বিশ্বকাপের আগে ব্রাজিলের গোলবার নিয়ে দুশ্চিন্তা
বিশ্বকাপের আগে ব্রাজিলের গোলবার নিয়ে দুশ্চিন্তা

বিশ্বকাপ শুরু হতে আর বেশি দিন বাকি নেই। এখন এই আলোচনা হওয়াটাই একটু অস্বাভাবিক। কিন্তু আলোচনা ঠিকই হচ্ছে। যেটির বিষয়—২০২৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের গোলপোস্টের নিচে দাঁড়াবেন কে?

গোলরক্ষক সংকট

২০২২ বিশ্বকাপের পর থেকে এখন পর্যন্ত ব্রাজিলের গোলপোস্ট সামলানোর জন্য ডাক পেয়েছেন মোট ১০ জন। কিন্তু সবুজ ঘাসে দাঁড়িয়ে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ হয়েছে মাত্র পাঁচজনের। কার্লো আনচেলত্তি যখন দায়িত্ব নিলেন, তখন থেকেই তাঁর নোটবুকে পাঁচটি নাম ঘুরেফিরে এসেছে—আলিসন বেকার, এদেরসন, বেন্তো, হুগো সুজা ও জন ভিক্তর।

আনচেলত্তি গত ফিফা উইন্ডোতেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তাঁর প্রথম তিন পছন্দ মোটামুটি চূড়ান্ত। দৌড়ে সবার আগে আলিসন, এদেরসন ও বেন্তো। কিন্তু মুশকিল হলো, প্রথম দুজন যেন ইদানীং চোটের সঙ্গেই বেশি সখ্য গড়েছেন। তাঁদের ফিটনেস তাই ব্রাজিল কোচের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আলিসন ও এদেরসন—গত কয়েক বছর ধরে এই দুজনই ব্রাজিলের গোলবারের নিচের অতন্দ্রপ্রহরী। ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপেও আলিসনই ছিলেন মূল গোলরক্ষক। তবে এই বিশ্বকাপ চক্রে ছবিটা কিছুটা ধূসর। ব্রাজিলের খেলা সর্বশেষ ৩৫টি ম্যাচের মধ্যে এই দুজনকে একসঙ্গে স্কোয়াডে পাওয়া গেছে মাত্র ৮টিতে।

চোটের কারণে দুশ্চিন্তা

আলিসন টানা দ্বিতীয় মৌসুমে পেশির চোটে ভুগছেন। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে এই মৌসুমে লিভারপুলের বাজে পারফরম্যান্সের বড় একটা কারণ ছিল দফায় দফায় তাঁর অনুপস্থিতি। তিনি খেললে এখনো বিশ্বসেরাদের একজন, কিন্তু শরীর বাদ সাধলে তো মুশকিল। মার্চের মাঝামাঝি থেকে আলিসন আবার চোটে পড়ে মাঠের বাইরে।

অন্যদিকে এদেরসন এখন খেলছেন তুরস্কের ক্লাব ফেনেরবাচেতে। চোট থেকে ফিরেছেন খুব বেশি দিন হয়নি। তাঁর শারীরিক অবস্থা এবং সাম্প্রতিক কিছু ভুল চিন্তায় রাখছে ম্যানেজমেন্টকে। বিশেষ করে রিজেস্পোরের সঙ্গে ড্রয়ের ম্যাচে তার এক ভুল লিগ শিরোপার দৌড়েও ধাক্কা দিয়েছিল ক্লাবকে। আনচেলত্তি যদি সেই ম্যাচ দেখে থাকেন, দুশ্চিন্তায় পড়েছেন হয়তো।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আনচেলত্তির অধীনে এখন পর্যন্ত পাঁচবার ব্রাজিল দল ঘোষণা করা হয়েছে, এই দুজনের ডাক পড়েছে তিনবার করে। দুজনকে একসঙ্গে সুস্থ অবস্থায় পাওয়া গেছে দুইবার।

৩৩ বছর বয়সী আলিসন সর্বশেষ জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে, বলিভিয়ার বিপক্ষে। এর পর থেকে হ্যামস্ট্রিং চোটের সঙ্গে লড়াই করছেন। ক্লাবের হয়ে ফিরলেও আবার ছিটকে গেছেন। তবে স্বস্তির খবর হলো, লিভারপুল কোচ আর্নে স্লট জানিয়েছেন, আলিসন আবার ফেরার খুব কাছাকাছি। জাতীয় দলে সর্বশেষ বিশ্বকাপ থেকে এখন পর্যন্ত গোলকিপারদের মধ্যে তাঁর পারফরম্যান্সই সবচেয়ে উজ্জ্বল। ১৫টি ম্যাচ খেলে গোল হজম করেছেন ১১টি।

অন্যদিকে এদেরসনের এখন ৩২, ফেনারবাচের হয়ে এই মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৩৫টি ম্যাচ খেলেছেন। সর্বশেষ আন্তর্জাতিক বিরতিতে ফ্রান্সের কাছে ২-১ ব্যবধানে হারার ম্যাচে তিনিই ছিলেন ব্রাজিলের গোলপোস্টে পাহারাদার। পারফরম্যান্স বিচার করলে তাঁকে কিছুটা পিছিয়েই রাখতে হবে। সর্বশেষ বিশ্বকাপ থেকে এখন পর্যন্ত ব্রাজিলের হয়ে ১২ ম্যাচ খেলে তিনি গোল খেয়েছেন ১৪টি।

বিকল্প গোলরক্ষকদের অবস্থান

এই দুজনের চোট ও কিছু কিছু ক্ষেত্রে নড়বড়ে পারফরম্যান্সের কারণে কেউ কেউ বিকল্প ভাবার কথা বলছেন। তবে বোতাফোগো ও ব্রাজিলের সাবেক গোলরক্ষক জেফারসন শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞতার ওপরই বাজি ধরতে চান। তাঁর মতে, ‘চোটের কারণে খেলার ছন্দ বিগড়ে যেতে পারে ঠিকই, কিন্তু বড় মঞ্চে অভিজ্ঞতাটাই আসল। শরীর যদি ১০০ ভাগ ফিট থাকে, তবে বিশ্বকাপের দলে আলিসন-এদেরসনের এক পা দিয়েই রাখা আছে।’

ব্রাজিলিয়ান ক্লাব ভাস্কো দা গামা ও পালমেইরাসের সাবেক গোলরক্ষক ফার্নান্দো প্রাসও অনেকটা একই সুরে কথা বললেন। তবে তাঁর কণ্ঠে কিছুটা আক্ষেপ, ‘এদেরসন প্রিমিয়ার লিগ ছেড়ে তুর্কি লিগে গিয়ে এক ধাপ নিচে নেমেছেন। কিন্তু বিশ্বকাপ বলে কথা! আলিসন যদি প্রিমিয়ার লিগের শেষ কয়েক রাউন্ড খেলতে পারেন, তবে সেরা ছন্দেই তাঁকে পাওয়া যাবে।’

মূল দুই গোলরক্ষককে ঘিরে নানা প্রশ্ন তৈরি হওয়ায় হুট করেই এখন ব্রাজিলের তৃতীয় গোলরক্ষকের জায়গাটি এখন বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে। আর এই দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে আল নাসরের ২৬ বছর বয়সী বেন্তো। আনচেলত্তির পাঁচটি স্কোয়াডেই তাঁর নাম ছিল। জাতীয় দলের হয়ে ১৩ বার ডাক পেয়ে ৬টি ম্যাচে গোলপোস্ট সামলেছেন তিনি। তবে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে গোলবার ছেড়ে বেরিয়ে এসে করা তাঁর একটা ভুল নিয়ে সমালোচনাও আছে। সব মিলিয়ে এই ৬ ম্যাচে গোল হজম করেছেন ৯টি।

বেন্তোর পেছনেই আছেন করিন্থিয়ানসের হুগো সুজা এবং নটিংহাম ফরেস্টের জন। জেফারসনের ভাষায়, তিনজনই লড়াইয়ে আছে। তবে হুগো এখন যে ফর্মে আছেন, তাতে তিনি বড় দাবিদার। তবে ব্রাজিলিয়ান ক্রীড়া সাংবাদিক ফ্রেড কালদেইরা এক চমকপ্রদ নাম প্রস্তাব করেছেন—ফ্লুমিনেন্সের ৪৫ বছর বয়সী ফ্যাবিও। যদিও আনচেলত্তি বা গোলরক্ষক কোচ তাফরেল এই বুড়ো গোলরক্ষককে ডাকবেন কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

ব্রাজিলের গোলপোস্ট নিয়ে এই দুশ্চিন্তা আবার অনেকের একটু সুদূরপ্রসারী। ফার্নান্দো প্রাস যেমন প্রশ্ন তুলেছেন, ‘২০৩০ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের গোলকিপার কই?’ তাঁর কথা, ‘বেন্তোকে যদি আলিসন-এদেরসনের উত্তরসূরি হতে হয়, তবে তাঁকে সৌদি লিগ ছেড়ে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ইউরোপীয় লিগে ফিরতে হবে।’

সেই ভাবনা না হয় ভবিষ্যতের জন্য তোলা থাক। আপাতত ব্রাজিলিয়ান ফুটবলপ্রেমীদের প্রার্থনা একটাই, বিশ্বকাপের আগে আলিসন ও এদেরসনের শরীরটা যেন আর বেইমানি না করে। কারণ, সাম্বার ছন্দে আক্রমণভাগ যত ধারালোই হোক, দুর্গের রক্ষণে ফাটল থাকলে হেক্সা জয়ের স্বপ্নটা আবারও বালুর বাঁধ হয়েই থেকে যাবে।