সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ফিফার সদরদপ্তরে এক বৈঠকে ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রাইজমানি ও অংশগ্রহণ ফি বাড়ানোর ব্যাপারে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে ফিফা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘গার্ডিয়ান’ জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহে ভ্যাঙ্কুভারে ফিফা কাউন্সিলের সভায় এই বর্ধিত তহবিলের অনুমোদন পাওয়ার কথা।
বর্ধিত প্রাইজমানির পটভূমি
আগামী ১১ জুন শুরু হতে যাওয়া বিশ্বকাপের আয়োজক উত্তর আমেরিকার তিনটি দেশ যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা। যুক্তরাষ্ট্রসহ উত্তর আমেরিকার দেশগুলোতে যাতায়াত খরচ, পরিচালনা ব্যয় এবং করের উচ্চ হারের কারণে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—বেশ কিছু ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের এমন উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাইজমানি ও অংশগ্রহণ ফি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
গত ফেব্রুয়ারিতে ‘গার্ডিয়ান’-এ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলোর এই উদ্বেগের বিষয়টি প্রথম উঠে আসে। আশঙ্কা করা হচ্ছিল, কোনো দল টুর্নামেন্টের শেষ ধাপ পর্যন্ত গেলেও বর্তমান খরচ অনুযায়ী তাদের লোকসান হতে পারে।
প্রাইজমানির বর্তমান কাঠামো
গত বছর ডিসেম্বরে ফিফা ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য রেকর্ড ৭২ কোটি ৭০ লাখ ডলার প্রাইজমানি ঘোষণা করেছিল। সেই ঘোষণা অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারী ৪৮টি দলের প্রতিটির ন্যূনতম ১ কোটি ৫ লাখ ডলার ও বিজয়ীদের ৫ কোটি ডলার পাওয়ার কথা। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বিভিন্ন জাতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে আলোচনার পর এই অঙ্ক আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
উন্নয়ন তহবিল বৃদ্ধি
ফিফার ২১১টি সদস্যদেশের জন্য নির্ধারিত উন্নয়ন তহবিলের পরিমাণও বাড়বে। আগামী চার বছরের চক্রে এই খাতে আগে থেকে বরাদ্দকৃত ২৭০ কোটি ডলারের চেয়েও বেশি অর্থ বিতরণ করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিটি জাতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের জন্য ৫০ লাখ ডলার এবং ফুটবল উন্নয়নের জন্য ছয়টি মহাদেশীয় ফুটবল সংস্থার প্রতিটির জন্য ৬ কোটি ডলার করে অনুদান নিশ্চিত করা হয়েছিল। এখন এই অর্থের পরিমাণ আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ফিফা কাউন্সিলের সভা
আগামীকাল কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে ফিফা কাউন্সিলের একটি সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে এক বিবৃতিতে ফিফার এক মুখপাত্র বলেন, ‘বিশ্বজুড়ে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলোর জন্য আয়ের পরিমাণ বাড়াতে আলোচনা চলছে, এটি ফিফা নিশ্চিত করছে।’
চলতি বছরের বিশ্বকাপসহ চার বছরের এই চক্রে ফিফা ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যার মধ্যে কেবল বিশ্বকাপ থেকেই আসবে ৯০০ কোটি ডলার। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, শক্তিশালী আর্থিক অবস্থানের কারণেই প্রাইজমানি ও অংশগ্রহণ ফি বাড়ানোর পথে হাঁটছে ফিফা।
ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের ভূমিকা
ফিফার ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ব ফুটবলের উন্নয়নে ১ হাজার ১৬৭ কোটি ডলার পুনঃ বণ্টন করার কথা ছিল, যা আগের চক্রের চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি। এখন সেই অঙ্ক আরও বাড়বে।
গার্ডিয়ান জানিয়েছে, ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনসহ (এফএ) ইউরোপের বড় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলো প্রাইজমানি বাড়াতে ফিফার কাছে আবেদন করেছিল। তাদের আশঙ্কা ছিল, বর্তমান প্রাইজমানি কাঠামোতে এই বিশ্বকাপে অংশ নিলে তাদের বড় অঙ্কের আর্থিক লোকসান হতে পারে।
পর্যায়ভিত্তিক প্রাইজমানি
ফিফার প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিশ্বকাপে প্রতিটি ধাপে উত্তীর্ণ হওয়ার পুরস্কারের পরিমাণ খুব সামান্য হারে বাড়ে। যেমন শেষ ৩২-এ উঠলে অতিরিক্ত ২০ লাখ ডলার, শেষ ষোলোর জন্য আরও ৪০ লাখ এবং কোয়ার্টার ফাইনালের জন্য বাড়তি ৮০ লাখ ডলার বরাদ্দ থাকে। বড় অঙ্কের প্রাইজমানি রাখা হয় কেবল সেমিফাইনাল ও ফাইনালে ওঠা দলগুলোর জন্য।
ইউরোপীয় ফেডারেশনগুলোর দাবি ছিল, সেমিফাইনালে না পৌঁছানো পর্যন্ত তাদের লাভ করার সুযোগ নেই। এ নিয়ে তারা উয়েফার মাধ্যমে ফিফার সঙ্গে আলোচনা চালায়। ফিফা তাদের উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়ায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো সন্তোষ প্রকাশ করেছে।
কর সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ
যুক্তরাষ্ট্রে টুর্নামেন্ট পরিচালনার উচ্চ ব্যয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের করের ভিন্নতা দলগুলোর কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। ফিফা নিজে করমুক্ত সুবিধা পেলেও পূর্ববর্তী টুর্নামেন্টগুলোর মতো এবার বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাওয়া ৪৮টি দেশের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের জন্য কোনো কর মওকুফ সুবিধা নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও সংশ্লিষ্ট শহরগুলোর বিভিন্ন স্তরে কর পরিশোধ করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যভেদে এই করের হার ভিন্ন। ফ্লোরিডায় কোনো রাষ্ট্রীয় কর নেই, সেখানকার শহর মায়ামিতে সাতটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। ফাইনাল আয়োজক নিউ জার্সিতে করের হার ১০.৭৫ শতাংশ ও ক্যালিফোর্নিয়ায় (লস অ্যাঞ্জেলেস ও সান ফ্রান্সেসকো) এই হার ১৩.৩ শতাংশ।



