কোপা দেল রে ফাইনালে জাতীয় সংগীতে দুয়ো: রাজনৈতিক প্রতিবাদের ইতিহাস ও কারণ
স্পেনের সেভিয়ার লা কার্তুজা স্টেডিয়ামে গতকাল কোপা দেল রে ফাইনালের আগে জাতীয় সংগীত ‘মার্চা রিয়াল’ বাজছিল। তখন গ্যালারির একটি বড় অংশ থেকে শোনা যাচ্ছিল শিস ও দুয়োধ্বনি। স্টেডিয়ামে উপস্থিত ছিলেন স্পেনের রাজা ষষ্ঠ ফিলিপ, যিনি পরে সোসিয়েদাদ অধিনায়ক মিকেল ওরিজাবালের হাতে ট্রফি তুলে দেন। ভিডিওতে দেখা যায়, দুয়োধ্বনি এতটাই জোরে হচ্ছিল যে লাউডস্পিকারে সংগীতের ভলিউম বাড়িয়েও তা পুরোপুরি চাপা দেওয়া যায়নি।
একটি দীর্ঘস্থায়ী ঐতিহ্য
শুধু এবারই নয়, কোপা দেল রের ফাইনালে জাতীয় সংগীতের সময় দুয়ো দেওয়ার ঘটনা আগেও বহুবার ঘটেছে। গত কয়েক বছরে স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষ এই ‘হুইসলিং’ বা দুয়ো দেওয়ার ঘটনায় ক্লাবগুলোকে জরিমানা করার চেষ্টা করেও সমর্থকদের দমাতে পারেনি। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৫ সালের বার্সেলোনা–বিলবাও ফাইনালে দুয়ো দেওয়ার পর স্পেনের অ্যান্টিভায়োলেন্স কমিশন বার্সেলোনাকে ৬৬ হাজার ইউরো এবং বিলবাওকে ১৮ হাজার ইউরো জরিমানা করেছিল। যদিও আদালত পরে ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতার’ যুক্তিতে কিছুটা জরিমানা কমিয়ে দিয়েছিলেন।
কেন এই প্রতিবাদ?
প্রশ্ন উঠছে, কোপা দেল রের ফাইনালে দর্শকদের একটি অংশ কেন জাতীয় সংগীত শুনতে রাজি নয় এবং কেন তারা দুয়ো দিয়ে থাকে, যা জরিমানা করেও দমানো যাচ্ছে না। এর পেছনে মূলত তিনটি বিষয় কাজ করে:
- আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতা: কোপা দেল রের সব ফাইনালে জাতীয় সংগীতের সময় দুয়োধ্বনি দেওয়া হয় না। এটি সাধারণত বার্সেলোনা, অ্যাথলেটিক বিলবাও ও রিয়াল সোসিয়েদাদের মতো দলগুলো থাকলে ঘটে। এই দলগুলো স্পেনের বিশেষায়িত অঞ্চলের, যেমন বার্সেলোনা কাতালুনিয়ার, বিলবাও ও সোসিয়েদাদ বাস্ক কান্ট্রির। এই অঞ্চলগুলোর জনগণের একটি বড় অংশ স্প্যানিশ রাজতন্ত্র ও কেন্দ্রীয় শাসন থেকে পূর্ণ স্বাধীনতা বা অধিকতর স্বায়ত্তশাসন দাবি করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। তাদের কাছে স্পেনের জাতীয় সংগীত এবং রাজা হলেন কেন্দ্রীয় শাসনের প্রতীক, যা তারা নিজেদের সংস্কৃতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া মনে করে।
- ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: জেনারেল ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোর একনায়কতন্ত্রের সময় (১৯৩৯–১৯৭৫) বাস্ক এবং কাতালানদের আঞ্চলিক ভাষা ও পতাকা নিষিদ্ধ হয়েছিল। সেই সময় ফুটবল স্টেডিয়ামগুলোই ছিল একমাত্র জায়গা, যেখানে মানুষ নিজেদের আঞ্চলিক পরিচয় ও প্রতিবাদের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে পারত। ১৯২৫ সালে বার্সেলোনা সমর্থকেরা তৎকালীন স্বৈরশাসক প্রিমো দে রিভেরার একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে জাতীয় সংগীতে দুয়ো দিলে সরকার তাদের স্টেডিয়াম ছয় মাসের জন্য বন্ধ করে দিয়েছিল। এ ধরনের ঘটনা দিনে দিনে এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়িয়েছে।
- রাজতন্ত্রবিরোধী অবস্থান: যেহেতু এই টুর্নামেন্টের নাম ‘কোপা দেল রে’ এবং মাঠে সশরীর রাজা উপস্থিত থাকেন, তাই বিদ্রোহ প্রকাশের জন্য সমর্থকেরা এই মঞ্চকেই বেছে নেন। বিশেষ করে ২০১৭ সালের কাতালুনিয়ার স্বাধীনতা নিয়ে গণভোটের পর এই রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও তীব্র হয়েছে।
টুর্নামেন্টের রাজকীয় উৎপত্তি
কোপা দেল রে স্পেনের সবচেয়ে পুরোনো ফুটবল টুর্নামেন্ট। ১৯০২ সালে কার্লোস পাদ্রোস (পরবর্তী সময়ে রিয়াল মাদ্রিদের প্রেসিডেন্ট) রাজা ত্রয়োদশ আলফোনসোর সিংহাসনে আরোহণ উদ্যাপন করতে ‘কোপা দে লা করোনাসিওন’ নামে একটি ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করেন। অর্থাৎ এই টুর্নামেন্টের জন্মই হয়েছিল রাজার সম্মানে। স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন অবশ্য এটিকে কোপা দেল রের প্রথম আসর হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয় না; তারা ১৯০৩ সালের আসরকে প্রথম বলে। মূলত সে বছর থেকেই টুর্নামেন্টটি রাজা আনফোনসোর পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হতে শুরু করে।
প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া
স্পেনে জাতীয় সংগীতের সময় দুয়ো দেওয়ার ঘটনা শুধু মাঠে নয়, এর প্রভাব মাঝেমধ্যে বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। যেমন ২০০৯ সালের বার্সেলোনা–বিলবাও কোপা দেল রের ফাইনালে জাতীয় সংগীত বাজার সময় দর্শক দুয়ো ও শিস দিতে শুরু করলে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল টিভিই তাৎক্ষণিকভাবে সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়। এই ঘটনার বাস্ক ও কাতালুনিয়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে টিভিই তাদের ক্রীড়া বিভাগের প্রধান জুলিয়ান রেইসকে বরখাস্ত করে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, স্পেনের জাতীয় সংগীতের কোনো আনুষ্ঠানিক লিরিক (কথা) নেই। ২০০৭ সালে দেশটির জাতীয় অলিম্পিক কমিটি কথা যোগ করার চেষ্টা করেও পারেনি। কারণ কাতালুনিয়া, বাস্ক কান্ট্রি এবং অন্যান্য অঞ্চলের জাতীয়তাবাদীরা গ্রহণ করবে, এমন সর্বগ্রহণযোগ্য লিরিক অনুমোদন করা যায়নি।
সামগ্রিকভাবে, কোপা দেল রে ফাইনালে জাতীয় সংগীতে দুয়ো দেওয়া কেবল একটি ক্রীড়া অনুষ্ঠানের ঘটনা নয়; এটি স্পেনের গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনের একটি প্রতিফলন। আঞ্চলিক স্বাধীনতার দাবি, ঐতিহাসিক নিপীড়ন এবং রাজতন্ত্রবিরোধী মনোভাব এই প্রতিবাদের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে চলেছে।



