বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় তারকা লিওনেল মেসির কলকাতা সফরকে কেন্দ্র করে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা ও আয়োজককে হেনস্তার ঘটনায় থানায় এফআইআর জমা পড়েছে। ওই আয়োজনের মূল উদ্যোক্তা শতদ্রু দত্ত তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য সরকারের তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসসহ চারজন প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে বিধাননগর দক্ষিণ থানায় এই অভিযোগ জানিয়েছেন।
অভিযুক্তরা কারা?
অরূপ বিশ্বাস ছাড়া অন্য অভিযুক্তরা হলেন কলকাতা পুলিশের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) ও বর্তমানে তৃণমূলের সংসদ সদস্য রাজীব কুমার, দলটির নেত্রী জুঁই বিশ্বাস এবং উচ্চপদস্থ আইএএস কর্মকর্তা শান্তনু বসু। গত সোমবার এই অভিযোগ দায়ের করা হয়।
ঘটনার বিবরণ
২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর শতদ্রু দত্তের উদ্যোগে লিওনেল মেসিকে নিয়ে কলকাতার সল্টলেকের যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। ওই দিন স্টেডিয়ামে নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে মেসিকে দ্রুত সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
হাজার হাজার দর্শক চড়া দামে টিকিট কেটেও ফুটবল জাদুকরকে একনজর দেখার সুযোগ না পেয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন। সৃষ্টি হয় বিশৃঙ্খলা। এ সময় ক্ষুব্ধ ফুটবলপ্রেমীরা ‘উই ওয়ান্ট মেসি’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন। প্রাচীর ভেঙে মেসিপ্রেমীদের অনেকে মাঠে ঢুকে পড়েন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মাঠে নামানো হয় র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (র্যাফ)। এ সময় ক্ষুব্ধ অনেকে গোলপোস্টের জাল ছিঁড়ে ফেলেন, ভেঙে ফেলেন সাজঘরে যাওয়ার টানেলের ছাউনি। উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে স্টেডিয়ামের বাইরেও। একপর্যায়ে পরিস্থিতি শান্ত করতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে।
ঘটনার পরবর্তী পদক্ষেপ
এ ঘটনার জেরে রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসকে পদত্যাগ করেতে হয়েছিল। বরখাস্ত করা হয় বিধাননগর নগর পুলিশের ডেপুটি কমিশনার অনীশ কুমারকে। যদিও তখনই আয়োজক শতদ্রু দত্তের বিরুদ্ধে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ ওঠে। কলকাতা পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। টানা ৩৮ দিন কারাগারে থাকার পর জামিনে মুক্তি পান তিনি।
কারাগার থেকে বেরিয়েই শতদ্রু দত্ত সদ্য সাবেক রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দাগেন। অভিযোগ করেন, সেদিনের বিশৃঙ্খলার জন্য আয়োজকেরা নন, তৎকালীন ক্রীড়ামন্ত্রী ও পদস্থ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা সরাসরি দায়ী ছিলেন।
এফআইআরের অভিযোগ
এখন থানায় জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, অরূপ বিশ্বাস ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে জোর করে ওই অনুষ্ঠানের ২০ থেকে ২২ হাজার টিকিট এবং অতিরিক্ত ৫ হাজার ‘অ্যাকসেস কার্ড’ আদায় করে নিয়েছিলেন। এ ছাড়া মন্ত্রীর পরিবার ও ঘনিষ্ঠরা নির্ধারিত কর্মসূচির বাইরে গিয়ে মেসির সঙ্গে ছবি তুলতে শুরু করলে নিরাপত্তাবলয় ভেঙে পড়ে এবং পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
সংবাদমাধ্যমকে শতদ্রু দত্ত বলেছেন, ‘স্টেডিয়ামে বিশৃঙ্খলার জন্য দায়ী ছিলেন মন্ত্রী ও প্রশাসন। অথচ আমাকে বলির পাঁঠা বানিয়ে ৩৮ দিন জেল খাটানো হয়েছে। আমি এখন এই অন্যায়ের বিচার চাই।’
শতদ্রু দত্ত আরও জানান, এমন ভিত্তিহীন অভিযোগে হেনস্তা করার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ১০০ কোটি রুপি ক্ষতিপূরণ দাবি করে মানহানির মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
বর্তমান অবস্থা
বর্তমানে বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেট শতদ্রু দত্তের দেওয়া এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখছে। পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের পর বিদায় নিয়েছে তৃণমূল সরকার। প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় এসেছে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সরকার। দীর্ঘদিনের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন তাঁরই একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী শুভেন্দু অধিকারী।
রাজ্য সরকারের পরিবর্তনের পর প্রভাবশালী সাবেক মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ জমা পড়ায় ঘটনা কলকাতার রাজনৈতিক ও ক্রীড়াঙ্গনে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।



