ইউরোপীয় ফুটবলে আয় বণ্টনে বৈপ্লবিক প্রস্তাব: ছোট ক্লাবদের জন্য সুসংবাদ
ইউরোপীয় ফুটবলে আয় বণ্টনে নতুন প্রস্তাব

ইউরোপীয় ফুটবলে আয় বণ্টনে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের প্রস্তাব

ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের আয় বণ্টনের পদ্ধতি আমূল পরিবর্তনের একটি যুগান্তকারী প্রস্তাব পেশ করেছে 'ইউনিয়ন অব ইউরোপিয়ান ক্লাব' (ইউইসি)। এই সংগঠনটি মূলত ছোট ও মাঝারি ক্লাবগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে এবং তাদের এই উদ্যোগ ইউরোপীয় ফুটবল জগতে নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

বৈষম্য দূরীকরণের প্রয়াস

বর্তমান সময়ে ইউরোপীয় ফুটবলে একদিকে রয়েছে পরাশক্তি ক্লাবগুলোর টাকার পাহাড়, অন্যদিকে ছোট ও মাঝারি ক্লাবগুলোর টিকে থাকার জন্য নিরন্তর সংগ্রাম। এই সুস্পষ্ট বৈষম্য দূর করতে এবার সক্রিয় হয়েছে ইউইসি। তারা উয়েফার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব পেশ করেছে যাতে ইউরোপীয় প্রতিযোগিতাগুলোর আয় বণ্টনের বর্তমান পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হয়।

ইউইসির দাবি অনুযায়ী, বর্তমান ব্যবস্থায় ইউরোপীয় প্রতিযোগিতাগুলোর আয় বড় ক্লাবগুলোর দিকেই বেশি হারে প্রবাহিত হয়। এর ফলে জাতীয় লিগগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতাও ধীরে ধীরে একপেশে হয়ে পড়ছে এবং ছোট ক্লাবগুলোর জন্য ইউরোপীয় আসরে অংশগ্রহণ ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।

বর্তমান বণ্টন পদ্ধতির সমস্যা

বর্তমান নিয়ম অনুসারে, উয়েফার মোট আয়ের সিংহভাগই পায় চ্যাম্পিয়ন্স লিগে অংশগ্রহণকারী দলগুলো। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট আয়ের ৭৪ শতাংশ পায় চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ক্লাবগুলো, ১৭ শতাংশ পায় ইউরোপা লিগ এবং কনফারেন্স লিগের ভাগ্যে জোটে মাত্র ৯ শতাংশ

ইউইসি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে এই অসম বণ্টনের ফলে বড় ক্লাবগুলো আরও ধনী হচ্ছে এবং অন্যান্য ক্লাবগুলোর সঙ্গে তাদের আর্থিক ব্যবধান দিন দিন বাড়তেই থাকে। এই অবস্থার কারণে অনেক লিগে শিরোপার লড়াই কিংবা ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় জায়গা পাওয়ার প্রতিযোগিতা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাচ্ছে।

ইউইসির প্রস্তাবিত নতুন মডেল

ইউইসির প্রস্তাবিত মডেলটিতে পারফরম্যান্সের চেয়ে টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। খেলার ফলাফলের ভিত্তিতে কিছু অর্থ প্রদান করা হবে বটে, তবে বাকি অংশ নতুনভাবে বণ্টন করা হবে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনটি হলো তথাকথিত 'ভ্যালু পিলার' ব্যবস্থা বাতিলের প্রস্তাব।

এই ভ্যালু পিলার ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্প্রচার বাজারের মূল্য এবং ক্লাবের ঐতিহাসিক র্যাঙ্কিং অনুযায়ী বোনাস প্রদান করা হয়। ইউইসি দৃঢ়ভাবে মনে করে যে এই পদ্ধতি বড় ক্লাবগুলোকেই আরও শক্তিশালী করে তোলে এবং ছোট ক্লাবগুলোর জন্য অসুবিধা সৃষ্টি করে।

ইউইসির প্রস্তাবিত নতুন মডেলে বিভিন্ন টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের ভিত্তিতে উয়েফার মোট আয়ের ৬২.৫ শতাংশ অর্থ বণ্টন করা হবে, বাকি ৩৭.৫ শতাংশ প্রদান করা হবে মাঠের ফলাফলের ভিত্তিতে। টুর্নামেন্টভিত্তিক বণ্টনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসবে:

  • চ্যাম্পিয়ন্স লিগ পাবে ৫০ শতাংশ (বর্তমানে ৭৪ শতাংশ)
  • ইউরোপা লিগ পাবে ৩০ শতাংশ
  • কনফারেন্স লিগ পাবে ২০ শতাংশ

আর্থিক প্রভাব বিশ্লেষণ

বর্তমানে উয়েফার মোট প্রাইজমানি প্রায় ৩৫০ কোটি ইউরো। এই বিশাল তহবিলের বণ্টন প্রস্তাবিত মডেলে কেমন হবে তা নিয়ে ইতালীয় সংবাদমাধ্যম 'ক্যালসিও ই ফিনানজা' একটি সিমুলেশন তৈরি করেছে। ইতালীয় ফুটবলের ২০২৪-২৫ মৌসুমকে এই মডেলে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:

  1. ইন্টার মিলান বা জুভেন্টাসের মতো পরাশক্তি ক্লাবগুলো এতে অনেক কম অর্থ পেত
  2. ইন্টার মিলানের প্রায় ৬ কোটি ৮০ লাখ ইউরো লোকসান হতো
  3. জুভেন্টাস হারাত প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখ ইউরো

তবে এই মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। ফিওরেন্তিনার মতো ক্লাব এই মডেলে আরও ১ কোটি ২০ লাখ ইউরো বাড়তি পেত। সবচেয়ে বেশি লাভবান হতো ঘরোয়া লিগের ছোট দলগুলো।

সিরি-আ'র যে দলগুলো ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় সুযোগ পায় না, তারা বর্তমানে উয়েফার কাছ থেকে সৌজন্য ভাতা হিসেবে পায় মাত্র ৮ লাখ ইউরো। প্রস্তাবিত এই মডেল কার্যকর হলে সেটি বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৮৬ লাখ ইউরোয়!

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

ইউইসি তাদের এই প্রস্তাবটি উয়েফা, ইউরোপিয়ান লিগস এবং ইউরোপিয়ান কমিশনের কাছে পেশ করেছে। তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো ২০২৭–২০৩১ সালের নতুন টিভি স্বত্ব চক্রে এই মডেল চালু করা। তবে বড় ক্লাবগুলো যে এই প্রস্তাব নিয়ে তীব্র আপত্তি তুলবে, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

ইউরোপীয় ফুটবলের ভবিষ্যৎ গঠনে এই প্রস্তাব কতটা কার্যকর হবে, তা এখন সময়ই বলবে। শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগ শুধু কাগুজে প্রস্তাব হিসেবেই থেকে যায় কি না, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা। তবে একথা নিশ্চিত যে ইউইসির এই পদক্ষেপ ইউরোপীয় ফুটবলে আয় বণ্টনের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সূচনা করেছে।