অ্যাঞ্জেল মাতেওস গঞ্জালেস। ইনস্টাগ্রাম/কলুঙ্গা। মাঠের এক কোণে রাখা একটি কড়াই। গোলপোস্টের সামনে জমে থাকা কাদা থেকে জল সরানোর সেই পুরোনো কৌশল। আজকের নিখুঁত টার্ফ আর যান্ত্রিক ফুটবলের যুগে দৃশ্যটা প্রায় অবিশ্বাস্য শোনায়। তবে ফুটবল এক সময় এমনই ছিল, বিশেষ করে বৃষ্টিপ্রবণ এলাকার প্রাকৃতিক ঘাসের মাঠে।
সেই ধূসর স্মৃতির ভেতর দিয়ে বেড়ে ওঠা এক যুবক একবিংশ শতকের এই সময়ে এসে আবার যখন গ্লাভস হাতে গোলপোস্টে নামার অপেক্ষায়, তখন ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে খসে পড়েছে ২৭টি বছর। স্পেনের আঞ্চলিক ফুটবলের দল সিডি কলুঙ্গার হয়ে আগামী রোববার গোলপোস্ট সামলাতে নামছেন ৭০ বছর বয়সী অ্যাঞ্জেল মাতেওস গঞ্জালেস। যা হতে যাচ্ছে স্পেনের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক খেলোয়াড় হিসেবে কোনো অফিশিয়াল ম্যাচে মাঠে নামার রেকর্ড।
খনি থেকে খেলার মাঠ
গঞ্জালেসের গল্পটা শুধু ফুটবলের নয়, শ্রম আর আবেগেরও। একসময় খনিশ্রমিক ছিলেন তিনি, টানা ২৫ বছর ছিলেন কঠিন সেই পেশায়। তবে ফুটবল কখনোই তাঁকে ছাড়েনি। ১০ বছর বয়সে তুরনের যুব দলে যোগ দেওয়া সেই গঞ্জালেস একটানা খেলেছেন ৪৩ বছর বয়স পর্যন্ত। ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি উচ্চতার এই গোলরক্ষক খেলেছেন কাউডাল, সান্তিয়াগো ডি অ্যালারের মতো ক্লাবে। খেলেছেন স্প্যানিশ ফুটবলের তৃতীয় বিভাগ ও সেকেন্ড ডিভিশন ‘বি’তেও।
৪৩ বছর বয়সে ফেডারেশন ফুটবল থেকে অবসর নিলেও গঞ্জালেস বাস্তবে খেলা থেকে সরে যাননি কখনোই। হুনোসা কোম্পানির দল, তুরন ভেটেরান্স যখন যেখানে খেলার সুযোগ মিলেছে, সেখানেই খেলেছেন। এখনো খেলেন, এখনো জেতেন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম লা প্রভিন্সিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজেই হাসতে হাসতে বলেন, ‘গত সপ্তাহেই তুরন ভেটেরান্সের হয়ে আমরা হিস্পানিকোকে হারিয়েছি। এখনো নিজেকে বেশ চটপটে মনে হয়!’
অ্যাঞ্জেল মাতেওস গঞ্জালেস। ইনস্টাগ্রাম/কলুঙ্গা।
রেকর্ড নয়, বরং মূল্যবোধের জয়
লা প্রভিন্সিয়া বলছে, স্পেনের ফেডারেশন ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামার রেকর্ড গড়তে যাচ্ছেন গঞ্জালেস। আগের রেকর্ডটি যার, তার চেয়ে প্রায় ১০ বছরের বড় গঞ্জালেস। তবে কলুঙ্গার কাছে এটি কোনো রেকর্ড গড়ার গল্প নয়। ক্লাবটি স্পষ্ট করে বলেছে, ‘এটি সংখ্যার বিষয় নয়, এটি মূল্যবোধের বিষয়।’
ইনস্টাগ্রাম পোস্টে কলুঙ্গা লিখেছে, ‘আমরা এমন একজন সাবেক খনি শ্রমিকের কথা বলছি যিনি তার পুরো জীবন কাজ এবং ফুটবলের পেছনে উৎসর্গ করেছেন। পাশাপাশি যিনি এই পুরো মৌসুমজুড়ে আমাদের গোলরক্ষকদের সাহায্য করে গেছেন।’
সেই সব দিন
পৃথিবীর আরও অনেক জায়গার মতো স্পেনের আস্তুরিয়াস অঞ্চলের মাঠগুলোয় বৃষ্টির কারণে প্রচুর কাদা জমত। বৃষ্টিতে ফুটবল অনেকের কাছে উপভোগ্য হলেও গোলকিপারদের জন্য তা সবচেয়ে বড় শত্রু। নিজের ফুটবল–জীবনের শুরুর দিকের ওই সময়ের স্মৃতিচারণা করে গঞ্জালেস বলেন, ‘বল, মাঠ—সবকিছুই আলাদা ছিল। আমার মনে আছে, গোলপোস্টের পাশে আমি একটি বালতি রাখতাম, যাতে রেফারিকে না দেখিয়ে কাদা থেকে জল সরাতে পারি। তখন এটা প্রায় প্রতিদিনের ঘটনা ছিল।’
প্রতিদান নয়, অর্জন
সিডি কলুঙ্গা খেলে স্প্যানিশ ফুটবলের চতুর্থ স্তরের লিগ ‘তেরসেরা ফেডারেশন গ্রুপ টু’-তে। রোববার সান্টিয়ানেস মিউনিসিফাল স্টেডিয়ামে দলটি খেলবে প্রাভিয়ানোর বিপক্ষে। ১৮ দলের লিগে কলুঙ্গা বর্তমানে দশম স্থানে। হাতে আর মাত্র দুটি ম্যাচ। অবনমনের শঙ্কা যেমন নেই, তেমনি প্রমোশন পাওয়ার লড়াইও শেষ। আর ঠিক এই নির্ভার অবস্থাতেই ক্লাবটি সুযোগ করে দিচ্ছে মাতেওস গঞ্জালেসকে।
রোববার কলুঙ্গার গোলপোস্টের নিচে ৭০ বছরের এই বৃদ্ধের দাঁড়ানোটা স্রেফ একটি দলের গোলপোস্ট সামলানোই হবে না, সেটি হবে ফুটবলের প্রতি আজন্ম ভালোবাসার এক জীবন্ত উদ্যাপন। কলুঙ্গা তো লিখেছেই, ‘বয়স ৭০ বছর বলে গঞ্জালেস খেলছেন না, খেলছেন তিনি সেটা অর্জন করে নিতে পেরেছেন বলে।’



