জঙ্গল সলিমপুর: সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বারবার হামলার শিকার
জঙ্গল সলিমপুর: সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বারবার হামলার শিকার

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকা দীর্ঘদিন ধরে আতঙ্ক ও ভীতির জনপদ হিসেবে পরিচিত। এখানে প্রবেশপথে সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র পাহারা থাকে এবং প্রবেশ করতে গেলে বিশেষ পরিচয়পত্র দেখাতে হয়। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও ভেতরে যেতে পারেন না। অভিযান চালাতে গিয়ে তারা বারবার হামলার শিকার হয়েছেন। সবশেষ ২৪ মে গভীর রাতে আলীনগর এলাকায় যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে সশস্ত্র সন্ত্রাসী হামলায় অন্তত ৩০০ জন অংশ নেয়, যারা একে-৪৭ রাইফেলের মতো মারাত্মক অস্ত্র ব্যবহার করে। পরিকল্পিতভাবে মো. ইয়াসিন বাহিনী এই হামলা চালায়।

হামলার বিবরণ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিক্রিয়া

হামলার সময় বুলডোজার দিয়ে নির্মাণাধীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যাতায়াত ঠেকাতে সড়কের বেশ কয়েকটি অংশ কেটে দেওয়া হয়। ঘটনার পর র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির সমন্বয়ে যৌথ অভিযান চালানো হলেও ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান কিংবা তার সহযোগীদের গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, অভিযানের আগেই খবর পেয়ে নিরাপদে চলে যায় সন্ত্রাসীরা।

গত ১৯ জানুয়ারি র্যাবের কর্মকর্তা আবদুল মোতালেব নিহত ও আরও তিন সদস্য আহত হওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। এরপর ২৪ মে মধ্যরাতে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা এবং নির্মাণাধীন আরেকটি ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। ৩১ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শন করেন এবং ঘোষণা দেন যে এলাকাটি আর সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হিসেবে থাকবে না এবং রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আস্তানা ও আধিপত্য বিস্তার

চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটির বিপরীতে লিংক রোডের উত্তর পাশে ৩ হাজার ১০০ একর জায়গায় জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় এটি সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আস্তানায় পরিণত হয়েছে। চার দশক ধরে সরকারি পাহাড় কেটে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি এবং প্লট-বাণিজ্য। এই বাণিজ্য ও দখল টিকিয়ে রাখতে এলাকাটিতে সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তোলা হয়েছে। এলাকাটি সার্বক্ষণিক সশস্ত্র পাহারায় থাকে।

জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, এখানে ৩ হাজার ১০০ একর খাসজমি রয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। এক শীর্ষ সন্ত্রাসী ৩০০ জনের একটি বাহিনী গড়ে তুলেছে। প্রথমবারের মতো গত ৯ মার্চ সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির প্রায় ৩ হাজার ২০০ সদস্য যৌথ অভিযান চালিয়ে এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নেন। এর আগে বিভিন্ন সময় চেষ্টা করেও এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব হয়নি এবং উল্টো হামলার শিকার হয়েছেন পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা।

সন্ত্রাসী গ্রুপ ও তাদের রাজনৈতিক পরিচয়

পুলিশ ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুরে দুটি সন্ত্রাসী পক্ষ রয়েছে। একটি পক্ষের নেতৃত্বে মো. ইয়াসিন এবং অপর পক্ষে রোকন উদ্দিন। ইয়াসিনের ৩০০ জনের বাহিনী রয়েছে। রোকন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক (বহিষ্কৃত) এবং ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য। তারও শতাধিক সদস্যের ‘রোকন বাহিনী’ আছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ইয়াসিন সীতাকুণ্ডের সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা এস এম আল মামুনের আশ্রয়ে ছিলেন। এখন তিনি নিজেকে বিএনপির সাবেক যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচয় দেন। রোকন উদ্দিনও আসলাম চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত। তবে আসলাম চৌধুরী গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরে আমার কোনও অনুসারী নেই। ঘটনার সঙ্গে বিএনপির কেউ জড়িতও নন।’

নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ ও হামলার ধারাবাহিকতা

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বহিষ্কৃত যুবদল নেতা রোকন উদ্দিন ও পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ইয়াসিনের বিরোধ চলছিল। এর মধ্যে ইয়াসিনের লোকজন ওই এলাকায় বিএনপির একটি কার্যালয় উদ্বোধনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতে র্যাবের ৪০ জনের একটি দল জঙ্গল সলিমপুরে গেলে হামলার শিকার হন। এ সময় র্যাবের চার সদস্য ও তাদের তথ্যদাতাকে আটকে ফেলে ইয়াসিনের লোকজন এবং তাদের অটোরিকশায় করে তিন কিলোমিটার দুর্গম পাহাড়ের ভেতর নিয়ে গিয়ে মারধর করা হয়। এতে র্যাব কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন।

এরপর ৯ মার্চের যৌথ অভিযানে ২২ জনকে গ্রেফতার করা হলেও ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান মো. ইয়াসিন, রোকন বাহিনীর প্রধান রোকন উদ্দিনসহ তাদের কোনও সহযোগীকে গ্রেফতার করা যায়নি। এলাকাবাসী জানান, জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূল এলাকা রোকনের দখলে আর আলীনগর এলাকা ইয়াসিনের দখলে আছে।

যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা ও নির্মাণাধীন ক্যাম্প ধ্বংস

সর্বশেষ ২৪ মে রাত ১টার দিকে সলিমপুরের আলীনগর এলাকায় যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে সশস্ত্র সন্ত্রাসী হামলায় অন্তত ৩০০ জন অংশ নেয়। হামলায় একে-৪৭ রাইফেল ব্যবহার করা হয়। পরিকল্পিতভাবে ইয়াসিন বাহিনীর সদস্যরা এ হামলা চালায়। পাশের বাড়ির টিনের দেয়াল ও চালে ছোট ছোট ছিদ্র করে ফায়ারিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে থেমে থেমে গোলাগুলির ঘটনায় পুরো এলাকা আতঙ্কে কেঁপে ওঠে। গোলাগুলির মধ্যেই সন্ত্রাসীদের আরেকটি দল পাশের নির্মাণাধীন যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা চালায় এবং বুলডোজার দিয়ে তা গুঁড়িয়ে দেয়। এ ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যাতায়াত ঠেকাতে সড়কের বেশ কয়েকটি অংশ কেটে দেওয়া হয়।

জানা গেছে, নির্মাণাধীন ওই ক্যাম্পের প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছিল এবং ৩১ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে উদ্বোধনের কথা ছিল। হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর বারবার হামলা

গত ২৪ মে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা প্রথম নয়। এর আগেও একাধিকবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে জঙ্গল সলিমপুরে। ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর বড়ইতলা এলাকায় অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শেষে ফেরার পথে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা হামলার শিকার হন, এতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উমর ফারুক, সীতাকুণ্ড থানার ওসি তোফায়েল আহমেদসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। ২০২২ সালেও র্যাব, পুলিশ ও প্রশাসনের ওপর একাধিক হামলার ঘটনা ঘটে। মূলত আধিপত্য ও সাম্রাজ্য বিস্তারের জানান দিতেই এসব হামলা চালানো হয়।

সন্ত্রাসীদের নিজস্ব আইন ও পাহাড় কাটার ব্যবসা

স্থানীয়দের ভাষ্য, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরেই এটি অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ধীরে ধীরে পাহাড় কেটে গড়ে ওঠে অবৈধ বসতি ও প্লট বাণিজ্যের বিশাল নেটওয়ার্ক। জঙ্গল সলিমপুর স্থানীয়দের কাছে ‘দেশের ভেতরে আরেক দেশ’ হিসেবে পরিচিত। এখানে রাষ্ট্রের আইন-কানুনের চেয়েও বেশি কার্যকর সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। ‘চট্টগ্রাম মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদ’ নামের একটি সংগঠন ৩৪টি পাহাড় কেটে প্রায় ৫৮৬ একর সরকারি জমিতে প্রায় ১৪ হাজার প্লট তৈরি করেছে। অন্যদিকে ‘আলীনগর সমবায় সমিতি’ আরও তিনটি পাহাড় কেটে ২৩৬ একর জমিতে আড়াই হাজারের বেশি প্লট তৈরি করেছে। এসব প্লট ৫ থেকে ১০ লাখ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এলাকায় পাহাড় কাটাকে কেন্দ্র করে ‘টোকেন সিস্টেম’ চালু আছে এবং প্রতিদিন নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিয়ে টোকেন কিনে পাহাড় কাটার অনুমতি নেওয়া হয়। ভূমি অফিসের জরিপে অন্তত ৩৭টি পাহাড় কাটার প্রমাণ মিলেছে।

সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সূচনা

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, নব্বইয়ের দশকে দুর্ধর্ষ ভূমিদস্যু আলী আক্কাস প্রথম এই এলাকায় আধিপত্য গড়ে তোলে এবং তার হাত ধরেই পাহাড় কাটা ও অবৈধ দখল শুরু হয়। ২০১০ সালে র্যাবের ক্রসফায়ারে আলী আক্কাস নিহত হওয়ার পর তার অনুসারীরা এলাকা নিয়ন্ত্রণ নেয়। বর্তমানে ইয়াসিন বাহিনী ও রোকন বাহিনীর প্রভাব বেশি। পাশাপাশি মশিউর, ফারুক, গাজী সাদেক, গফুর মেম্বার, রিপন ও আল আমিন সাগরসহ একাধিক ছোট সন্ত্রাসী গ্রুপ রয়েছে, যাদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে মাঝেমধ্যে সংঘর্ষ হয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য

চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুরে যেই সন্ত্রাসী গ্রুপ জড়িত থাকুক না কেন, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। ইয়াসিন ও রোকন বাহিনীসহ সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।’ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর বারবার হামলার কারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এলাকাটিতে পাহাড় কেটে কোটি কোটি টাকার প্লট-বাণিজ্য জড়িত। সেই বাণিজ্য ও আধিপত্য ধরে রাখতেই সন্ত্রাসীরা হামলা চালাচ্ছে। দ্রুত সড়ক নির্মাণ ও যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বড় অংশ নিয়ন্ত্রণে আসবে।’

সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম বলেন, ‘জঙ্গল সলিমপুর এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা ও নির্মাণাধীন ক্যাম্প ভেঙে দেওয়ার ঘটনায় মামলা হয়েছে। ইতিমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং বাকিদের গ্রেফতারে অভিযান চলমান।’

র্যাব-৭ চট্টগ্রামের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান বলেন, ‘ওই দিন রাত ১টার দিকে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে সন্ত্রাসী ইয়াসিন বাহিনীর ২৫০-৩০০ জন সশস্ত্র সদস্য সংঘবদ্ধ হয়ে হামলা চালায়। তাদের হাতে রামদা, দেশীয় অস্ত্র এবং একে-৪৭ রাইফেলের মতো অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। হামলাকারীরা বুলডোজার দিয়ে আলীনগর স্কুলে থাকা যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পের পেছনের দেয়াল ভেঙে দেয় এবং নির্মাণাধীন অস্থায়ী ক্যাম্পটি প্রায় পুরোটাই গুঁড়িয়ে দেয়। সন্ত্রাসীরা গুলি করে আমাদের লোকজনকে ব্যস্ত রাখে এবং সেই সুযোগে ভাঙচুর চালায়। পাহাড়ে থাকা টিনের ঘরের ভেতর থেকে টিন ফুটো করে বন্দুকের নল বের করে গুলি ছুড়েছে। তাদের ধরতে অভিযান অব্যাহত আছে।’