বাঘা শরীফের টানা তৃতীয় জয় জব্বার বলীখেলায়
বাঘা শরীফ টানা তৃতীয়বার জব্বার বলীখেলায় চ্যাম্পিয়ন

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী আবদুল জব্বার স্মৃতি বলীখেলায় টানা তৃতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন মো. শরীফ, যিনি ‘বাঘা’ শরীফ নামেই বেশি পরিচিত। আজ শনিবার বিকেলে লালদীঘি মাঠে অনুষ্ঠিত জমজমাট ফাইনালে তিনি হারিয়েছেন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মো. রাশেদকে (রাশেদ বলী)। টান টান উত্তেজনায় ভরা এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কৌশল ও ধৈর্যের লড়াইয়ে এগিয়ে ছিলেন শরীফই।

দর্শকদের উৎসবমুখর উপস্থিতি

দুপুর গড়াতেই লালদীঘি ঘিরে মানুষের ঢল নামতে শুরু করে। বৈশাখের তপ্ত রোদ মাথায় নিয়েও কেউ সরে যাননি। কেউ গামছা বেঁধে, কেউ ছাতা হাতে, আবার কেউ গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেছেন খেলা শুরুর। সময় যত গড়িয়েছে, ততই ভিড় ছড়িয়ে পড়েছে কয়েক কিলোমিটারজুড়ে। মাঠের ভেতর-বাইরে সবখানেই এক উৎসবমুখর আবহ।

প্রতিযোগিতার বিবরণ

বেলা তিনটার দিকে বাঁশির শব্দে শুরু হয় বলীখেলা। ঢোলের তালে তালে একে একে বলীরা রিংয়ে উঠতেই গর্জে ওঠে চারপাশ। এ বছর প্রতিযোগিতায় অংশ নেন ১০৮ জন বলী। বয়সে তরুণ থেকে প্রবীণ—সবাই মিশে গিয়েছিলেন এক মঞ্চে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রথম পর্ব পেরিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠেন আটজন। লটারির মাধ্যমে প্রতিপক্ষ নির্ধারণের পর শুরু হয় আরও কঠিন লড়াই। সেখান থেকে চারজন জায়গা করে নেন সেমিফাইনালে।

সেমিফাইনাল ও ফাইনাল

প্রথম সেমিফাইনালে মিঠু বলীকে মাত্র দেড় মিনিটে হারিয়ে ফাইনালে ওঠেন রাশেদ বলী। অন্য সেমিফাইনালে সাবেক চ্যাম্পিয়ন শাহজালাল বলীকে হারিয়ে ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেন বাঘা শরীফ। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী লড়াইয়ে দীর্ঘ ১৭ মিনিটের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শেষে জয় পান মিঠু বলী।

ফাইনালে আবারও মুখোমুখি হন গতবারের চ্যাম্পিয়ন বাঘা শরীফ ও রানারআপ রাশেদ বলী। শুরু থেকেই লড়াই ছিল সমানে সমান। কখনো শরীফ এগিয়ে যাচ্ছেন, আবার রাশেদ দ্রুত সামলে নিচ্ছেন। হাতের গ্রিপ, শরীরের ভারসাম্য—সবকিছু মিলিয়ে চলছিল টান টান লড়াই। দর্শকেরা নিশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে ছিলেন রিংয়ের দিকে। চারপাশে তখন শুধু চিৎকার আর ঢোলের শব্দ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিজয়ী নির্ধারণ

২৫ মিনিট চলে খেলা। খেলার শেষ দিকে এসে মোড় ঘুরে যায়। হঠাৎ কৌশল বদলে সামনে এগিয়ে যান শরীফ। রাশেদকে ভারসাম্য হারাতে বাধ্য করেন। সেই সুযোগে শক্ত এক চাল দিয়ে তাঁকে মাটিতে ফেলে দেন। রেফারির বাঁশি বাজতেই বিজয়ীর নাম ঘোষণা—‘বাঘা’ শরীফ।

ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই লালদীঘি মাঠ ভরে ওঠে হাততালি আর উল্লাসে। কেউ চিৎকার করে ওঠেন, কেউ হাত তুলে অভিনন্দন জানান। টানা তৃতীয়বার শিরোপা জিতে নিজের দাপট আরও দৃঢ় করলেন শরীফ। এর আগে খেলার উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম নগর পুলিশের কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী।

শত বছরের ঐতিহ্য

১৯০৯ সালে বদরপাতির ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগরের উদ্যোগে এই বলীখেলার সূচনা হয়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় তরুণদের শক্তি ও সাহস জাগিয়ে তুলতেই শুরু হয়েছিল এই আয়োজন। ধীরে ধীরে তা চট্টগ্রামের মানুষের অন্যতম বড় উৎসবে পরিণত হয়।

প্রতিবছর ১২ বৈশাখ লালদীঘি মাঠে বসে এই বলীখেলা। একে ঘিরে কয়েক কিলোমিটারজুড়ে জমে ওঠে বৈশাখী মেলা। কেনাবেচা, আড্ডা আর মানুষের ভিড়ে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

শত বছরের বেশি সময় পেরিয়েও এই বলীখেলা এখনো চট্টগ্রামের মানুষের আবেগের জায়গা দখল করে আছে। আর সেই মাটিতেই আবারও নিজের আধিপত্যের ছাপ রেখে গেলেন বাঘা শরীফ।