কোনো কারণ ছাড়াই ৫ ফিলিস্তিনি নারীকে আটক করল ইসরাইল
কোনো কারণ ছাড়াই ৫ ফিলিস্তিনি নারীকে আটক করল ইসরাইল

পশ্চিম তীরে দুই নারী ফুটবলার ও তিন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীসহ পাঁচ ফিলিস্তিনি নারীকে গ্রেপ্তার করেছে ইসরাইলি বাহিনী। পরিবারগুলোর অভিযোগ, কোনো স্পষ্ট কারণ না জানিয়েই তাদের আটক করা হয়েছে। ফিলিস্তিনি সংগঠনগুলো বলছে, এটি ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চলমান ‘প্রতিশোধমূলক অভিযানের’ অংশ।

সামা সাফির গ্রেপ্তার

মঙ্গলবার ভোরে পশ্চিম তীরের বিরজেইত শহরে নিজ বাসা থেকে আটক হন ২০ বছর বয়সী মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সামা সাফি। তিনি বিরজেইত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। সামার বাবা আহমেদ সাফি বলেন, ‘আমরা বিস্মিত হয়েছি, এমনকি হতবাক হয়েছি। আমরা কখনো ভাবিনি যে তাকে গ্রেপ্তার করতেই অভিযান চালানো হয়েছে।’

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গভীর রাতে ইসরাইলি সেনারা ভবনে প্রবেশ করে। তারা পরিবারের সদস্যদের পরিচয়পত্র দেখতে চায়। এরপর সামাকে জানানো হয়, তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। আহমেদ সাফি বলেন, ‘আমরা যখন জানতে চাইলাম কেন তাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, তখন কর্মকর্তা ও সেনারা শুধু বলেছে, “আদালতে জানতে পারবেন।”’

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পরিবার জানায়, সেনারা সামার কক্ষ তল্লাশি চালায়। তার মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ এবং ব্যক্তিগত কিছু জিনিসপত্র নিয়ে যায়। এছাড়া ২০২৪ সালে ইসরাইলি বাহিনীর হাতে নিহত তার চাচাতো ভাই আইসার সাফির ছবিও জব্দ করা হয়। পরে সামাকে হাতকড়া পরিয়ে, চোখ বেঁধে একটি সামরিক গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়।

স্বাস্থ্যগত উদ্বেগ

সামার পরিবার তার স্বাস্থ্য নিয়ে গভীর উদ্বেগে রয়েছে। তিনি ফ্যামিলিয়াল মেডিটেরেনিয়ান ফিভার (এফএমএফ) নামের একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহজনিত রোগে ভুগছেন। এ রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত ওষুধ প্রয়োজন। আহমেদ সাফি বলেন, ‘আমরা তার স্বাস্থ্য নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন। ওষুধ না পেলে তার উচ্চ জ্বর, শরীরব্যথা এবং অন্যান্য জটিল উপসর্গ দেখা দেয়। রোগটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে আক্রমণ করে। চিকিৎসা বন্ধ হলে লিভার ও কিডনির মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পরিবার জানতে পেরেছে, বর্তমানে সামাকে জেরুজালেমের আল-মাসকুবিয়া জিজ্ঞাসাবাদ কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। আগামী মঙ্গলবার তার প্রথম আদালত শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। তবে এখনো তার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছে, তা জানা যায়নি।

ফুটবলার ও অন্যান্য আটক

এদিকে আটক হওয়া অন্যদের মধ্যে রয়েছেন ফিলিস্তিন নারী জাতীয় ফুটবল দলের দুই সদস্য নাতালি আবু দিয়া ও র‍্যান্ড হালাওয়ানি। এছাড়া বিরজেইত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জুলান আবু আওয়াদ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী লায়লা নায়েল খলিলকেও আটক করা হয়েছে।

গণমাধ্যম বিভাগের শিক্ষার্থী নাতালি আবু দিয়াকে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল থেকে আটক করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, রাতের অভিযানে ইসরাইলি সেনারা বলপ্রয়োগ করেছে। নাতালির বাবা সামের আবু দিয়া বলেন, ‘রাত প্রায় সাড়ে ১০টা পর্যন্ত আমাদের তার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল। সে জানিয়েছিল, তার ১৩টি অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করতে হবে এবং সে রাত জেগে কাজ করবে। ভোর সাড়ে ৩টায় তার রুমমেটরা ফোন করে জানায়, সেনাবাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করেছে।’

পরবর্তীতে নাতালিকে ওফার কারাগারে নেওয়া হয়। সেখানে তিনি তার আইনজীবীর সঙ্গে দেখা করেছেন। তবে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনা হয়েছে কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

মেয়েকে নিয়ে সামের আবু দিয়া বলেন, ‘নাতালি আমার সবচেয়ে ছোট মেয়ে। সে স্বাধীনচেতা, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং অসাধারণ মেধাবী। এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করার ক্ষমতা তার আছে বলে আমি চিন্তিত নই। কিন্তু সে যে অন্যায়ের শিকার হচ্ছে, তা আমাকে গভীরভাবে কষ্ট দিচ্ছে।’

অন্যদিকে ফিলিস্তিন নারী জাতীয় ফুটবল দলের আরেক সদস্য র‍্যান্ড হালাওয়ানিকে জেরুজালেমে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকার পর গ্রেপ্তার করা হয়। তার আটকাদেশ শুক্রবার পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের নিন্দা

এই গ্রেপ্তারের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। এক বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, ‘তাদের গ্রেপ্তার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি ফিলিস্তিনি ক্রীড়াবিদদের পরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু বানানোর দীর্ঘদিনের ধারাবাহিকতার অংশ, যা এখনো জবাবদিহির বাইরে রয়েছে।’

সংস্থাটি আরও বলেছে, ‘ফিফা, মহাদেশীয় ফুটবল সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সম্প্রদায়ের প্রতি আমাদের আহ্বান, তারা যেন শুধু বিবৃতি দিয়ে থেমে না থাকে। চলমান এই লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ফুটবলের কাঠামোর মধ্যে বাস্তব ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়।’

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘ফিলিস্তিনি ক্রীড়াবিদদের লক্ষ্যবস্তু বানানো বন্ধ করতে হবে। দায়মুক্তির সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। দ্বৈত মানদণ্ডের অবসান ঘটাতে হবে।’

জুলান আবু আওয়াদের গ্রেপ্তার

এদিকে জুলান আবু আওয়াদকেও ভোরের অভিযানে নিজ বাড়ি থেকে আটক করা হয়েছে। তার বোন জেনিন আবু আওয়াদ বলেন, ‘আমরা জানতে চেয়েছিলাম কেন তাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। তারা বলেছে, আদালতে জানতে পারব এবং তাকে দীর্ঘ সময় আটক রাখা হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তারা তার কক্ষের সবকিছু তছনছ করে ফেলেছে।’

জুলানের পরিবার জানিয়েছে, তিনি তীব্র মাইগ্রেন সমস্যায় ভোগেন এবং নিয়মিত চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। তার বোন বলেন, ‘তার শক্তিশালী ব্যথানাশক ও একটি বিশেষ ইনজেকশন প্রয়োজন হয়। মাইগ্রেন শুরু হলে সে বমি করে, আলো সহ্য করতে পারে না এবং সম্পূর্ণ নীরবতা দরকার হয়। আমরা তার স্বাস্থ্য নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন।’

ফিলিস্তিনি বন্দিদের অবস্থা

ফিলিস্তিনি বন্দি অধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৯ হাজার ফিলিস্তিনি ইসরাইলি কারাগারে বন্দি রয়েছেন। তাদের প্রায় অর্ধেকই কোনো অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই আটক।

ফিলিস্তিনি প্রিজনার্স ক্লাবের প্রধান আবদুল্লাহ জাঘারি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে নারী ও ছাত্রীদের গ্রেপ্তারের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মত প্রকাশ বা ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানানোর অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে ‘উসকানি’ দেওয়ার অভিযোগ আনা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও ছাত্রীদের গ্রেপ্তারের সংখ্যা এই অজুহাতে বেড়েছে। অথচ এর কোনো আইনগত ভিত্তি নেই।’ আরও বলেন, ‘এই গ্রেপ্তারগুলো ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে দখলদার কর্তৃপক্ষের চলমান প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ডের অংশ।’

প্রিজনার্স ক্লাবের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইসরাইলি কারাগারে ৮৯ জন ফিলিস্তিনি নারী বন্দি রয়েছেন। তাদের মধ্যে তিনজন শিশু, তিনজন গর্ভবতী নারী এবং দুজন ক্যানসার রোগী। অধিকাংশকে ডেমন কারাগারে রাখা হয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, অন্তত ১৯ জন নারীকে প্রশাসনিক আটকাদেশের আওতায় রাখা হয়েছে। এই ব্যবস্থায় কোনো অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য বারবার আটকাদেশ নবায়ন করা যায়।