ঢাকার ফুটবলে 'জায়ান্ট কিলার' রহমতগঞ্জ: ঐতিহ্য ও বর্তমান সাফল্যের গল্প
পুরান ঢাকার ফুটবল ইতিহাসে রহমতগঞ্জ মুসলিম ফ্রেন্ডস সোসাইটি (এমএফএস) একটি উজ্জ্বল নাম। ১৯৩৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ক্লাবটি দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার ফুটবল অঙ্গনে তার অবস্থান ধরে রেখেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রহমতগঞ্জ 'জায়ান্ট কিলার' হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে, আবাহনী লিমিটেড, কিংস এবং মোহামেডানের মতো বড় দলগুলোকে হারিয়ে নিজের শক্তি প্রমাণ করে চলেছে।
বর্তমান পারফরম্যান্স ও সাফল্য
২০০৭ সাল থেকে পেশাদার ফুটবল লিগে অংশগ্রহণকারী রহমতগঞ্জ সাম্প্রতিক সময়ে দারুণ সাফল্য দেখিয়েছে। গত মৌসুমে বাংলাদেশ ফুটবল লিগে ১৮টি ম্যাচে ৯ জয়, ৩ ড্র এবং ৬ হার নিয়ে ৩০ পয়েন্ট অর্জন করে তারা চতুর্থ স্থান দখল করেছিল। এই মৌসুমে মোহামেডান চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ৪২ পয়েন্ট নিয়ে, ঢাকা আবাহনী রানার্সআপ হয়েছিল ৩৫ পয়েন্ট নিয়ে এবং কিংস তৃতীয় হয়েছিল ৩২ পয়েন্ট নিয়ে। রহমতগঞ্জের ঘানার ফরোয়ার্ড স্যামুয়েল বোয়েটেং ২১ গোল করে সর্বাধিক গোলদার পুরস্কার জিতেছিলেন।
চলমান ২০২৫-২৬ মৌসুমেও রহমতগঞ্জ চমক দেখিয়ে চলেছে। তারা বর্তমান চ্যাম্পিয়ন মোহামেডানকে ১-১ গোলে রুখে দিয়েছে এবং ব্রাদার্স ইউনিয়নকে ৩-২ গোলে হারিয়েছে। ১১ ম্যাচ খেলে ৫ জয়, ৩ ড্র এবং ৩ হার নিয়ে ১৮ পয়েন্টে টেবিলের চতুর্থ স্থানে রয়েছে ক্লাবটি।
ক্লাবের ইতিহাস ও প্রতিষ্ঠা
রহমতগঞ্জ এমএফএস প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৩৩ সালের জানুয়ারিতে ব্রিটিশ শাসনামলে। ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আবুল কাশেম সাহেব, যিনি পুরান ঢাকার রহমতগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। অন্যান্য প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের মধ্যে ছিলেন ইমামগঞ্জের আলাউদ্দিন, মো. আজম, আহমদ হোসেন, মো. সাদেক এবং আবু সাঈদ। প্রথম সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আবদুস সোবহান এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মো. কাশেম।
প্রাথমিকভাবে সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ শুরু করলেও ধীরে ধীরে রহমতগঞ্জ খেলাধুলায় জড়িয়ে পড়ে। ১৯৫০ সালে মো. কাশেম ঢাকা জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক খাজা আজমল সাহেবের সঙ্গে বৈঠক করে দ্বিতীয় বিভাগে প্রবেশের ব্যবস্থা করেন। ১৯৬৩ সালে ক্লাবটি তৃতীয় বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয় এবং ১৯৬৪ সালে দ্বিতীয় বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়ে প্রথম বিভাগে উন্নীত হয়।
ঐতিহাসিক মাইলফলক
রহমতগঞ্জের ইতিহাসে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য অর্জন রয়েছে। ১৯৬৬ সালে শাজাহান আলমের নেতৃত্বে ক্লাবটি প্রথমবারের মতো আগা খান গোল্ড কাপে অংশগ্রহণ করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে ক্লাবটি তৃতীয় স্থান অর্জন করে, যা স্বাধীন দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ মৌসুম ছিল। ১৯৭৭ সালে রহমতগঞ্জ তার ইতিহাসের সবচেয়ে সফল মৌসুমগুলির একটি উপভোগ করে, লিগ এবং লিবারেশন কাপ উভয় ক্ষেত্রেই ঢাকা আবাহনীর পরে রানার্সআপ হয়।
২০০৭ সালে পেশাদার ফুটবল লিগ শুরু হওয়ার পর থেকে রহমতগঞ্জ ধারাবাহিকভাবে অংশগ্রহণ করছে। ২০১৩ সালে তারা একবার চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে নেমে গেলেও পরের বছরই পেশাদার লিগে ফিরে আসে। পেশাদার লিগে শিরোপা না জিতলেও ২০১৯-২০ এবং ২০২১-২২ মৌসুমে ফেডারেশন কাপের দুটি রানার্সআপ ট্রফি অর্জন করে ক্লাবটি।
নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
রহমতগঞ্জের বর্তমান সভাপতি হাজী মো. টিপু সুলতান ক্লাবের উত্তরণের নেপথ্য নায়ক হিসেবে পরিচিত। ২০০৬-২০১৩ পর্যন্ত তিনি ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং এই সময়েই রহমতগঞ্জ 'জায়ান্ট কিলার' হিসেবে আখ্যায়িত হয়। ২০২৪-২৫ মৌসুমে তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ওই মৌসুমে ক্লাব লীগের চতুর্থ স্থান অর্জন করে, যা ক্লাবের রেকর্ড নথিতে অন্তর্ভুক্ত হয়।
হাজী মো. টিপু সুলতান বলেন, 'আমাদের পুরান ঢাকার ঐতিহ্যই হচ্ছে শতবর্ষী ক্লাব রহমতগঞ্জ মুসলিম ফ্রেন্ডস সোসাইটি। আমরা প্রতি বছর চেষ্টা করি ঐতিহ্য ধরে রেখে ক্লাবটিকে পেশাদার লিগের শিরোপা লড়াইয়ে রাখার। এতে এলাকার মানুষের ভালোবাসাও প্রতিফলিত হয়।'
রহমতগঞ্জ শুধু একটি ফুটবল ক্লাব নয়, এটি পুরান ঢাকার মানুষের আবেগের প্রতীক। প্রতি ম্যাচে মাঠে বসে থাকা দর্শকদের উৎসাহ প্রমাণ করে এই ক্লাব এখনও জীবন্ত এবং প্রাসঙ্গিক। ভবিষ্যতে রহমতগঞ্জ তার ঐতিহ্য বজায় রেখে বাংলাদেশ ফুটবলে আরও বড় সাফল্য অর্জনের লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছে।



