ইরানের নারী ফুটবলারদের নীরব প্রতিবাদ: জাতীয় সঙ্গীত বর্জনে উত্তপ্ত কূটনীতি
ইরানের নারী ফুটবলারদের নীরব প্রতিবাদ, উত্তপ্ত কূটনীতি

ইরানের নারী ফুটবলারদের নীরব প্রতিবাদ: জাতীয় সঙ্গীতে স্তব্ধতা

ফুটবল মাঠে জাতীয় সঙ্গীত বাজলে খেলোয়াড়রা সাধারণত কণ্ঠ মেলান। কিন্তু গত সপ্তাহে অস্ট্রেলিয়ার গোল্ড কোস্টে এশিয়ান কাপের ম্যাচে ইরানের নারী ফুটবল দল এই প্রথা ভেঙে দিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের আগে ইরানের জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হলে সমস্ত ফুটবলার পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। একজনেরও ঠোঁট নড়েনি। এই স্তব্ধতা আসলে হয়ে উঠেছে এক শক্তিশালী নীরব প্রতিবাদ।

প্রতিবাদের পটভূমি: যুদ্ধের ছায়ায় মাঠ

এই ঘটনাটি ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র দুই দিন পর। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ইরানের বর্তমান শাসকদের বিরুদ্ধে নারী ফুটবল দলের এই প্রতিবাদ রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। হাজার মাইল দূরের এই প্রতিবাদ তেহরানের নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে ক্যানবেরার কূটনৈতিক মহল পর্যন্ত নাড়িয়ে দিয়েছে।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের কঠোর প্রতিক্রিয়া

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সরাসরি এই নারী ফুটবলারদের 'যুদ্ধকালীন বিশ্বাসঘাতক' তকমা দিয়েছে। এই তকমা তাদের জীবনের ওপর ঝুলিয়ে দিয়েছে এক বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন। এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই দৃশ্য তাদের চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক সমর্থন ও উদ্বেগ

ইরানের প্রয়াত শাহের পুত্র রেজা পাহলভি, যিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত, তিনি বলেছেন এই মেয়েদের রক্ষার দায়িত্ব এখন অস্ট্রেলিয়ার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, 'ইরানের নারী ফুটবলাররা এখন প্রচণ্ড চাপের মুখে। ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পক্ষ থেকে তাদের প্রতিনিয়ত হুমকি দেওয়া হচ্ছে।' তিনি অস্ট্রেলিয়া সরকারকে আহ্বান জানিয়েছেন তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।

এই লড়াইয়ে শামিল হয়েছেন হ্যারি পটার স্রষ্টা জে কে রাউলিংও। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকুতি জানিয়েছেন, 'দয়া করে এই তরুণীদের রক্ষা করুন।' অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ক্যাম্পেইনার জাকি হায়দারি আরও আশঙ্কার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, হয়তো এরই মধ্যে দেশে থাকা তাদের পরিবারগুলোকে হুমকি দেওয়া শুরু হয়েছে।

ম্যাচ পরবর্তী উত্তেজনাপূর্ণ দৃশ্য

গতকাল নারী এশিয়ান কাপে ইরান নিজেদের শেষ ম্যাচ ফিলিপাইনের বিপক্ষে খেলেছে। ম্যাচের পর স্টেডিয়ামের বাইরে তৈরি হয়েছিল অভূতপূর্ব দৃশ্য। অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী ইরানি সমর্থকেরা ড্রাম বাজিয়ে স্লোগান তুলেছিলেন—'সেভ আওয়ার গার্লস'। তারা নারী ফুটবলারদের বাসের চারপাশে ঘিরে ধরে দাবি তুলেছিলেন, তাদের যেন ইরানে ফেরত না পাঠানো হয়।

আজ সকালে গোল্ড কোস্টে ইরানের টিম হোটেলের ব্যালকনিতে দেখা গেছে বিষণ্ন মুখগুলো। কারও কানে হেডফোন, কেউবা উদাস চোখে তাকিয়ে আছেন প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে। এই দৃশ্য তাদের মানসিক চাপের গভীরতা ফুটিয়ে তুলছে।

অস্ট্রেলিয়ার সরকারি অবস্থান

ইরানের এই মেয়েদের রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া হতে পারে কি না, এ বিষয়ে এখনো স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি ক্যানবেরা থেকে। গতকাল বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং শুধু বলেছেন, অস্ট্রেলিয়া ইরানের জনগণের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এখনই নিরাপত্তার স্বার্থে বিস্তারিত কিছু বলতে নারাজ।

জাকি হায়দারির মতে, কড়া নজরদারির মধ্যেও খেলোয়াড়দের সামনে হয়তো বিমানবন্দরে পৌঁছে আশ্রয় চাওয়ার জন্য খুব ছোট একটি সুযোগ তৈরি হতে পারে। এএফপি জানিয়েছে, অস্ট্রেলিয়ায় ইরানের দূতাবাস এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

এই ঘটনা ইরানের নারী ফুটবল দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। এটি কেবল একটি ক্রীড়া ইস্যু নয়, বরং একটি জটিল কূটনৈতিক ও মানবাধিকার সংকটের প্রতিফলন।