ!—অফিসের কাগজে ব্রাজিলের লোগো কেন! প্রথমার্ধেই ধরা খেয়ে গেলাম। ধরা খেয়ে ব্যাগ থেকে নীল জার্সিটা বের করে বললাম, ‘সারপ্রাইজ! তোমার জন্যও এনেছি!’ তাতেও লাভ হলো না। হলুদ জার্সি দেখামাত্রই তার চার বছরের জমানো বারুদ জ্বলতে শুরু করল। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রসঙ্গ পাল্টে বিজ্ঞের মতো বললাম, ‘এবার কিন্তু তোমাদের প্লেয়ার ফরমেশন জোশ হবে মনে হয়!’ বউ এবার সংসারের বাজেট নিয়ে প্রেস কনফারেন্স শুরু করল। ফোঁস করে উঠে বলল, ‘মাঠের ফরমেশনের আগে ঘরের বাজেটের ফরমেশন ঠিক করো! তরকারিওয়ালা থেকে পুঁইশাকের আঁটি কেনার টাকাটাও তো কোথাও খুঁজে পেলাম না আলমারিতে! এ মাসের সংসারের টাকায় টান পড়ল কীভাবে? আমি হকচকিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে রুমে যেতে যেতে বললাম, ‘সব কি আমিই খরচ করেছি নাকি? “VAR” চেক করলেই তো পারো!’ বউ ব্যাপারটা সিরিয়াসলি নিয়ে নেবে বুঝিনি! পাশের রুম থেকে মেসেঞ্জারে বাজেট রিপ্লে পাঠাতে শুরু করল... ব্রাজিলের নতুন জার্সি, বন্ধুদের সঙ্গে খেলা দেখতে গিয়ে তিনবার বিরিয়ানি পার্টি, ব্রাজিলের পতাকা, ব্রাজিলের ক্যাপ... টাইপিং স্ট্যাটাস দেখে বুঝলাম পেনাল্টি কিক আসতে যাচ্ছে!

অল-ইন-ওয়ান জার্সি

চট করে পাশের রুমে গিয়ে নীল জার্সিটা হাতে নিয়ে একদম ‘রোমান্টিক হিরো’র মতো বললাম, ‘শোনো, ভালোবাসার কোনো দল নেই। চলো, নীল-হলুদের দেয়াল ভেঙে আজকে বাইরে কোথাও খেলা দেখে আসি।’ আমি আমার হলুদ জার্সি পরে রেডি। বউ রুমে এল। আমাকে দেখে মেঘের মতো গর্জন করে হাসতে লাগল! একটু আগেও যার মাথায় আগ্নেয়গিরির লাভা ফুটছিল, সে এভাবে হাসছে কেন? সাইকোথ্রিলারের ভিলেনদের মতো এই হাসি দেখে দেখে সেটা স্বাভাবিক মনে হলো না! জিজ্ঞেস করতেই বলল জার্সি কই থেকে কিনছ? বললাম গুলিস্তান! সে হাসতে হাসতে দেয়ালের আয়নাটার দিকে ইশারা করল, ‘দোকানদার পারিবারিক শান্তি বজায় রাখতে তোমাকে আসলেই “অল-ইন-ওয়ান” জিনিস দিয়েছে! জার্সিটা খুলে পেছনে দেখো!’ তড়িঘড়ি করে জার্সি খুলে হাতে নিয়ে দেখি হায় হায়! শালা আমাকে ডিসকাউন্টে জার্সি দিয়েছে ব্রাজিলের ঠিক আছে, কিন্তু পেছনে লেখা মেসি, নম্বর লেখা ১০! এ জন্যই ব্যাটা শুধু কালার দেখিয়ে ব্যাগে তাড়াহুড়া করে কেন ঢুকিয়ে দিয়েছিল এখন বুঝলাম। বউ এখনো হাসছেই! আর আমি চিন্তা করছি এই টানাটানির বাজেটের মাসে ইজ্জত বাঁচাতে আরেকটা জার্সি কেনার বাজেট এখন কোন খাত থেকে চুরি করব!