ম্যারাডোনার জন্মস্থানে এখন ক্ষুধার্ত মানুষের লঙ্গরখানা
আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনার জন্মভিটা আজ এক করুণ দৃশ্যের সাক্ষী। বুয়েনস এইরেসের শহরতলির হতদরিদ্র এলাকা ভিলা ফিওরিতোতে অবস্থিত তাঁর সেই স্মৃতিবিজড়িত আদি বাড়িটি এখন প্রতি সপ্তাহে শত শত মানুষের মিলনস্থলে পরিণত হয়েছে। তবে এই ভিড় ফুটবল তারকাকে একনজর দেখার জন্য নয়, বরং এক বেলা খাবারের আশায় প্লাস্টিকের পাত্র হাতে দাঁড়িয়ে থাকা ক্ষুধার্ত মানুষের।
জাতীয় ঐতিহাসিক স্থানে স্বেচ্ছাসেবকদের উদ্যোগ
২০২০ সালে ম্যারাডোনার মৃত্যুর পর এই বাড়িটি তাঁর পরিবারের মালিকানায় নেই। গত এক মাস ধরে বর্তমান মালিক বাড়ির উঠানটি একদল স্বেচ্ছাসেবককে ছেড়ে দিয়েছেন, যারা এটিকে লঙ্গরখানায় রূপান্তরিত করেছেন। সেখানে প্রতিবেশীদের জন্য নিয়মিত রান্নাবান্না চলছে। গত বৃহস্পতিবারের একটি দৃশ্যে দেখা গেছে মারিয়া তোরেস নামের এক নারী দুটি বড় হাঁড়িতে স্টু নাড়ছেন, পাশে অন্য স্বেচ্ছাসেবকেরা আলু ছিলছেন ও মুরগির মাংস কাটছেন। বাড়ির সামনের দেয়ালে আঁকা ম্যারাডোনার ম্যুরালের পাশে লেখা রয়েছে—‘ঈশ্বরের ঘর’।
দারিদ্র্য হ্রাসের সরকারি তথ্য ও বাস্তবতার পার্থক্য
২০২১ সালে আর্জেন্টিনা সরকার ম্যারাডোনার জন্মভিটাকে ‘জাতীয় ঐতিহাসিক স্থান’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের প্রথমার্ধে দেশের দারিদ্র্যের হার ৫২.৯ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে ২৮.২ শতাংশে নেমে এসেছে। প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে এই পরিবর্তন শুরু হয়। ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব আর্জেন্টিনার সমাজবিজ্ঞানী এদুয়ার্দো দোনজা একে দারিদ্র্য বিমোচনে ‘খুব গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য’ বলে উল্লেখ করেছেন।
তবে তাঁর মতে, আর্জেন্টিনার এখন কৃষির মতো পুঁজি-নিবিড় খাতের পরিবর্তে খনির মতো শ্রম নিবিড় খাতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ানো প্রয়োজন। মুদ্রাস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসায় দারিদ্র্যের হারও হ্রাস পেয়েছে। মিলেই ক্ষমতা নেওয়ার সময় মুদ্রাস্ফীতি দুই অঙ্কের ঘরে ছিল, যা গত ফেব্রুয়ারিতে ২.৯ শতাংশে নেমে এসেছে।
কঠোর নীতির প্রভাব ও স্থানীয় উদ্যোগ
মুদ্রাস্ফীতি কমলেও মিলেইর কঠোর ব্যয় সংকোচন নীতির ফলে সরকারি কর্মসংস্থান কমেছে। পরিবহন ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমানোর কারণে অনেক মানুষ তাদের ক্রয়ক্ষমতা হারিয়েছেন। ভিলা ফিওরিতোর এই অস্থায়ী লঙ্গরখানা পরিচালনা করছেন যাজক লিওনার্দো ফ্যাবিয়ান আলভারেজ। তিনি জানান, ছোট ছোট কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভিলা ফিওরিতোসহ অন্যান্য এলাকায় খাবারের চাহিদা বাড়ছে।
মিলেইর আমলে সহজ আমদানি নীতি ও শক্তিশালী পেসোর কারণে বিদেশ থেকে সস্তা পণ্য আসায় স্থানীয় কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আলভারেজ বলেন, ‘মানুষ স্পষ্টতই কাজ হারিয়েছেন। তাঁরা এখানে লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার সংগ্রহ করছেন। আমরা যা দিচ্ছি, তা-ই তাঁরা নিয়ে যাচ্ছেন।’
এই পরিস্থিতিতে ম্যারাডোনার জন্মভিটা শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থান নয়, বরং আর্জেন্টিনার সামাজিক-অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের একটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। স্বেচ্ছাসেবকদের এই উদ্যোগ স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে আশার আলো জ্বালিয়ে রেখেছে, যদিও বৃহত্তর অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা এখনও প্রকট।



