পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ডেকোরেটেড ফুটবলার হলেন লিওনেল মেসি। আর্জেন্টিনার হয়ে জিতেছেন ফিফা বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা, অলিম্পিক গোল্ড মেডেল; বার্সেলোনার হয়ে জিতেছেন উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ, লা লিগা, কোপা দেল রেসহ অসংখ্য শিরোপা; পিএসজি ও ইন্টার মায়ামির হয়ে একাধিক লিগ শিরোপা—সব মিলিয়ে তাঁর ট্রফি ক্যাবিনেটে রয়েছে ৪৬টি দলীয় শিরোপা, যা ইতিহাসে সর্বাধিক। এ ছাড়া রেকর্ড সর্বাধিক ৮টি ব্যালন ডি’অরসহ ফুটবলের ব্যক্তিগত সব পুরস্কার জয় করেছেন তিনি।
এই মাসেই ৩৯ বছরে পদার্পণ করবেন আর্জেন্টাইন জাদুকর। এ বয়সে সাধারণত বেশির ভাগ ফুটবলার অবসর নিয়ে ফেলেন। তবে মেসি এখনো খেলে যাচ্ছেন এবং খেলবেন রেকর্ড ষষ্ঠবারের মতো ফিফা বিশ্বকাপ। তাঁকে অধিনায়ক করেই গত সপ্তাহে আলবিসেলেস্তেদের স্কোয়াড ঘোষণা করেছেন কোচ লিওনেল স্কালোনি। যদিও পুরোপুরি ফিট নন এলএমটেন। ইন্টার মায়ামি জানিয়েছে, মেসির বাঁ হ্যামস্ট্রিং পেশিতে অতিরিক্ত চাপ ও ক্লান্তি অনুভূত হয়েছে। দুই দশক ধরে টানা খেলে যাওয়ার ফলেই এই চোট। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, যে বয়সে ফুটবলাররা পেশাদার ক্যারিয়ার থেকে অবসর নিয়ে ফেলেন, সেই বয়সে মেসি এখনো কেন খেলে যাচ্ছেন? এমন তো নয় যে তাঁকে কোনো কিছু প্রমাণ করতে হবে বা অর্জন করার এখনো অনেক কিছু বাকি! ফুটবলের সম্ভাব্য সবকিছুই অর্জন করেছেন তিনি। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ জয়ের মধ্য দিয়ে সর্বকালের সেরা ফুটবলারের বিতর্কের অবসানও ঘটিয়েছেন।
নেতৃত্বের অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি ও ‘সর্বকালের সেরা’ বিতর্কের অবসান
একটা সময় ছিল, যখন লিওনেল মেসির নেতৃত্ব নিয়ে চারদিকে সমালোচনা হতো। এমনকি আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি ডিয়োগো ম্যারাডোনা পর্যন্ত তাঁর সমালোচনা করেছিলেন। সেই সময় এখন আর নেই, সবই অতীত। দিন বদলেছে, সেই সঙ্গে বদলেছেন মেসি। তাঁর নেতৃত্বে মাত্র চার বছরের ব্যবধানে কোপা আমেরিকা, লা ফিনালিসিমা, ফিফা বিশ্বকাপ এবং দ্বিতীয়বার কোপা আমেরিকা জয় করেছে আর্জেন্টিনা। একসময় যাঁকে শান্ত স্বভাবের বলা হতো, সেই তিনি এখন সতীর্থদের আগলে রাখতে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের সঙ্গে ঝগড়া করতেও পিছপা হন না! কাতার বিশ্বকাপের সময় যার ঝলক দেখেছে পুরো বিশ্ব।
নেতৃত্ব দিচ্ছেন মাঠের খেলায়ও। কাতার বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের বিপক্ষে পরাজয়ের পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিল আকাশি–নীল জার্সিধারীরা। এরপরই পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে মেসির অনন্য প্রদর্শনী দেখতে পায় ফুটবল বিশ্ব। বিশ্বকাপের ইতিহাসের একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে গ্রুপ পর্ব, দ্বিতীয় রাউন্ড, কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল ও ফাইনালে গোল করার অনন্য কীর্তি অর্জন করেন। আট ম্যাচ খেলে পাঁচটিতেই ম্যাচসেরা হন। আর ফাইনালে ফ্রান্সকে হারিয়ে তুলে ধরেন জীবনের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত সোনালি ট্রফি। বিশ্বকাপ জয়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় টিওয়াইসি স্পোর্টসকে লিওনেল মেসি বলেছিলেন, ‘আমি খুবই ভাগ্যবান যে ক্যারিয়ারে সবকিছু অর্জন করতে পেরেছি…আর এই ট্রফি (বিশ্বকাপ) সেখানে মিসিং ছিল। এটা অর্জনের মধ্য দিয়ে ক্যারিয়ার শেষ করতে চেয়েছিলাম। এর বেশি কিছু চাওয়ার নেই, সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ, তিনি আমাকে সবকিছু দিয়েছেন।’
সবাই ভেবেছিলেন, এরপরই মেসি অবসর নেবেন। তবে সেই শঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ফুটবলার বলেছিলেন, ‘আমি যেটা করি (ফুটবল খেলা), সেটা ভালোবাসি। জাতীয় দলের সঙ্গে থাকাটা আমি পছন্দ করি এবং বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হিসেবে আরও কিছুদিন খেলে যেতে চাই।’ কিন্তু দেখা গেল, আরও কিছু ম্যাচ খেলার পরও অবসরের ঘোষণা দেননি মেসি; বরং এটা স্পষ্ট যে আর্জেন্টাইন প্লে–মেকার দলের হয়ে আরও ট্রফি জিততে চান এবং খেলে যাওয়াটা তিনি এখনো উপভোগ করছেন।
স্কালোনি ফ্যাক্টর
জাতীয় দলের হয়ে অভিষেকের পর থেকেই মেসিকে দেশটির ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ফুটবলার ম্যারাডোনার সঙ্গে তুলনা করা হয়ে আসছে। ম্যারাডোনার নেতৃত্বে ১৯৮৬ সালে সর্বশেষ বিশ্বকাপ জিতেছিল আর্জেন্টিনা। আবারও সেই ট্রফি জয়ের বিপুল প্রত্যাশার চাপ পড়ে মেসির কাঁধে। ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে সেই চাপটাও তিনি কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলতে সক্ষম হন। অবশ্য এই সাফল্যের সূচনা হয় কোচ হিসেবে লিওনেল স্কালোনি আসার পর থেকে।
স্কালোনি আসার আগে জাতীয় দলের হয়ে কোনো শিরোপাই জিততে পারেননি মেসি। এমনকি সতীর্থদের সঙ্গেও এতটা উজ্জীবিত থাকতেন না। সমালোচকেরা বলতেন, মেসি যতটা ক্লাবের, ততটা দেশের জন্য নন। এ বিষয়ে গত ডিসেম্বরে ইএসপিএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মেসি বলেন, ‘আমার মনে হয়, প্রথম দিন থেকেই সে (স্কালোনি) একটা আইডিয়া প্রতিষ্ঠা করেছে এবং সে সবচেয়ে সেরা যে কাজটা করেছে তা হলো দলের প্রত্যেকের সঙ্গে তার সখ্য। যেভাবে সে খেলোয়াড়দের মূল্যায়ন করে, প্রত্যেকের সঙ্গে যোগাযোগ করে; সে সবাইকে একজন ব্যক্তি হিসেবে সম্মান করে এবং জানে, কার সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হবে। কারণ, সে এই দলটা নিজে গড়ে তুলেছে। আমরা দারুণ একটি দল।’
সতীর্থদের কাছে মেসি
কয়েক বছর ধরে আর্জেন্টিনার যেকোনো ম্যাচের আগে, এমনকি অনুশীলনেও একটা দৃশ্য খুবই কমন দেখা যায়—দলবদ্ধভাবে দল যখন অনুশীলনে যায়, তখন সবার সামনে এবং মধ্যখানে থাকেন মেসি, বাকি সতীর্থরা দুই পাশে এবং পেছনে থাকেন। আবার ম্যাচের দিন মাঠে নামার পূর্বে টানেলে কেউ আগে চলে এলেও মাঠে নামেন না, মেসির জন্য অপেক্ষা করেন। অধিনায়ক আসার পর সবাই তাঁর পেছনে পেছনে মাঠে প্রবেশ করেন। এই দৃশ্য দেখলেই বোঝা যায়, সতীর্থরা তাঁকে কতটা ভালোবাসেন এবং সম্মান করেন।
বিষয়টিকে গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্তিনেজ এভাবে বর্ণনা করেছেন—‘সিংহের দল, যারা মেসির জন্য লড়াই করে’। এখানে সিংহের দল বলতে দলের বাকি সদস্যদের বোঝানো হয়েছে। সর্বশেষ কোপা আমেরিকার সময় আর্জেন্টাইন স্টাইকার জুলিয়ান আলভারেজ বলেছিলেন, ‘এখনো স্কোয়াডে প্রিয় অধিনায়ককে পেয়ে দলের সবাই খুশি। কারণ, সে (মেসি) সবকিছুকে সহজ করে তোলে।’
তবে এখনো শঙ্কা রয়েছে, মেসি ২০২৬ সাল পুরোটা খেলবেন কি না। যদিও এ নিয়ে কোচ স্কালোনি ভাবছেন বলে মনে হয় না। ৩৯ বছর বয়সেও মেসি যেভাবে এখনো গোল করে যাচ্ছেন এবং সতীর্থদের দিয়ে গোল করাচ্ছেন, তা দেখতে পারাটা অন্য রকম আনন্দের। ফুটবলের তাঁর যা কিছু অর্জন করা সম্ভব, সেটা তিনি চার বছর আগেই পেয়ে গেছেন। এবার বিশ্বকাপে যদি আর্জেন্টিনা কিছু না–ও জেতে, তাতেও মেসির হারানোর কিছু নেই। কেবল উপভোগ করে গেলেই হবে। ভক্তরাও তাঁদের প্রিয় তারকাকে মাঠে দেখতে চান।



