অস্ট্রেলিয়ায় এশিয়ান নারী ফুটবল কাপে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক অভিষেক
বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে একটি গৌরবময় অধ্যায় শুরু হতে চলেছে। ১৯৮০ সালে পুরুষ দল এশিয়ান কাপের চূড়ান্ত পর্বে খেলার পর দীর্ঘ ৪৫ বছর অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে এবার বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত ২১তম এশিয়ান নারী ফুটবল কাপের চূড়ান্ত পর্বে অভিষেক করছে। এই টুর্নামেন্টে অংশ নিচ্ছে মোট ১২টি দেশের দল, যার মধ্যে বাংলাদেশই একমাত্র দল যাদের প্রথমবারের মতো এই মঞ্চে উপস্থিতি ঘটছে।
প্রথম ম্যাচে চীনের মুখোমুখি বাংলাদেশ
৩ মার্চ ওয়েস্টার্ন সিডনি স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ দল তাদের প্রথম ম্যাচে মুখোমুখি হবে এশিয়ান নারী ফুটবলের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ও সবচেয়ে সফল দল চীনের। চীন দল এবার দশম এশিয়ান নারী ফুটবল শিরোপার লক্ষ্যে অস্ট্রেলিয়ায় এসেছে এবং কখনোই এই টুর্নামেন্টে সেরা চারের বাইরে থাকেনি। বাংলাদেশ দলের র্যাঙ্কিং ১১২ হলেও পরিসংখ্যানের এই খতিয়ান মাঠের লড়াইয়ে কতটুকু প্রভাব ফেলবে তা নিয়ে ভাবছেন না দলের খেলোয়াড়রা।
টুর্নামেন্টের কাঠামো ও গুরুত্ব
এই টুর্নামেন্টটি ২১ দিন ধরে অস্ট্রেলিয়ার তিন শহরের পাঁচটি মাঠে অনুষ্ঠিত হবে, যার মধ্যে রয়েছে পার্থ স্টেডিয়াম, পার্থ রেক্ট্যাঙ্গুলার স্টেডিয়াম, স্টেডিয়াম অস্ট্রেলিয়া, ওয়েস্টার্ন সিডনি স্টেডিয়াম এবং গোল্ড কোস্ট স্টেডিয়াম। ২১ মার্চ স্টেডিয়াম অস্ট্রেলিয়ায় ফাইনাল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে ২০০০ সালে সিডনি অলিম্পিক গেমসের মূল আয়োজন হয়েছিল। এই টুর্নামেন্টের মাধ্যমে ২০২৭ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠেয় ফিফা নারী বিশ্বকাপের জন্য এশীয় অঞ্চলের চূড়ান্ত বাছাইপর্ব নির্ধারিত হবে।
- আটটি কোয়ার্টার-ফাইনালিস্ট দল ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক গেমসের বাছাইপর্বে খেলার সুযোগ পাবে।
- সেরা চার দল সরাসরি বিশ্বকাপে যাবে।
- সেরা ছয় দলের মধ্যে বাকি দুই দল বিশ্বকাপে যাওয়ার প্লে-অফ খেলার সুযোগ পাবে।
বাংলাদেশ দলের প্রস্তুতি ও চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশ দল প্রস্তুতি স্বল্পতা নিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বাফুফে কর্তারা বড় বড় কথা বললেও দেশের বাইরে ক্যাম্প করতে পারেননি এবং কোনো প্রস্তুতি ম্যাচ খেলা ছাড়াই দল সিডনিতে এসেছে। শেষ মুহূর্তে অসুস্থ হয়ে পড়ায় দলের ফিজিও আসতে পারেননি, ফলে অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী এক বাংলাদেশি পুরুষ ফিজিওকে বিকল্প হিসেবে নেওয়া হয়েছে। বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল সংবাদমাধ্যমে উস্মা প্রকাশ করে বলেছেন, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে প্রস্তুতি ম্যাচ খেলার কথাবার্তা তিনি এগিয়ে নিলেও শেষ পর্যন্ত সেটা হয়নি সহকর্মীদের ব্যর্থতায়।
সিডনিতে এসে বাংলাদেশ দল স্থানীয় ‘এ’ লিগের দল ওয়েস্টার্ন সিডনি ওয়ান্ডারার্সের বিপক্ষে একটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছে, যা ১-১ গোলে ড্র হয়েছে। কোচ পাঁচ জন ডিফেন্ডার খেলিয়েছেন এবং চীনের বিপক্ষেও এই কৌশল প্রয়োগ করতে পারেন। রক্ষণভাগকে নিচ্ছিদ্র রেখে পাল্টা আক্রমণে ওঠার কৌশল নিয়ে শিষ্যদের তালিম দিচ্ছেন অনুশীলনে।
খেলোয়াড়দের প্রতিক্রিয়া ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা
ডিফেন্ডার শিউলি আজিম বলেছেন, ‘আশা করি চীনের বিপক্ষে আমরা আমাদের সর্বোচ্চটা দিতে পারব। ওয়েস্টার্ন সিডনি ওয়ান্ডারার্সের সঙ্গে যে ভুলগুলো হয়েছিল, সেগুলো শুধরে ভালো খেলব।’ তরুণ ফরোয়ার্ড সুরভী আকন্দ যোগ করেছেন, ‘প্রস্তুতি ম্যাচে ওয়েস্টার্ন সিডনি ওয়ান্ডারার্সের বিপক্ষে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করেছি আমরা, যা আমাদের আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।’
টুর্নামেন্টের নির্বিঘ্ন আয়োজনের জন্য নিরাপত্তাব্যবস্থায় কড়াকড়ি দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ দলের সঙ্গে নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ান নারী নিরাপত্তাকর্মী সাংবাদিকদের সতর্ক করে জানিয়েছেন, খেলোয়াড়দের কাছে যাওয়া তো দূরের কথা, হোটেলেও আসা চলবে না। দলের লিয়াজোঁ নিযুক্ত হয়েছেন অস্ট্রেলিয়ান ফুটবল লিগের সাবেক এক গোলরক্ষক, যিনি নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
সিডনি অলিম্পিক স্টেডিয়াম চত্বরে ২০০০ সালের অলিম্পিকে অংশ নেওয়া বাংলাদেশের অ্যাথলেটদের নাম লেখা স্টিলের পিলারগুলো নস্টালজিয়া জাগায়। যদিও ২১ মার্চের ফাইনালে বাংলাদেশ খেলবে—এমন বাজি ধরার লোক নিশ্চিতভাবেই পাওয়া যাবে না, তবুও টুর্নামেন্ট থেকে বড় কিছু অর্জনের হাতছানি রয়েছে। বাংলাদেশের মেয়েদের জন্য এই সমীকরণ রোমাঞ্চকর, এবং তারা তাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা দিয়ে ইতিহাস গড়তে প্রস্তুত।
