বিশ্বকাপ ফুটবলের মহাসমুদ্রে আবারও আবেগের জোয়ার আসছে। চার বছর পর পৃথিবী থমকে দাঁড়ায় এই মহারণের অপেক্ষায়। আগামীকাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মাটিতে শুরু হচ্ছে ফুটবলের সবচেয়ে বড় উৎসব ‘দ্যা গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’।
এমবাপ্পের সামনে ইতিহাসের ডাক
বিশ্বকাপ আলোচনায় ফ্রান্সের নাম এলেই কেন্দ্রে চলে আসেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। ইতিহাসকে নতুন করে লেখার পথে হাঁটছেন তিনি। দল ঘোষণার পর থেকেই ফুটবল সমর্থকদের মনে একটাই প্রশ্ন—তারকায় ঠাঁসা ফ্রান্স কি আবারও ফাইনালে উঠবে? আর উঠলে কি দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে জয়ের হাসি ফুটবে এমবাপ্পের মুখে?
ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশম দীপ্ত কণ্ঠে জানিয়েছেন, ‘এমবাপ্পেকে নিয়ে আমি চিন্তিত নই। সে বলেছে, বিশ্বকাপের জন্য সেরাটা জমিয়ে রেখেছে।’ দেশমের গল্পটাও রূপকথার মতো। ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন অধিনায়ক হিসেবে। ২০১৮ সালে একই ট্রফি জিতেছেন কোচ হয়ে। খেলোয়াড় ও কোচ—দুই ভূমিকাতেই বিশ্বকাপ জেতা মানুষের সংখ্যা পৃথিবীতে মাত্র তিনজন। সেই বিরল তালিকায় দেশমের নাম উজ্জ্বল। এবার তিনি চাইবেন বিদায়ের আগে আরও একবার সোনালি ট্রফি ছুঁয়ে দেখতে।
ফ্রান্সের শক্তিশালী স্কোয়াড
গোলপোস্টে আছেন মাইক মেনিয়া। রক্ষণভাগে সালিবা, কোনাতে, কুন্দে, থিও হার্নান্দেজের মতো নির্ভরতার নাম। মাঝমাঠে এখনও লড়াইয়ের প্রতীক এনগোলো কানতে। বয়স ৩৫ ছুঁয়েছে, কিন্তু মাঠে তার দৌড় যেন সময়কে ছাপিয়ে যায়। আক্রমণভাগ? সেটি যেন প্রতিপক্ষের জন্য দুঃস্বপ্ন। ওসমান ডেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে, ব্র্যাডলি বারকোলা, মার্কাস থুরাম, দেজিরে দুয়ে—তারকায় ভরা এক আক্রমণভাগ। তবে এই নক্ষত্রমালার সবচেয়ে উজ্জ্বল আলো নিঃসন্দেহে কিলিয়ান এমবাপ্পে।
এমবাপ্পের বিশ্বকাপ কীর্তি
২০১৮ সালে বিস্ময়বালক হয়ে মুগ্ধ করেছিলেন বিশ্বকে। ২০২২ সালে যেন একাই ফ্রান্সকে ট্রফির খুব কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। ফাইনালে হ্যাটট্রিক করেছিলেন, কিন্তু ভাগ্য সেদিন আর্জেন্টিনার পক্ষে ছিল। তবুও সেই টুর্নামেন্ট শেষে এমবাপ্পের নাম আরও বড় হয়ে উঠেছিল। দুই বিশ্বকাপ মিলিয়ে তার গোলসংখ্যা এখন ১২টি। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় তিনি ইতোমধ্যে কিংবদন্তিদের পাশে জায়গা করে নিয়েছেন। বয়স মাত্র ২৭। সামনে আরও কত ইতিহাস অপেক্ষা করছে, তা হয়তো তিনি নিজেও জানেন না।
রেকর্ডের পথে এগিয়ে যাওয়া
ফ্রান্সের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা অলিভিয়ের জিরুর চেয়ে তিনি মাত্র এক গোল পিছিয়ে। বিশ্বকাপের সর্বকালের গোলরেকর্ডও তার নাগালের মধ্যেই। তবে এমবাপ্পের সামনে এবার শুধু গোলের রেকর্ড নয়, আরও বড় একটি লক্ষ্য রয়েছে। টানা তৃতীয় বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন। ২০১৮ সালে শিরোপা, ২০২২ সালে রানার্সআপ। এবার যদি আবারও ফাইনালে ওঠে ফ্রান্স, তাহলে সেটা হবে বিরল এক কীর্তি। আর ট্রফি জিতলে এমবাপ্পে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবেন ফুটবলের অমরত্বের পথে।
অবশ্য পথটা সহজ নয়। বিশ্বকাপে ফেভারিটের তালিকায় আছে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, স্পেন, ইংল্যান্ড, পর্তুগালের মতো শিরোপা প্রত্যাশীরা। কিন্তু একটি সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই। তারকা-মহাতারকাদের পদচারণায় বিশ্বকাপের রাতগুলো যখন জ্বলে উঠবে, তখন আবারও দেখা যাবে নীল জার্সি গায়ে এক তরুণ দৌড়ে যাচ্ছেন প্রতিপক্ষের গোলপোস্টের দিকে। পায়ে তার গতির ঝড়, চোখে অমরত্বের স্বপ্ন।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কিলিয়ান এমবাপ্পে কি এবারের বিশ্বকাপে সেই অমরত্বের পথেই হাঁটবেন? উত্তরটা লুকিয়ে আছে দেড় মাসের এই ফুটবল মহাকাব্যে।



