বিশ্বকাপের আগে বাংলাদেশে কেন কমছে ফুটবল উন্মাদনা
বিশ্বকাপের আগে বাংলাদেশে কেন কমছে ফুটবল উন্মাদনা

দুয়ারে বিশ্বকাপ। অথচ বাংলাদেশে চিরচেনা সেই উত্তাপ নেই। অলিগলিতে পতাকার ঢেউ নেই, তর্ক-বিতর্কেও আগের ঝাঁজ অনুপস্থিত। ফুটবলপ্রেমীদের মতে, ঈদুল আজহার ব্যস্ততা, আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয় নিয়ে সমর্থকদের তৃপ্তি, ব্রাজিলের দীর্ঘ ট্রফিখরা এবং ক্লাব ফুটবলের প্রভাব মিলিয়ে এখনও জমে ওঠেনি বিশ্বকাপের আবহ। তবে তাদের বিশ্বাস, ঈদের পরই বদলে যাবে দৃশ্যপট।

সমর্থকদের আবেগ কম কেন?

ফুটবল অনুরাগী মেহেদী জামান সনেট বলছেন, এবার বিশ্বকাপ ঘিরে সমর্থকদের আবেগ কিছুটা কম। বিভিন্ন গ্রুপে আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এমনটাই অনুভব করেছেন। তার ভাষায়, 'বাংলাদেশের সমর্থকরা মূলত দুই গ্রুপে বিভক্ত: আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের ভক্ত। আর্জেন্টিনা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় ভক্ত বেশ বেড়েছে।' মেসিভক্ত সনেট মায়ামিতে গিয়ে মেসির বাসার বাইরে দেখা করেছেন, অটোগ্রাফ ও ছবি নিয়েছেন। কাতার বিশ্বকাপও দেখেছেন মাঠে বসে। গত বিশ্বকাপের তুলনা টেনে তিনি বলেন, '৩৬ বছর পর আর্জেন্টিনা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। ১৯৮৬ সালের পর থেকে প্রতিটি আসরে ভক্তরা আশায় বুক বাঁধতো। তাই গতবার আমরা বেশ আগে থেকেই উত্তেজনা দেখতে পেয়েছি।'

তার মতে, গত বিশ্বকাপে সমর্থকদের বড় চাওয়া ছিল মেসির হাতে ট্রফি দেখা। 'কাতার বিশ্বকাপ জেতার পর মেসির হাতে ট্রফি দেখে ভক্তরা দারুণ খুশি। তাই এবার সবাই অনেকটা নির্ভার,' বলেন তিনি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আর্জেন্টিনা সমর্থকদের চাপ কম

এ কারণেই এবারের বিশ্বকাপ নিয়ে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের চাপ কম বলে মনে করেন সনেট। 'বিষয়টা এমন যে, আর্জেন্টিনা এবার ট্রফি না জিতলেও বড় রকমের খারাপ লাগবে না। মেসির হাতে কিংবা আর্জেন্টিনায় ৩৬ বছর পর ট্রফি তো এসেছেই,' বলেন তিনি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ব্রাজিল সমর্থকদের অবস্থাও একই

ব্রাজিল সমর্থকদের অবস্থাও আলাদা নয় বলে মনে করেন সনেট। 'তাদেরও অনেকটা আর্জেন্টিনার মতো অবস্থা। ২০০২ সালের পর থেকে ট্রফিবিহীন। তাই বড় গলায় নেইমারদের নিয়ে কিছু বলবে বা করবে সেই জোরটা কমই,' বলেন তিনি। বারবার হতাশা ব্রাজিল সমর্থকদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিয়েছে। 'আশায় বুক বেঁধে হতাশ হতে হচ্ছে। অনেকটা কাতার বিশ্বকাপের আগে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মতো অবস্থা,' বলেন সনেট।

এ কারণেই ব্রাজিল সমর্থকরা এখন কিছুটা সতর্ক। 'তাই ব্রাজিলের সমর্থকরা যদি আগে ভাগে মাতামাতি শুরু করে দেয়, তাহলে প্রতিপক্ষরা যদি ট্রল করে বসে—এমন ভয় তো আছেই। তাই তারা অনেকটাই চুপচাপ,' বলেন তিনি।

ঈদের পরই বদলাবে দৃশ্যপট

তবে এই নীরবতা বেশি দিন থাকবে না বলে মনে করেন সনেট। 'আমার কাছে মনে হয় জুনের শুরু থেকে উন্মাদনাটা একটু একটু করে বাড়তে শুরু করবে,' বলেন তিনি।

ফুটবলপ্রেমী ব্যাংকার নাদিম হাসান রোহান প্রতি বিশ্বকাপেই গেণ্ডারিয়ার বাড়িতে বড় পতাকা টানিয়ে জানান দেন বিশ্বকাপের আগমনী বার্তা। তবে এবার পরিস্থিতি তার কাছেও কিছুটা ভিন্ন। 'আসলে সবাই তো সারা বছর ক্লাব ফুটবল নিয়ে থাকে। সামনেই চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল আছে। এছাড়া ঈদুল আজহা নিয়ে সবার মধ্যে ব্যস্ততা আছে। যে কারণে এখনও উন্মাদনাটা চোখে পড়ছে না,' বলেন তিনি।

আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়কেও বড় কারণ হিসেবে দেখছেন তিনি। 'আর্জেন্টিনা গতবার বিশ্বকাপ জেতায় সমর্থকদের বড় অংশ এবার স্বস্তিতে। সেই উত্তেজনাটা এবার তাই কম,' বলেন রোহান।

ব্রাজিলকে নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখছেন এই ব্যাংকার। 'দলে নেইমার থাকলেও সে কতোটুকু গেম টাইম পাবে তা সবাই বুঝে গেছে। এছাড়া দল হিসেবে ব্রাজিলকে নিয়ে বড় আশা কেউ কেউ দেখতে ভয় পাচ্ছেন,' বলেন তিনি।

ব্রাজিলের দীর্ঘ ট্রফিখরাও প্রভাব ফেলছে বলে মত তার। '২০০২ সালের পর থেকে তারা ট্রফি জিততে পারছে না। এবারের আনচেলত্তির দল নিয়েও আশাবাদীর দল ভারি নয়। সবমিলিয়ে বিশ্বকাপের উন্মাদনা একটু কমই,' বলেন রোহান। তবে পরিস্থিতি বদলাবে বলেও বিশ্বাস তার। 'আমার মনে হয় ঈদের ছুটির পর থেকে বিশ্বকাপের দিকে ঝুঁকবে সবাই। বাড়িতে বাড়িতে পতাকা উড়বে। আগের মতোই উন্মাদনা ফিরবে,' বলেন তিনি।

ভার্চুয়াল দুনিয়ায় উন্মাদনা

ব্যবসায়ী ইফতেখারুল ইসলাম শিমুল মনে করেন, এখনকার সময়ে উন্মাদনার বড় অংশই ভার্চুয়াল দুনিয়ায় সীমাবদ্ধ। ব্রাজিল সমর্থক এই ফুটবলপ্রেমী বলেন, 'এখন তো সব ভার্চুয়ালি বেশি হয়ে থাকে। এছাড়া নানান কারণও আছে। ঈদও বড় কারণ।' তবে মাঠের আবহ পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি বলেও জানান তিনি। 'আমাদের অফিসে কিছু দিন ধরে সবাই কিন্তু ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা কিংবা পর্তুগালের জার্সি পরে এসেছে। সবাই জার্সি পরে অফিস করেছে। আগের ঐতিহ্য ধরে রেখেছি,' বলেন তিনি। নিজের উচ্ছ্বাসের কথাও তুলে ধরেন শিমুল, 'আমি নিজেও ব্রাজিলের জার্সি পরে মন্ত্রণালয়সহ সব জায়গায় গিয়েছি।' তবে দেশের সামগ্রিক উত্তাপ নিয়ে তার মূল্যায়ন, 'সারা দেশে উত্তাপটা ঈদের পরই পরিষ্কার হবে।'

ক্রীড়া সাংবাদিকের দৃষ্টিতে

রাশিয়া বিশ্বকাপ কাভার করা ক্রীড়া সাংবাদিক নোমান মোহাম্মদের কাছেও এবার বিশ্বকাপের আবহ কিছুটা ফিকে। 'বিশ্বকাপ ফুটবলের উত্তাপ বাংলাদেশে ততটা নাই যতটা থাকার কথা ছিল। এটা সত্যি,' বলেন তিনি। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে ঈদকেই দেখছেন তিনি। 'ঈদ হলো আমাদের কাছে বড় উৎসব। ঈদকে কেন্দ্র করে মানুষ লম্বা ছুটি পেয়েছে। বাড়ি যাচ্ছে। সবাই আসলে ঈদের উৎসবের মাঝে ঢুকে গেছে। বিশ্বকাপের আমেজটা একটু কমই,' বলেন নোমান।

ঈদ না থাকলে চিত্রটা ভিন্ন হতে পারতো বলেও মনে করেন তিনি। 'আমরা এই জায়গায় একটু পজ দিয়েছি। আবার ঈদ না থাকলে পরিবেশটা অন্যরকম হতে পারতো,' বলেন তিনি। সাম্প্রতিক ক্রিকেট সিরিজও প্রভাব ফেলেছে বলে মত তার। 'এর আগে ক্রিকেটে পাকিস্তান সিরিজ গেছে। সব মিলিয়ে ঈদের পরই বিশ্বকাপ উত্তাপটা পুরোপুরি টের পাওয়া যাবে,' বলেন নোমান। শুধু উত্তাপ নয়, এবার উত্তেজনাও বাড়বে বলে বিশ্বাস তার। 'আগেরবারের চেয়ে উত্তেজনা বেশি থাকবে বলে আমার বিশ্বাস। সবাই বুঁদ থাকবে খেলার মধ্যে,' বলেন তিনি।

শিক্ষার্থীর দৃষ্টিকোণ

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাহসিন হাসানের কাছেও আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয় এবারের কম উত্তেজনার অন্যতম কারণ। 'গতবার বিশ্বকাপের আগে কোপা জিতেছিল আর্জেন্টিনা। এছাড়া মেসির হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি উঠেছে। তাই আর্জেন্টিনার সমর্থকদের আর চাওয়া-পাওয়া নেই,' বলেন তিনি। এবার ট্রফি না জিতলেও আর্জেন্টিনা সমর্থকদের খুব বেশি হতাশা থাকবে না বলে মনে করেন তিনি। 'এবার যদি ট্রফি নাও জিতে কষ্ট পাওয়ার কিছু নেই,' বলেন তাহসিন।

ব্রাজিল নিয়েও খুব বেশি আশাবাদী নন এই তরুণ। 'ব্রাজিলকে নিয়ে আশায় বুক বাঁধা কঠিন। এবারের দলও বলতে গেলে শক্তিশালী নয়,' বলেন তিনি। বাংলাদেশে ইউরোপিয়ান দলগুলোর সমর্থক কম থাকাও একটি কারণ বলে মনে করেন তাহসিন। 'ইউরোপের দলের বড়রকমের সমর্থক আমাদের এখানে কম। তাই বিশ্বকাপের আমেজটা এখনও পাওয়া যাচ্ছে কম,' বলেন তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ ঘিরে বাংলাদেশ যে আবারও জেগে উঠবে, সে বিষয়ে আশাবাদী তিনি। 'আমরা ঠিকই বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখবো। প্রিয় দলের সমর্থন করবো। তখনই উন্মাদনা দেখা যাবে,' বলেন তাহসিন।