ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি। ফাইল ছবি: এএফপি
টিকিটের দাম আকাশছোঁয়া
২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে টিকিটের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। ফিফার অফিশিয়াল রিসেল (পুনর্বিক্রয়) সাইটে ফাইনালের চারটি টিকিট বিক্রির জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, যার প্রতিটির দাম ধরা হয়েছে প্রায় ২৩ লাখ ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৮ কোটি ২১ লাখ টাকা)।
আগামী ১১ জুন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় শুরু হবে বিশ্বকাপ। ফাইনাল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে ১৯ জুলাই নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। সেখানকার গ্যালারির নিচতলার ১২৪ নম্বর ব্লকের ৪৫ নম্বর সারিতে গোলপোস্টের পেছনের ৩৩ থেকে ৩৬ নম্বর আসনগুলোর প্রতিটির দাম হাঁকা হয়েছে ২২ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯৮ ডলার।
ফিফার ভূমিকা ও কমিশন
ফিফা তাদের এই রিসেল বা বিনিময় প্ল্যাটফর্মে টিকিটের দাম নিয়ন্ত্রণ করে না, অর্থাৎ বিক্রেতা ইচ্ছেমতো দাম হাঁকাতে পারেন। তবে প্রতিটি লেনদেন থেকে বড় অঙ্কের লভ্যাংশ পায় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। টিকিট বিক্রির ক্ষেত্রে ক্রেতার কাছ থেকে ১৫ শতাংশ এবং বিক্রেতার কাছ থেকে ১৫ শতাংশ কমিশন নিয়ে থাকে ফিফা। সে হিসাবে, এ চারটি টিকিট যদি নির্ধারিত দামে বিক্রি হয়, তবে শুধু কমিশন বাবদই ফিফার পকেটে যাবে প্রায় ২৬ লাখ ৯৯ হাজার ডলার বা ৩৩ কোটি টাকার বেশি।
টিকিটের বাজারে অস্থিরতা
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ জানিয়েছে, ফাইনাল ম্যাচ ঘিরে টিকিটের বাজারে অস্থিরতা গত শুক্রবার সকালেও দেখা গেছে। এদিন গ্যালারির অন্যান্য আসনের টিকিটও বিক্রি হয়েছে কয়েক লাখ পাউন্ডে। এমনকি সবচেয়ে কম দামি টিকিটের জন্য গুনতে হচ্ছে ১০ হাজার ৯২৩ মার্কিন ডলার বা প্রায় ১৩ লাখ টাকা।
বিশ্বকাপে টিকিটের দাম চড়া, বিতর্ক
ফিফার দাবি, বিশ্বকাপ থেকে আসা আয় তারা ফুটবলের উন্নয়নের জন্য ২১১টি সদস্যদেশের পেছনে ব্যয় করে। গত বুধবার নিজেদের ওয়েবসাইটে সরাসরি বিক্রির জন্য নতুন ব্লকের কিছু টিকিট ছেড়েছে ফিফা, যেখানে ফাইনাল ম্যাচে টিকিটের দাম ধরা হয়েছে ১০ হাজার ৯৯০ ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৩ লাখ ৪৮ হাজার টাকা)।
এ ছাড়া আগামী ১৪ জুলাই টেক্সাসের আর্লিংটনে সেমিফাইনালের টিকিট ১১ হাজার ১৩০ ডলারে এবং ১৫ জুলাই আটলান্টার সেমিফাইনাল ম্যাচের টিকিট ৯ হাজার ৬৬০ ও ৪ হাজার ৩৬০ ডলারে বিক্রি করছে ফিফা।
পেপ গার্দিওলার প্রতিক্রিয়া
বিশ্বকাপ দেখার এই অস্বাভাবিক খরচ নিয়ে গত শুক্রবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ম্যানচেস্টার সিটি কোচ পেপ গার্দিওলা, ‘আমার মনে আছে, কয়েক বছর আগেও বিশ্বকাপ মানেই ছিল ফুটবল নিয়ে এক আনন্দ উৎসব। নিজের দেশকে সমর্থন দিতে সারা বিশ্ব থেকে সাধারণ মানুষ সেখানে যেত এবং সেটা তাদের নাগালের মধ্যেই ছিল। কিন্তু আধুনিক যুগে এটি ভীষণ ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে।’
গার্দিওলা আরও বলেন, ‘আমি যেহেতু সেখানে (ফিফায়) নেই, তাই সঠিক কারণ আমার জানা নেই। তবে আশা করব, তারা বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাববে। ফুটবল মূলত দর্শকদের জন্যই। অবশ্যই স্পনসর বা অন্যান্য বাণিজ্যিক দিকের কথা ভাবতে হবে, নয়তো এটি টিকিয়ে রাখা যাবে না, সবাই সেটা জানে। কিন্তু এই ব্যবসা সচল রাখার মূল চাবিকাঠি হলো সাধারণ ফুটবলপ্রেমীরা।’
টেলিগ্রাফের অনুসন্ধান
টেলিগ্রাফের মতে, ফাইনালে টিকিটের আকাশচুম্বী দাম মূলত ২০২৬ বিশ্বকাপ ঘিরে চলমান বিশাল এক ‘লুটতরাজ’–এর খণ্ডচিত্র। ফুটবলপ্রেমীদের পকেট কাটার এ মহোৎসবে আরও কী কী ঘটছে, সেসব নিয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধানে নেমেছে ‘টেলিগ্রাফ স্পোর্টস’।
ইনফান্তিনোর সংকট
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। ফাইল ছবি: এএফপি
বড় সংকটে ইনফান্তিনো। ফিফার প্রেসিডেন্ট হিসেবে সম্ভবত এটাই সবচেয়ে সংকট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর জন্য। বিশ্বকাপে টিকিটের দাম ৮ হাজার ৬৮০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার খবর প্রকাশের পর জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
টিকিটের এমন অস্বাভাবিক মূল্য নিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছে বিভিন্ন ফুটবল–সমর্থক গোষ্ঠী। ব্যাপারটা আরও গুরুতর হয়ে ওঠার আগেই বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে ফিফা। তারা ঘোষণা করে, জাতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলোর মাধ্যমে অতি সীমিতসংখ্যক টিকিট মাত্র ৬০ ডলারে বণ্টন করা হবে, যা কেবল দলগুলোর সবচেয়ে অনুগত বা নিয়মিত সমর্থকেরাই পাবেন।
ডায়নামিক প্রাইসিং ও কালোবাজারি
টিকিটের এই মাত্রাতিরিক্ত দামের পেছনে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে ফিফার ‘ডায়নামিক প্রাইসিং’ বা পরিবর্তনশীল মূল্যপদ্ধতিকে। মূলত এই পদ্ধতির কারণেই চলতি মাসে ফাইনাল ম্যাচের সবচেয়ে দামি টিকিটগুলোর মূল্য আকাশচুম্বী হয়ে পড়েছে।
ফিফার অনুমোদনেই টিকিটের কালোবাজারি। নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে বিশ্বকাপের টিকিট বিক্রির সুযোগ করে দিয়ে নতুন এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে ফিফা। মূলত সংস্থাটির এ সিদ্ধান্তের কারণেই তাদের নিজস্ব ‘রিসেল’ বা পুনর্বিক্রয় সাইটে বিশ্বকাপ ফাইনালের মাত্র চারটি টিকিটের দাম (একেকটি ২৩ লাখ ডলার) এত বেড়েছে।
বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে ফিফার কমিশন–বাণিজ্য। তবে নিজস্ব টিকিটের উচ্চ মূল্য, ডায়নামিক প্রাইসিং এবং এই পুনর্বিক্রয় পদ্ধতি নিয়ে ফিফার আত্মপক্ষ সমর্থনও বেশ জোরালো। তাদের দাবি, এখান থেকে অর্জিত নিট মুনাফা বিশ্বব্যাপী ফুটবলের উন্নয়নেই পুনর্নিয়োগ করা হবে।
হোটেল ও পরিবহন খরচ
২০২৬ বিশ্বকাপে মেক্সিকো সিটিতে আয়োজিত হবে উদ্ধোধনী ম্যাচ। ফাইল ছবি: রয়টার্স
হোটেল ভাড়া বেড়েছে চার গুণ। বিশ্বকাপের সময়সূচি চূড়ান্ত হওয়ার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর হোটেলগুলোতে কক্ষভাড়া কয়েক শ ডলার বেড়েছে। দেখা গেছে, আয়োজক ১৬টি শহরে উদ্বোধনী ম্যাচগুলোর দিন আবাসন খরচ গড়ে চার গুণ বেড়েছে। মেক্সিকো-দক্ষিণ আফ্রিকা উদ্বোধনী ম্যাচের সময় একটি হোটেলের কক্ষভাড়া যেখানে গত মে মাসের শেষে ছিল মাত্র ১৫৭ ডলার, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৮৮২ ডলারে (প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা)।
ট্রেনভাড়া ১৩ ডলার থেকে বেড়ে ১৫০ ডলার। পেন স্টেশন থেকে মেটলাইফ স্টেডিয়াম—উড়োজাহাজে নয়, মাত্র ৩০ মিনিটের এই ট্রেনভ্রমণের টিকিটের দাম হাঁকা হচ্ছে ১৫০ ডলারের বেশি। যেখানে যাতায়াতের স্বাভাবিক খরচ ১২ ডলার ৯০ সেন্ট, সেখানে বিশ্বকাপের সময় তা প্রায় ১২ গুণ বাড়িয়ে দেওয়ায় খোদ ফিফাই নিউ জার্সি ট্রানজিটের বিরুদ্ধে ‘লুটতরাজের’ অভিযোগ তুলেছে। যদিও ফিফার এমন অবস্থানকে ‘স্পর্ধা’ হিসেবেই দেখছেন অনেকে।
নিউ জার্সির গভর্নর মাইকি শেরিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘আমরা এমন এক চুক্তি পেয়েছি, যেখানে ফিফা বিশ্বকাপের পরিবহন খাতে এক পয়সাও দিচ্ছে না। সমর্থকদের নিরাপদে আনা-নেওয়ার জন্য নিউ জার্সি ট্রানজিটকে ৪ কোটি ৮০ লাখ ডলারের বিশাল বিল মেটাতে হচ্ছে, সেখানে ফিফা আয় করছে ১১০০ কোটি ডলার। আমাদের সাধারণ যাত্রীদের ওপর আমি এই ঋণের বোঝা চাপিয়ে দিতে পারি না। ফিফার উচিত যাতায়াত খরচ বহন করা।’
পরিবহন খরচের এই ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে অন্য শহরগুলোতেও। বোস্টনের উপকণ্ঠে জিলেট স্টেডিয়ামে ম্যাচ চলাকালে ট্রেনের টিকিটের দাম পড়বে ৮০ ডলার এবং কোচের টিকিটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৯৫ ডলার।
স্টেডিয়ামে পার্কিং ও ফ্যান জোন
নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়াম। বিশ্বকাপের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে এ স্টেডিয়ামে। ফাইল ছবি: রয়টার্স
স্টেডিয়ামে পার্কিং খরচ ২২৫ ডলার। যাঁরা ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে খেলা দেখতে যাওয়ার কথা ভাবছেন, তাঁদের পকেটও ভালোই কাটা পড়বে। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে একটি গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য গুনতে হবে ২২৫ ডলার (প্রায় ২৭ হাজার টাকা)। পিছিয়ে নেই বোস্টনের জিলেট স্টেডিয়ামও, সেখানে একটি গাড়ির পার্কিং খরচ ধরা হয়েছে ১৭৫ ডলার।
ফ্যান জোনে ঢুকতেও খরচ করতে হবে। টিকিটের অস্বাভাবিক দাম ও যাতায়াত খরচের পর যুক্ত হয়েছে ফ্যান জোনে প্রবেশমূল্য। সাধারণত বিশ্বকাপের ফ্যান জোনগুলো উন্মুক্ত থাকলেও এবার নিউ জার্সিতে তা হচ্ছে না। গত ডিসেম্বরেই এ নিয়ে শুরু হয় নতুন বিতর্ক। জানা গেছে, সেখানকার ফ্যান জোনে ঢুকতে সাধারণ মানুষকে টিকিট কাটতে হবে। টিকিটমাস্টার ওয়েবসাইটে এ টিকিটের দাম ধরা হয়েছে ১২ ডলার ৫০ সেন্ট।



