ইরান নারী ফুটবল দলের কোচ মারজিয়ে জাফারির অভিযোগ: টিভি মন্তব্যে প্রভাবিত হয়ে খেলোয়াড়রা অস্ট্রেলিয়ায় আশ্রয় নেন
ইরান নারী ফুটবল দলের কোচ মারজিয়ে জাফারি দাবি করেছেন যে, দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের এক উপস্থাপকের মন্তব্য দলের খেলোয়াড়দের গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। এই প্রভাবের ফলেই কিছু খেলোয়াড় অস্ট্রেলিয়ায় রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে তিনি জানিয়েছেন। শুক্রবার ইরানের ফুটবল ফেডারেশনের (এফএফআইআরআই) টেলিগ্রাম পেজে প্রকাশিত একটি বিবৃতিতে জাফারি এই কথা উল্লেখ করেন, যদিও পরে সেটি মুছে ফেলা হয়।
এএফসি নারী এশিয়ান কাপে ইরানের বিদায় ও পরবর্তী ঘটনা
অস্ট্রেলিয়ায় চলমান এএফসি নারী এশিয়ান কাপে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছে ইরান নারী ফুটবল দল। এই টুর্নামেন্টটি শুরু হওয়ার সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বিমান হামলা চালায়, যাতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। ‘এ’ গ্রুপে ইরান তিন ম্যাচের সবকটিতেই পরাজিত হয় এবং এরই মধ্যে দলের বেশির ভাগ সদস্য দেশে ফিরে গেছেন। তবে, দলটির ছয় সদস্য রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করে অস্ট্রেলিয়ায় থেকে গেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।
২ মার্চ দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে খেলা শুরুর আগে জাতীয় সংগীত বাজানোর সময় ইরানের খেলোয়াড়েরা নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এই ঘটনার পর ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে উপস্থাপক মোহাম্মদ রেজা শাহবাজি খেলোয়াড়দের জাতীয় সংগীতে গলা না মেলানোর জন্য ‘যুদ্ধকালীন বিশ্বাসঘাতক’ বলে অভিহিত করেন। কোচ জাফারি তাঁর বিবৃতিতে এই মন্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘বড় ভুলটি করেছেন তাঁরা, যাঁরা দেশে বসে সেই পরিস্থিতি না বুঝেই মেয়েদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন।’
কোচ জাফারির বক্তব্য: মানসিক প্রভাব ও পরিণতি
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের ফুটবল ফেডারেশনের দেওয়া বিবৃতিতে কোচ জাফারি বলেন, ‘আমাদের মেয়েদের ওপর প্রথম ম্যাচে তৈরি হওয়া ভারী পরিবেশের প্রভাব পড়েছিল।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এই মন্তব্য খেলোয়াড়দের মানসিকভাবে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে এবং এর পরিণতি দলকে ভোগ করতে হয়েছে। জাফারি দাবি করেন, ‘আমি নিশ্চিত, ওই পরিস্থিতি তৈরি না হলে আমাদের কোনো খেলোয়াড়ই অস্ট্রেলিয়ায় থেকে যেত না।’ তিনি ফেডারেশনকে বিষয়টি তদন্ত করার অনুরোধও জানিয়েছেন।
নারী এশিয়ান কাপে অংশ নেওয়া ইরান দলের মোট ছয় সদস্যকে অস্ট্রেলিয়া মানবিক ভিসা প্রদান করেছে। আরও একজন খেলোয়াড়কে আশ্রয় দেওয়া হলেও তিনি পরে তা প্রত্যাখ্যান করেন। কোচ জাফারি সেই ফুটবলারের নাম প্রকাশ করে বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার পুলিশ কয়েক দফায় খেলোয়াড়দের ডেকে নিয়ে তাদের সঙ্গে একান্তে কথা বলেছে, সৃষ্ট রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাবে তাদের সেখানে থেকে যেতে রাজি করানোর চেষ্টা করেছে।’ তিনি যোগ করেন যে, দলের বেশির ভাগ সদস্য এই প্রস্তাবে নেতিবাচক সাড়া দিয়েছে এবং মোহাদ্দেসে জোলফি প্রথমে ইতিবাচক সাড়া দিলেও দ্রুত মত বদলেছে এবং ইনশা আল্লাহ দলের সঙ্গে ইরানেই ফিরবে।
গুজবের খণ্ডন ও বর্তমান অবস্থান
ইরান নারী ফুটবল দল বর্তমানে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছে। কোচ জাফারি অন্য দুই ফুটবলার গোলনুশ খোসরাভি ও আফসানেহ চাত্রেনুরকে নিয়ে ছড়ানো গুজবেরও খণ্ডন করেছেন। তিনি বলেন, ‘গোলনুশ খোসরাভি ও আফসানেহ চাত্রেনুরকে নিয়ে যে গুজব ছড়িয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তারা এখন আমাদের সঙ্গে মালয়েশিয়ায় আছে এবং শিগগিরই আমরা ইরানের উদ্দেশে রওনা হব।’ এই বিবৃতি দিয়ে তিনি দলের একতা ও দেশে ফেরার পরিকল্পনা সম্পর্কে নিশ্চিত করেছেন।
এই ঘটনা ইরানের ক্রীড়া জগতে একটি বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যা খেলোয়াড়দের মানসিক স্বাস্থ্য ও রাজনৈতিক প্রভাবের দিকগুলো উন্মোচন করে। কোচ জাফারির বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, মিডিয়া ও প্রশাসনিক মন্তব্য ক্রীড়াবিদদের উপর কতটা গভীর প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতার সময়।
